ভাষানীতি হয়নি ৭১ বছরেও

সমীকরণ প্রতিবেদন:
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বাঙালি জাতি আদায় করেছিল ভাষার সম্মান। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছরে (১৯৫২-২০২৩) বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনো উপেক্ষিত। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিকসহ দেশের বিশিষ্টজন। তাদের মতে, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে দেশে আইন হয়েছে ১৯৮৭ সালে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা আইন হয়েছে ২০১০ সালে। এরপরও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উদাসীনতায় আজও প্রণয়ন হয়নি ‘ভাষানীতি’। ভাষা টেকসই করার জন্য ভাষানীতি প্রণয়ন জরুরি বলে তারা মনে করেন।
আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্রভাষা’ প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ সংবিধানের আরও তিনটি অনুচ্ছেদে বাংলা ভাষার কথা উল্লেখ আছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের বিষয়ে উচ্চ আদালত কয়েক দফা নির্দেশনা দিলেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ এবং বাংলা একাডেমির ‘প্রমিত বানানরীতি’ও মানা হচ্ছে না সর্বত্র। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় উচ্চ আদালত, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোয় ইংরেজির পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাকে গুরুত্বহীন করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পাচ্ছে ইংরেজি ও আরবি ভাষা। আবার বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিই প্রণীত হয়েছে সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষায়। দেশে দেদার গড়ে উঠছে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একইভাবে ভাষানীতি না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা।
১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গত বলেছিলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পন্ডিতরা তৈরি করবেন তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে, তা হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয় তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ বঙ্গবন্ধু তার কথা রেখেছিলেন। জীবনের সর্বস্তরে যাতে বাংলা ভাষা চালু হয়, সেজন্য তিনি নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রচলনের জন্য স্বাধীনতার পর থেকে এক ডজনেরও বেশি আদেশ, পরিপত্র বা বিধি জারি হয়েছে। তা সত্ত্বেও সর্বত্র রাষ্ট্রভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। বিশ্বের অনেক দেশের মধ্যে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব ভাষানীতি আছে বলে জানা যায়। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালেও রয়েছে নিজস্ব ভাষানীতি। এর আলোকে তাদের উচ্চ আদালতে মাতৃভাষায় রায় দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের উচ্চ আদালতে এখনো বাংলা ভাষা ব্যবহার কম। উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু হয় নব্বইয়ের দশক থেকে। বিচারপতি প্রয়াত এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন। এরপর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক, বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দেন। চলতি বছর ভাষার মাসের প্রথম দিন ‘মো. আক্কাস আলী বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ।
অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত এ রিট মামলাটির রায় দেওয়ার আগে বিচারপতি নাইমা হায়দার বলেন, ‘আজ ১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস আজ থেকে শুরু। ভাষাশহীদের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকের প্রথম রায়টি বাংলায় ঘোষণা করছি। বিশ্বের সমস্ত বাংলা ভাষাভাষীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলায় এ রায় ঘোষণা করছি।’ বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম হাইকোর্টে থাকাকালে বেশ কয়েকটি মামলার রায় বাংলায় দিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলায় রায় দিয়ে যাচ্ছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন, বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাষানীতি প্রণয়ন করতে হলে ভাষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এর আওতায় ভাষা জরিপও করতে হবে। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কোনো ভাষা জরিপ হয়নি। জানা যায়, ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি থেকে আঞ্চলিক ভাষার জরিপ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুলস্নাহ্?র উদ্যোগে কার্যক্রম শুরুর পর জরিপের প্রশ্নমালাও তৈরি করা হয়। জনগণকে এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে। পরে শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আবদুল কাইউম তিনটি উপজেলায় প্রশ্নমালার ভিত্তিতে জরিপও করেন। তিনি তখন বাংলা একাডেমির সংকলন বিভাগের সহকারী অধ্যক্ষ ছিলেন। তবে ওই কার্যক্রম পরে সফলতার মুখ দেখেনি। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এখন বাংলা একাডেমির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কাজ করছে।
জানা যায়, সরকার ২০১২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটা পরিপত্র জারি করে বলে, বানানে সমরূপতা ও সামঞ্জস্য বিধান করার জন্য বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করা হবে। ২০১৫ সালে ‘সরকারি কাজে ব্যবহারিক বাংলা’ নামে একটি পুস্তিকা তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে প্রশাসনিক পরিভাষা, পদবির পরিভাষার বই হয়েছে।