ভোক্তা অধিকার বঞ্চিত

103

কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে
বিশুদ্ধ খাদ্য সংগ্রহ করতে পারা রীতিমতো বাংলাদেশে সৌভাগ্যের বিষয়। বাজারে মাছ, গোশত, দুধ, সবজি, ফল, চাল, তেল এমনকি যেকোনো মুদিপণ্য নির্ভেজাল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য দেশে আমরা এখনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। অর্থাৎ কোনো একটি সংস্থা কোনো একটি খাদ্য উপযুক্ত মানসহ ভেজালহীন রয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে পারছে না। খাদ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে বড় ধরনের সন্দেহ-অবিশ্বাস রয়েছে। লাভের প্রতিযোগিতা আমাদের অনেকটাই অন্ধ করে দিয়েছে। যেকোনো মূল্যে বেশি করে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে সবাই মিলে একসাথে আমরা বিপদগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছি। যারা ভেজাল বা নিম্নমানের পণ্য দিয়ে অন্যের ক্ষতি করছেন অন্য আরেকজন আবার তাকে অন্য একটি ভেজাল পণ্য সরবরাহ করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমার সবাই মিলে ক্ষতির একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে রয়েছি। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও গবেষণায় সেটি প্রকাশিত হচ্ছে।
খাদ্যে ভেজাল এবং মানহীন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কারণে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের খবর আমরা পাই। তাৎক্ষণিক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে দেখা যায়। যেমন খবরে জানা যাচ্ছে, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সমন্বয়ে অসংখ্য অভিযান চালিয়েছে দেশে। খবর অনুযায়ী, গত তিন বছরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আট হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। ওই সব অভিযানে ভেজাল-মানহীন পণ্যের প্রমাণ পাওয়ার পর ২৫ হাজারের মতো মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অসংখ্য কারখানা-দোকান, ভেজাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তারা সিলগালা করে দিয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের ওপর যদি জরিপ চালানো হয় তাহলে দেখা যাবে তারা সন্তুষ্টচিত্তে কোনো একটি পণ্য বাজার থেকে কিনছেন এমন খুব কমই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আমাদের বাজারে সচরাচর যেসব খাদ্যপণ্য পাওয়া যায় সেগুলোর ওপর মানুষের পূর্ণ আস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা বাধ্য হয়ে সেগুলো কিনছেন।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ভেজাল খাদ্যের কারণে দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া কমপক্ষে তিন লাখ লোক ক্যান্সার ও দুই লাখ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছেÑ বছরে এ জন্য ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে। হেপাটাইটিসসহ লিভারের বিভিন্ন রকমের রোগ এবং ফুসফুসের রোগে অধিক হারে মানুষ প্রতি বছর আক্রান্ত হচ্ছেন। খাদ্যে ভেজালের প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করছে এই পরিসংখ্যান থেকে আঁচ করা যাচ্ছে। এ নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণা করা গেলে এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে জানা যেত। জনসচেতনতার জন্য খাদ্যে ভেজাল নিয়ে মানুষকে ব্যাপকভাবে অবগত করানোর প্রয়োজন রয়েছে। বাস্তবে সে ধরনের প্রচারণার জাতীয় সমন্বিত উদ্যোগ এ দেশে নেই।
‘আমরা কী খাচ্ছি’ এমন বহু প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো পাঠকের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। ওই সব খবরের সূত্র ধরে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অধীনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযানও চালিয়েছে। ভেজালের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য জটিলতার চিত্র ও বাজারে থাকা পণ্যের প্রতি মানুষের অনাস্থা থেকে প্রমাণ হচ্ছে দেশে নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন। এর অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে মানুষের বঞ্চনা। সব সময় এমন খবরের কথা জানা যায়। কিন্তু প্রতিকার পাওয়া যায় খুব কম। আর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে মানুষের ভোগান্তির বিষয় খুব সাধারণ। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সেবাগ্রহীতাকে বঞ্চিত করছে। ভোক্তাসাধারণের অধিকার সংরক্ষণে জোরালো কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। আমরা মনে করি, দেশের খাদ্যপণ্য গ্রহণ থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবা গ্রহণে যত ধরনের বঞ্চনা প্রতারণা আছে সেগুলো বন্ধ করা দরকার। এ জন্য ভোক্তা অধিকারের কথা নতুন করে সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে।