চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ২১ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভরা মৌসুমেও কেন বাড়ছে চালের দাম

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ২১, ২০২২ ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নতুন ধানের প্রভাব নেই চালের বাজারে। ভরা মৌসুম, অথচ মিল গেট থেকে শুরু করে খুচরা বাজার; সবখানেই অস্থিরতা। সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। আবার মিলারদের দাবি, মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়ানো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে চরম অস্বস্তিতে ভোক্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত নতুন ধান উঠলে দেশের বাজারে চালের দর কমে। কারণ, বোরোতে দেশের মোট চালের প্রায় ৫৫ শতাংশ উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাজারে ভিন্ন চিত্র। সূত্র বলছে, বৃহৎ পাইকারি মোকাম নওগাঁয় মাঝারি জাতের চালের দর ৫৮ থেকে ৬০ টাকা

গত সপ্তাহে যা ছিল ৫৫ টাকা। যদিও খুচরা বাজারের এসব চাল ব্যবসায়ীদের আগের কেনা। বাড়তি দামের চাল খুচরায় পৌঁছায়নি। তবে এবার হাওরে আগাম পানি এসে কিছু ধান নষ্ট হয়েছে। বিশ্ববাজারে চালের দামও কিছুটা বাড়তি। তাই বলে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এই যে এখন ধান ও চাল কিনে রেখে ভবিষ্যতে ভালো মুনাফা করার সুযোগ খুঁজছেন ব্যবসায়ীরা। মজুতদাররা বাজারে না ছেড়ে চাল ধরে রাখছেন বলেই দাম বাড়ছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গত রোববার সুনামগঞ্জে এক মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, সামনে নির্বাচন, তাই সরকার চালের দাম বাড়তে দেবে না। কিন্তু দেখা গেল, বাজারে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। এ ছাড়া টানা বৃষ্টি ও মিলাররা ধান সংগ্রহের পর এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি, ফলে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে মিনিকেট, নাজিরশাইল ও মোটা চালের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। পাইকারিতে দাম বাড়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে কেজিতে গড়ে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। গত দুই-তিন দিনের ব্যবধানে দুই টাকা বেড়ে মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৬ টাকায়। বিআর-২৮ ও পায়জাম জাতীয় চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। মোটা চালের (স্বর্ণা ও গুটি জাতের) কেজিতেও দাম বেড়েছে দুই থেকে তিন টাকা। এই চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৪ থেকে ৪৬ টাকায়; যা তিনদিন আগেও কেনা গেছে ৪২ থেকে ৪৩ টাকায়। পুরাতন সরু জাতের দর বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি কাটারি, নাজির বা মিনিকেট চাল কিনতে খরচ হচ্ছে ৭০ টাকা। নন শর্টার বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। কাওরান বাজারের আরেক বিক্রেতা বাচ্চু জানান, চলতি মাসের শুরুতে যখন নতুন মিনিকেট চাল বাজারে আসে, তখন দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৭ টাকা। এই ১৫ দিনের মধ্যেই দাম উঠে গেছে ৬০ টাকায়। বিআর আটাশ চাল কয়েক দিনের জন্য প্রতি কেজি পাইকারিতে ৪২ টাকায় নেমেছিল। এখন আবার সেটা ৪৭ টাকায় উঠেছে। খুচরায় ৫০ টাকা থেকে ৫২ টাকা।

