চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ২৫ জানুয়ারি ২০১৭

মধুসূদন: বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী প্রবক্তা

সমীকরণ প্রতিবেদন
জানুয়ারি ২৫, ২০১৭ ২:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মধুসূদন: বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী প্রবক্তা

  -মুন্সি আবু সাইফ
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী প্রতিভা নিয়ে আর্বিভূত হয়ে ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার প্রাণপুরুষ। বহু ভাষাবিদ মধুসূদন ছিলেন বিরল প্রতিভার অধিকারী। আপদমস্তকক ইউরোপীয় স্টাইলের মানুষটি ছিলেন মনে প্রাণে খাঁটি বাঙালি। বাংলা কাব্যে ও নাট্য সাহিত্যে তিনি প্রাশ্চত্য স্টাইলের একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন।  তবে বাংলা, বাঙালি এবং উপমহাদেশবাসীর বিশ্বাস,সংস্কার ও মূল্যবোধকে  তিনি কখনো অবঞ্জা করেননি। মধুসূদন একটি নতুন যুগের ¯্রষ্ঠা । সেবিচারে বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন যুগন্ধর। বাংলা সাহিত্যের তিনি একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন সে বিচারে তিনি  দিক পাল।
মধুসূদনের সাহিত্য পর্যালোচনা করলে চারটি বিষয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। (১) মানবতাবাদ (২) ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (৩) স্বদেশপ্রেম (৪) নারীবাদী চেতনা। নিবন্ধটিতে আমি মধুসূদনের নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আলোকপাত করবো।

মধুসূদন সাহিত্যে নারী স্বাধীনতা  সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একটি সংঙ্কুচিত এবং খন্ডিত ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। ধারণাটি হচ্ছে- মেঘনাদবধ মহাকাব্যে প্রমিলা চরিত্রে দুঃসাহসিক অবস্থান সম্পর্কে। “আমি কী ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে”- প্রমিলার এই উক্তির মধ্য দিয়ে ধরে নেওয়া হয় যে, এটাই মধুসূদনের নারী চরিত্রের বীরত্ব ও নারী স্বাধীনতার সার কথা। এ কথা সত্য যে, প্রমিলা মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী নারী চরিত্র। তবে প্রমিলা চরিত্র মধুসূদনের নারীবাদী তেচনার সামগ্রিক দিক বহন করে না।

কোলকাতার হিন্দু কলেজিয়েট স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা কালিন মধুসূদন ‘নারী অধিকার ’ বিষয়ে ইংরাজিতে  রচনা লিখে এবং সেমিনারে বক্তৃতা দান করে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।

আবার সাহিত্য জীবনের শুরুতেই মধুসূদন কবিমানসে নারী স্বাধীনতার দিকটি প্রকটরুপে প্রতিফলিত হয়েছে। মধুসূদন দত্তের প্রথম কাব্য গ্রন্থের নাম ‘ক্যাপটিভ লেডি’ । ‘ক্যাপটিভ লেডি’ এই শব্দটির সরল বাংলা হলো ‘বন্দিনী’। এই কাব্যগ্রন্থে মধুসূদন শাসন-শোষণে নিস্পেষিত ও আজন্ম শৃঙ্খলিত বন্দিনী নারী জাতিকে মুক্তির তথা স্বাধীনতার পথ প্রদর্শন করেছেন।

দাসীত্ব,অপমানিত ও শ্ঙ্খৃলিত জীবন থেকে নারীকে বের হয়ে আসতে হবে। মধুসূদন মনে করতেন, প্রতিবাদে এবং প্রতিরোধের মধ্যদিয়ে নারী আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ঠ হবে। ‘ক্যাপটিভ লেডি’র কাব্যগুন যাই হোক না কেন, কাব্যবক্তব্য বিচারে সাহিত্যকর্মটি নারী স্বাধীনতার পক্ষে এক আগ্নেয় দলিল।

মধুসূদনের বাংলা সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল ‘তিলোত্তমা সম্ভাব কাব্য’( ১৮৬০ ) রচনার মধ্য দিয়ে। কাব্যে মধুসূদনের ব্যক্তি আবেগ বড় বেশি। তবে কবিত্বশক্তি উদ্বোধনের নব ইংগিত মাত্র।

আমরা বিস্মিত হয়ে যায় এই ভেবে যে, মধুসূদনের পরবর্তী সব শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মের নাম করণ করা হয়েছে মেয়েদের নামে। যেমন, বীরাঙ্গনা কাব্য, (১৮৬২) ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১) ।

