চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভালো নেই মধ্যবিত্ত : খাদ্যের বাজেটে ছুরি

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
সেপ্টেম্বর ৪, ২০২২ ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

আমিষ বাদ দিয়ে আলু ভর্তা ডাল-ভাতেও হিমশিম নিম্ন আয়ের মানুষ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
নিত্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো আগুন জ্বলছে। ৫৫ টাকার নিচে চাল নেই। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যায় না। পাঁচটি লাউ শাকের ডগার দামও ৫০ টাকা। ফার্মের মুরগি, চাষের মাছ পাঙ্গাশ, কই, মাগুরও কিনতে পারছেন না নিম্নআয়ের মানুষ। ১৫ টাকার নিচে কোনো শাকের মুঠো নেই। আলুর কেজিও ৩০ টাকার ওপরে। মোটা ডালের কেজি ১২০ টাকা। যা এক বছর আগেও ছিল ৬৫ টাকা। খোলা আটার কেজি ৫০-৫৫ টাকা। মাছ, মাংস বাদ দিয়ে ডিম-ভাজি, আলু ভর্তা, ডাল-ভাতও যেন এখন বিলাসী খাবার। সেইসঙ্গে পরিবহন খরচও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বেড়েছে সব ধরনের ওষুধের দাম। বেড়েছে সব ধরনের শিশু খাদ্যের দামও। ফলে বাধ্য হয়ে খাবারের বাজেটে ছুরি চালিয়ে কোনো মতে টিকে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত সাধারণ মানুষ।
ঘটনা প্রবাহ-১ : বশির হোসেন। পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পল্টনে পুরনো বই বিক্রি করতেন। বই বিক্রি কমায় সম্প্রতি ব্যবসা বদলেছেন। এখন খিলগাঁও এলাকায় সকালে ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন। বিকালে রেস্টুরেন্টের অনলাইন ডেলিভারির কাজ করেন। আগে এক কাজ করে যা আয় করতেন এখন দুই কাজ করেও তার চেয়ে কম আয় হয়। অথচ জীবনযাপনের খরচ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহনসহ সবকিছুতেই খরচ বেড়েছে অস্বাভাবিক। এক হালি ডিমের দাম উঠেছে ৪৫ টাকায়। বাধ্য হয়ে খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন বশির হোসেন। দুই রুমের বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। আগামী মাস থেকে এক রুমের বাসায় উঠবেন। বশির বলেন, আগে মাঝে মধ্যে মাছ, মুরগি, ডিম কিনতেন বাচ্চাদের জন্য। বর্তমানে কম দামি মাছ কই, পাঙ্গাশও কিনতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। মুরগির দোকান থেকে গিলা-কলিজা আর মুরগির পা কিনে আনেন সামান্য দামে। যা অন্য গ্রাহকরা রেখে যায়।
ঘটনা প্রবাহ-২ : মামুনুর রশীদ (আলমগীর)। গার্মেন্ট কর্মী। ডলারের দাম বৃদ্ধি আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা আগের দামেই অর্ডার করছেন। ফলে বেতন একই রকম থাকলেও মামুনুরের জীবন ধারণের খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে চাকরির পাশাপাশি বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি গার্মেন্টের স্টকলট কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছেন ক্ষুদ্র পরিসরে। তবুও জীবন যাত্রার খরচ মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মাছ, মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। সহজ পুষ্টি আর কম দামের আমিষ হিসেবে আগে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলেও বর্তমানে তা পারছেন না।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, করোনা মহামারি চলাকালে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে জীবন চালিয়েছে। মহামারি কেটে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে জিনিসপত্রের বাড়তি দাম। এর জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকেই দায়ী করছে সরকার। যদিও এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে খাদ্যপণ্যের দাম তেমন একটা বাড়েনি। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে দেশের বাজারে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমছে ক্রমাগত। এর প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েই চলেছে বলে মনে করেন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। তিনি বলেন, আমাদের এখানে কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। অথচ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় সরকারের নানা সহায়তা চলমান। ওই সব দেশে জবাবদিহিতাও রয়েছে। কেউ অযৌক্তিকভাবে জিনিসের দাম বাড়াতে পারে না। ফলে সেখানে এর প্রভাবটাও কম বলে মনে করেন ক্যাবের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। এদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বৈশ্বিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের গত মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে চলতি বছর সামাজিক অস্থিরতার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। ১৩২টি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ছয় মাসের নাগরিক অস্থিরতা সূচক (সিভিল আনরেস্ট ইনডেক্স) প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক ঝুঁকি এবং কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান-ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে বিশ্বের সব দেশের সরকারের ওপরই চাপ বাড়ছে। এক্ষেত্রে মধ্যম আয়ের দেশগুলো উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সূচকে উচ্চ ঝুঁকি বা চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই বিশ্বব্যাংকের নিম্নমধ্যম বা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকাভুক্ত। ম্যাপলক্রফট বলছে, এ বছর এমন অস্থিরতার ঝুঁকি রয়েছে অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতেও। যে ১০টি দেশকে আলাদাভাবে নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মিসর, তিউনিশিয়া, লেবানন, সেনেগাল, কেনিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন। খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা জুনে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে আগামী মাসেই মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও জ্বালানি তেলের দাম এক মাসের মাথায় সামান্য কমানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতিতে খুব একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে যে কোনো মূল্যে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনতে হবে। মানুষের জীবন ধারণের খরচ কমাতে হবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী লোকসান ঠেকাতে বাংলাদেশের বাজারে রেকর্ড দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে বেসামাল হয়ে গেছে দেশের পণ্যমূল্য। বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির প্রভাবটা একটু বেশিই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে-মনিটরিং না থাকা। এখানে বাজারে যে যার মতো দাম বাড়ায়। কোথাও কোনো জবাবদিহিতাও নেই। কেউ কারসাজি করলেও শাস্তি হয় না। জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বাড়ালেও এর কোনো প্রতিকার হয় না বলে মনে করেন, প্রবীণ অর্থনীতিবিদ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। টিসিবির হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চালের দাম অন্তত ১২-১৪ শতাংশ বেড়েছে। আটা-ময়দার দাম বেড়েছে ৫৫-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে ৩৮-৫০ শতাংশ। ডিমের দাম বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া মাছ, মাংস, সবজি, তরকারি সব পণ্যের দামই বেড়েছে। এখনো বাড়ছে। অথচ মানুষের আয় বাড়েনি মোটেও। বরং করোনা মহামারির কারণে অনেকেরই আয় কমেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাদের অনেকেই আর ব্যবসা চালু করতে পারেননি। অনেকে কাজ হারালেও কাজ ফিরে পাননি। এসব কারণও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে দ্রব্যমূল্যের ওপর। মানুষ বাধ্য হয়ে খাদ্যের বাজেটে ছুরি চালাচ্ছেন। কাটছাঁট করে কোনো রকমে টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করছেন। রাজধানীর বাজারে সরু চালের কেজি বেড়েছে ১০-১২ টাকা পর্যন্ত। বাজারে খোলা সাদা আটাও ৫০-৫৫ টাকা কেজিতে উঠেছে। আর প্যাকেটজাত দুই কেজি আটার দাম উঠেছে ১১৫-১২০ টাকায়। যা এক বছর আগে ছিল ৭০-৭৫ টাকা। মসুর ডালের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আলুর বাজারও চড়া। লবণও কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। চিনির কেজিও উঠেছে ১১০ টাকায়।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।