চুয়াডাঙ্গা শুক্রবার , ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্যাংকে নগদ টাকার টানাটানি

তিন কারণে ব্যাংকে তারল্য চাপ সৃষ্টি : ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ আসছে
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২২ ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন: সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে নগদ টাকার টানাটানি চলছে। গত এক মাস ধরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একে অপর থেকে নগদ টাকা নিয়ে দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকগুলো বর্তমানে বড়-ছোট বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া থেকেও বিরত রয়েছে। তারল্য ব্যবস্থাপনায় এ চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও বেগ পেতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো যাতে সহজেই টাকার সংকট মেটাতে পারে এজন্য অর্থবছরের শুরুতেই রেপোর সুদহার শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ কমাতে হয়েছে। ব্যাংকারদের চাপে সিআরআর এর হার কমানো হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার ছাড়তে হচ্ছে। ফলে রিজার্ভ বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৭-এ এসে দাঁড়িয়েছে।

গত এক বছরে ব্যাংক খাতে তারল্য কমেছে ২০ হাজার কোটি টাকা। তারল্য কমার সঙ্গে সঙ্গে অলস টাকার প্রবাহও কমেছে ব্যাংক খাতে। এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতিতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কমে যেতে পারে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ। এর সূত্র ধরে কর্মসংস্থান নিয়ে সংশয় দেখা দিতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সুদহার নিয়ন্ত্রণ করা ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতি দুই ডিজিটের ঘর ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। জানা গেছে, তিন কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আমানতের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। আমদানিনির্ভর দ্রম্নত ঋণ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির পার্থক্য বেশি হয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও জোগানের মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি অর্থবছরের শুরুতে আমানতের সুদহার কমিয়ে দেওয়ায় কমে গেছে আমানত প্রবাহ। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

Girl in a jacket

জানা গেছে, সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা- এমনকি বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক বলে পরিচিত ইসলামী ব্যাংকও গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এক সময় এই ব্যাংকটি দেশের বিপদে পড়া ১৫-২৫টি ব্যাংককে আর্থিকভাবে সহায়তা করত। এখন সেই ব্যাংক নিজেই নগদ টাকার সংকটে পড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারল্য সংকটের কারণে বেশ কিছুদিন যাবত নতুন কোনো প্রকল্পে ব্যাংক বিনিয়োগ করছে না। আগের যেসব গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ অনুমোদিত ছিল, সেগুলোর অর্থ ছাড় করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ সেপ্টেম্বর কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা ধার নেয়। ২৫ সেপ্টেম্বর নেয় ৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এছাড়া গত ৩১ আগস্ট ৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা, ৩০ আগস্ট ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা, ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা এবং ২৫ আগস্ট ৬ হাজার ৮২ কোটি টাকা ধার করেছে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ সুদ গুনতে হয়েছে। যার হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ডক্টর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব পড়ছে। যা বর্তমানে বিরাজমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৬-৯ এর ফাঁদ (সঞ্চয় সুদের হার) থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিছুদিন আগেও দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় ব্যাংকিং খাত ছিল অপেক্ষাকৃত সুশৃঙ্খল। কিন্তু এই খাতে বেশকিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে ব্যাংক খাত চাপের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ছয় মাস আগের তুলনায় অর্থনীতি এখন দ্রুত পিক-আপ করছে। ব্যবসায়ীরা স্বল্পমেয়াদি ঋণ চাচ্ছেন। আগে যেখানে ঋণের চাহিদাই ছিল না এবং তারল্যের বোঝা নিয়ে অনেক ব্যাংক বসেছিল, সেখানে অনেক ছোট, বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এখন ঋণ চাচ্ছেন চলতি মূলধন জোগান দেওয়ার জন্য। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দৈনন্দিন যে অর্থ লাগে তার জোগান দেওয়ার জন্য তারা এখন ঋণের জন্য মরিয়া। যেহেতু ইকোনমি পিক-আপ করছে, তাদেরও সেভাবে অগ্রসর হতে হবে। ফলে অর্থনীতিতে নগদ অর্থের ব্যবহার এখন বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে মোট তারল্য ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২১ সালের আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে তারল্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে কমছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ তারল্য আছে এর মধ্যে চলতি বছরের জুলাই শেষে সরকারের কাছে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি বিল ও বন্ড রয়েছে। অর্থাৎ এ পরিমাণ ব্যাংকের অর্থ সরকারের কাছে ঋণ আকারে রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে নগদ অর্থ রয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলোতে তারল্যপ্রবাহ কমার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত তারল্যপ্রবাহও কমে গেছে। চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুলাই মাসে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে কমছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে ছিল ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকে কমেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এ সময়ে তারল্য বেড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।