ব্রজঙ্গনা কাব্যটিতে মধুসূদনের নারীবাদী চেতনা সুদূরপ্রসারি। রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে রচিত কাব্যটিতে শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাধিকা ব্রজের নরনারী নয়। তারা সবাই কলিযুগের প্রেমের আদশর্ প্রতিমূর্তি। মধুসূদনের ভাষায়, Mrs. Radha is not such a bad woman after all”  তাই মধুসূদন শ্রীরাধিকাকে মিস রাধা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মিস্টাার কৃষ্ণা (Mr. Krishna) নামে আখ্যায়িত করেছেন। রাধার প্রেমের মধ্যেও কবি বৈষ্ণব পদাবলীর তত্ত্বকে প্রধান করে দেখেন নি। মধুসূূদনের সৃষ্ট রাধা– চরিত্র একান্তই ধর্মতত্ত্বনিরপেক্ষ বিষয় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কোন কোন সমালোচক এই কারণে রাধার নীল শাড়ীতে ইউরোপীয় গাউনের আভাস পেয়েছেন।

‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ মধুসূদনের নারীবাদী চেতনার ব্যাপক স্ফুরণ লক্ষ করা যায়। এই পত্র কাব্যটিতে তিনি যে সমস্ত প্রতিবাদী পৌরাণিক নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তা এক কথায অনবদ্য। ‘মহাভারতের’  এই সমস্থ নারীরা আক্ষরিক অর্থে বীর নয়।  কারণ তারা কোন যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা মেয়েলী চুলাচুলিতে কোন বীরত্ব প্রদর্শন করেন নি।

বীরাঙ্গনার নারীরা স্বাধীনচেতা। স্বাধীন মনরাজ্যের অধিবাসী। তীব্র রক্ষণশীল বাতাবরণের মধ্যে বীরাঙ্গনার নারী চরিত্রগুরো যে স্বাধীন নারীমনোবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে আজকের এই একবিংশ শতাব্দীর নারী জাগরণের যুগেও তা পরম বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে চলেছে।  বীরাঙ্গনা রানীরা শৃঙ্খলতা থেকে বের হয়ে আসতে চলেছে। ধর্মনিষ্ঠ অথচ ব্যক্তিত্বহীন স্বামীদের বন্ধন থেকে তারা মুক্তি চায়। ফলে কাব্যটিতে পরকীয়া প্রেমেরে জয়জয়াকার সৃষ্টি হয়েছে।

এই নারীরা ধর্মীয় বন্ধন, পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কারের বুকে কুঠারাঘাত হেনে নারীগুলো তাদের কাঙ্খিত, পছন্দসয় ব্যক্তিত্ববান পুরুষদের কাছে চলে যেতে চেয়েছে। এই নারীরা প্রেমের জন্য শুধু অন্তরে দগ্ধ নয় দৈহিক দহনে অতৃপ্ত। তারা জীবন এবং জৈবিকতাকে পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে পরিণত করতে চায়। সার্বিক বিচারে কাব্যটিতে নারী চিত্তের অনুসঙ্গে দেহভাবনা প্রধান বিষয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।

নাট্য সাহিত্যে মদুসূদনের বিস্ময়কর অবদান বিশ্ব বিদিত । বিশেষ করে বাংলা ট্রাজেডি নাটক রচনায় মধুসূদন বিরল কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত নাটক গুলোর নামকরণ এবং কেন্দ্রিয় চরিত্রগুলোও মেয়েদের নামে। (১) কৃষ্ণকুমারী (২) শর্মিষ্ঠা  (৩) পদ্মাবতী  (৪) ময়াকানন এই সব নাটকের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রগুলো তেজবোধে, ত্যাগে, সাহসিকতায়, মর্যদাবোধে অতি মানবীয় নারী চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। মধুসূদনের নাট্যনারী চরিত্রগুলো এতটা বিস্ময়কর এবং আত্মমর্যদাসম্পন্ন যে, তা আজকের যুগেও কল্পনা অবসম্ভব।

মধুসূদনের নারীরা কখনো আত্মমর্যদা সম্পন্ন কখনো স্বাধীনচেতা আবার কখনো চরম ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। কখনো বা রণরঙ্গিণী মূর্তিতে আবির্ভূত। তবে এই সব বিদ্রোহী নারীসত্ত্বা শত বিদ্রোহের  মধ্যেও আবহমান বাঙালি নারী সত্ত্বাকে বিসর্জন দেয়নি। মধুসূদনের নারীরা বন্দিত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে চেয়েছেন ঠিকই তবে বাঙালি চিরায়ত নারী মমতের বন্ধনকে নয়।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।