কুষ্টিয়ার রশিদ মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে বস্তা ২৯৫০ টাকায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোজাম্মেল ও মনজুর ব্র্যান্ডের চাল বিক্রি হচ্ছে ৩১৫০ টাকায়। মাঝারি চাল (বিআর আটাশ) বস্তা ২২০০ থেকে ২২৫০ টাকায়, আমন মৌসুমের পাইজাম ২১০০ টাকা থেকে ২১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদন বলছে, গত এক সপ্তাহে মাঝারি চালের দাম ৩ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম ৩.৩৩ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ টাকা থেকে ৬৮ টাকায়। এক বছর আগে ৩১শে মে তারিখে প্রতি কেজি সরু চালের দাম ছিল ৫৮ টাকা থেকে ৬৫ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে। মধুবাগ বাজারের বিক্রয়কর্মী শুভ বলেন, তাদের আগের কেনা চাল রয়েছে। সেগুলো বিক্রি করছেন। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাকে জানিয়েছেন, নতুন করে চালের দাম বেড়েছে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেন, গম আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর চাপ পড়েছে চালের বাজারে। তাছাড়া মিলাররা জানিয়েছেন, তারা সরকারকে চাল দিচ্ছেন। ফলে চালের সংকট তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে মিলাররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছেন। ফলে বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিরতা। কাওরান বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী হাজী ইসমাইল রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জসিম বলেন, এখন চালের মৌসুম। এ সময় দাম কিছুটা কম থাকার কথা। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এ বছর নতুন চালের বস্তায় মিল পর্যায়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। বাজারে আসা কাঁঠাল বাগান এলাকার বাসিন্দা ময়নুল বলেন, তেল, পিয়াজ, আটা-ময়দা-চাল সব কিছুরই দাম বাড়ছে। এতে কষ্ট বাড়ছে গরিব মানুষের। সরকার বাজারে নামকাওয়াস্তে অভিযান চালাচ্ছে। এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এদিকে চালের মূল্য বৃদ্ধির জন্য মিল মালিকদের দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।

একজন স্থানীয় চাল ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, দাম তো বাড়ায় মিল মালিকরা। যে চালের বস্তা ২৬৫০ টাকা দিয়ে কিনলাম সেটাই এখন ২৭০০ টাকায় বিক্রি করছে। আমাদের বেচা-বিক্রি হয় কেনার দামের ওপরে। কেনার সময় বেশি দিয়ে কিনে কম দামে কীভাবে বিক্রি করবো? বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, হাওরে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারছেন না। কৃষকদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। এখনো ৫ শতাংশ চাল ওঠেনি কৃষকের ঘরে। মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়েনি দাবি করে তিনি বলেন, মিলাররা ভাউচার ছাড়া চাল বিক্রি করেন না। যেসব পাইকার বলেন মিলাররা দাম বাড়াচ্ছেন, তাদের ভাউচার দেখলে প্রমাণ মিলবে দাম বাড়ছে কিনা। নওগাঁর ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, প্রতিনিয়তই প্রায় আকাশ খারাপ থাকছে। ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য ধান বাঁচানোর চেষ্টা করলেও কিছুতেই বাঁচানো যাচ্ছে না। সরকারি গুদামগুলোতে সংগ্রহ চলছে ফলে কমছে না মোটা চালের দর। আবার হাটগুলোতেও বেড়েছে ধানের দাম। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, ১৫-২০ দিনের ব্যবধানে ধানের দাম প্রতি মণে বেড়েছে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা। যেহেতু ধানের দাম বেড়েছে, তাই চালের দামও বেড়েছে। বাজার যদি একবার ঊর্ধ্বমুখী হয়, তাহলে সেখান থেকে সহসাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, এই মুহূর্তে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। সরকারি গুদামে যথেষ্ট পরিমাণে চাল মজুত আছে। বেসরকারি খাতেও চালের সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম বাড়বে, এমন শঙ্কা থেকে ভরা মৌসুমে বাজারে চালের দাম বাড়তে পারে। তবে উৎপাদন খরচের চেয়ে যাতে কম দামে চাল বিক্রি না হয়, সেদিকেও সরকারের খেয়াল রাখাটা খুব জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে সাধারণ মূল্যম্ফীতির হার ছিল ৬.২২ শতাংশ। গত বছরের মার্চে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৪৭ শতাংশ। সেই হিসাবে, গত মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.৩৪ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫.৫১ শতাংশ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৮ই এপ্রিল পর্যন্ত খাদ্য শস্যের মজুত ১১.৩৬ লাখ টন। এর মধ্যে চাল ১০.৩২ লাখ টন। গম ১.০২ লাখ টন। ধান ০.০৩ লাখ টন। বলা হচ্ছে, চালের উৎপাদন বাড়ছে, যার বিপরীতে মাথাপিছু ভোগ কমছে। এতে চাহিদার তুলনায় দেশে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা প্রতিবেদন পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশে মাথাপিছু দৈনিক চাল খাওয়া বা ভোগের পরিমাণ ৪০৫ গ্রাম।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।