চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১৯ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্যয় মেটাতে সর্বস্বান্ত বিচারপ্রার্থীরা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ১৯, ২০২২ ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

তাহের হোসেন। চাকরি করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তবে কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে মামলাও হয়। মামলায় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের সাথে তাকেও আসামি করা হয়। বেশ কয়েকটি প্রতারণা মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তার হন তিনি। তবে মামলাগুলো যে ধারায় দায়ের করা হয়েছে, সে ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর। অথচ সাত বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কারাগারেই আছেন। কোনো মামলারই বিচার নিষ্পত্তি হয়নি। মামলাগুলোতে কোনো সাক্ষী আসছেন না। সাক্ষী না আসায় শুধু তারিখের পর তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে। এক প্রকার বিনাবিচারেই দীর্ঘ বছর ধরে কারাভোগ করছেন তিনি। ঢাকার একটি আদালতে ভুক্তভোগী তাহেরের বাবার কাছ থেকে এসব তথ্য জানা যায়। তিনি জানান, অপরাধ হয়ে থাকলে বিচার হবে কিন্তু এ রকম অনির্দিষ্টকাল বিচার চলায় আমার পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। তাহেরের ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বারবার আইনজীবী পরিবর্তন করতে হয়েছে। মামলার পেছনে টাকা ঢালতে ঢালতে তিনি এখন নিঃস্ব। ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার একটি মামলা নিয়ে ছোটাছুটি করছেন আলী আশরাফ আখন্দ। তার ১৩ বছর বয়সি ভাতিজি বখাটের অসহনীয় উৎপাতের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিল।

চলতি মাসের গোড়ার দিকে আশরাফ বলেন, মামলা চলছে এই যে বছর গুনি, সাত-আট বছর হয়ে গেল। আমরা আর কত দিনই বা বাঁচব, বেঁচে থাকতে এর দেখে যেতে পারব কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ন্যায়বিচার পাবো কি-না জানি না। তবে হয়রানি তো হচ্ছেই। যার কোনো শেষ নেই। আদালতে আসতে আসতে লাখ লাখ টাকাও শেষ। এখন টাকার জন্য মামলা চালাতে পারব কি-না তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। 

একটি ধর্ষণ মামলার ভুক্তভোগী বলেছেন, ‘ঘুষ নেয়াটা যদি না থাকত, তাহলে ন্যায়বিচারটা থাকত, একটা মানুষ অন্যায় করলে সে পার পেয়ে যেতে পারত না।’ ২০১২ সালে ১৫ বছর বয়সে মামলা করার পর থেকে মেয়েটিকে এখনো হুমকি-হেনস্তা সইতে হচ্ছে। তার মামলার পয়সাওয়ালা পেশিশক্তিধর আসামি গত বছর বেকসুর খালাস পেয়েছেন। শুধু তাহের ও আশরাফই নন, আদালতপাড়ায় এ রকম লাখ লাখ ঘটনা। ভুক্তভোগী অগণিত। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে সীমাহীন খরচে হাবুডুবু খাওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক সংসারই ধ্বংস হয়ে যায় মামলায় জড়িয়ে। বিপুল টাকা ব্যয়, একখণ্ড জমি উদ্ধার করতে আরো জমি বিক্রি করা, পারস্পরিক রেষারেষিতে পড়ে সর্বস্ব খোয়ানো, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে চিরদিনের জন্য বিরোধ লাগে। ঘরের সোনা-গয়না বিক্রি করে মামলা চালানো, শখের জিনিস বিক্রি করেও মামলা চালানোর ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া ভূমি-সংক্রান্ত মামলার পেছনে যুগের পর যুগও পার করেছেন দেশের লাখ লাখ মানুষ। আইনজীবীর ফি, বিভিন্ন নথির সই, মুহুরি, নকল সংগ্রহ, যাতায়াত, খাবার ও আনুষঙ্গিক খাতে সীমাহীন খরচ মেটাতে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রির ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। তবে বিচারপ্রার্থী নিঃস্ব হলেও অর্থ-বিত্তে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন আদালতকেন্দ্রিক পেশাজীবী শ্রেণি। কেউ কেউ গড়ছেন আলিশান অট্টালিকাও।  মামলার নথি দেখা, হাজিরা দেয়া, ওকালতনামায় সই করা, জামিননামা দেয়া, জামিনের শুনানি করা, মামলার নকল তোলাসহ মামলা-সংক্রান্ত যেকোনো কাজে ‘বখশিশ’ বা ‘খরচাপাতি’র নামে বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হয় বাড়তি পয়সা। কম এগিয়ে নন এক শ্রেণির  আইনজীবী এবং তাদের সহায়করা।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারপ্রার্থীর মনে সুবিচার পাওয়ার ভরসা নেই। ঘাটে ঘাটে টাকা ঢালতে হয়। টাকা আর প্রভাবের জোরে সবলতর আসামিকে রেহাই পেতে দেখা যায়। সব মিলিয়ে আদালতের বাইরে আপস এবং তা নিয়ে বাণিজ্যের একটা ধারা তৈরি হয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অর্থ নষ্ট এড়াতে হলে প্রথমে বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে পারলে বিচারপ্রার্থীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কম হবে। আর দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া অথবা মামলা ঝুলে যাওয়ার বড় কারণ সাক্ষীর গরহাজিরা। আইনত সাক্ষীর আসা নিশ্চিত করবেন তার এলাকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।

সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) সাক্ষী হাজির করার উদ্যোগ নেবেন, তাকে আদালতে তুলবেন। তবে এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও তদারকি দরকার।  সাক্ষীদের ভালোভাবে বসানো, হাজিরা দ্রুত করানো, সম্মান-সৌজন্য দেখানো দরকার। সরকারি সাক্ষীরা পান, অন্যদেরও যাতায়াত খরচ দেয়া দরকার।

মামলার ক্ষয়-ক্ষতি ও অপচয়: দেশে আদালত ও সার্বিক বিচার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা খুব একটা নেই। এ নিয়ে গ্রহণযোগ্য জরিপও কখনো হয়নি। বিচারাঙ্গনের অংশ-বিশেষ নিয়ে নিজ উদ্যোগে ব্যক্তিপর্যায়ে কেউ কেউ নিবন্ধ-প্রবন্ধ গ্রন্থ লিখেছেন। এর মধ্যে একটি ‘বাংলাদেশের ভূমি মামলার।

রাজনৈতিক অর্থনীতি: বিশাল এক জাতীয় অপচয়ের কথকতা’। গ্রন্থটি লেখা অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের। তিনি নিজে এবং ওবায়দুর রহমান ও সেলিম রেজা সেলিম এটি অনুবাদও করেছেন। গ্রন্থের ভূমিকায় দেওয়ানি কিংবা ‘ভূমি মামলার’ ক্ষয়-ক্ষতির কিছুটা ধারণা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রায় ১২ কোটি মানুষ ভূমি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত। মামলাধীন জমির পরিমাণ ২৩.৫ লাখ একর। যা মোট জমির এক-চতুর্থাংশ। ভোগান্তি বছর প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ বছরের সমতুল্য। মামলা মোকাবিলার জন্য ব্যয়িত অর্থের মোট পরিমাণ দেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ব্যয়ের চেয়ে বেশি। মামলায় জর্জরিত পরিবারগুলোর সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতির মোট পরিমাণ বছরে ১১ দশমিক ৫১৯ কোটি টাকা। মামলাজনিত আকস্মিক খরচের বার্ষিক পরিমাণ ২৪ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ ভাগই বিভিন্ন ধরনের ঘুষ। প্রকৃত ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।

ওই বইয়ের ভূমিকায় আরও বলা হয়, ভূমি মামলা মামলা-কবলিত পরিবারগুলোর নিঃস্বকরণ ও বঞ্চনা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। উভয় পক্ষের জন্যই এক ক্ষতিকর যুদ্ধ। যে যুদ্ধে কোনো পক্ষই জেতে না। এটা বিচার বিভাগ, পুলিশ, ভূমি শাসন ও ব্যবস্থাপনা, উকিল, স্থানীয় প্রভাবশালী, টাউট এবং এদের মতো আরও অনেকেই কেবল দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের জন্য জয়-জয়কার পরিস্থিতি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন মামলা চলায় খরচের হিসাব থাকে না। অধিক ব্যয়ের মধ্যে থাকে আইনজীবীদের ফি। আইনজীবীদের কোনো নির্ধারিত ফি নেই। কিছু নামকরা আইনজীবীকে কোনো মামলায় শুনানি করতে নেয়া হলে মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়। মামলায় জেতার জন্য বিচারপ্রার্থীরা তাই করেন। আবার ঘুষও প্রচলিত। ঘুষ দেয়ার নাম করেও বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়। আদালতের কর্মচারীদেরও দফায় দফায় বখশিশ বা টাকা দিতে হয়। দেশের একটি প্রচলিত কথা, ‘কোর্টের ইটও টাকা খায়’। আদালতে যারা যান তারা এ কথার সত্যতাও খুঁজে পান।”

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বিচারাঙ্গনে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় নতুন নয়। অনেকে মামলা চালিয়ে দরিদ্র হয়ে গেছে কিন্তু মামলার সুরাহা পায়নি। বিচার চাইতে এসে যদি কেউ জটে আটকা পড়ে নিঃস্ব হয়ে যায় তাহলে বিচারকার্যের ওপর অনাস্থা তৈরি হয়। আর কেউ আদালতমুখী হতে চান না। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিচারাঙ্গন থেকে দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করে কিভাবে মামলাজট কমিয়ে বিচার ত্বরান্বিত করা যায় তার একটা কার্যকরী সমাধান বের করা।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান মানিক বলেন, ‘দেওয়ানি প্রকৃতির এক মামলা তিন প্রজন্মকে লড়তে দেখেছি। আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের নির্ধারিত ফি না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের বেকায়দায় পড়তে হয়। মামলার প্রকারভেদে খরচ হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হলো দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন কার্যকর করে বিচারপ্রার্থীরা যাতে সহজে বিচার পান সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। আইনও সংশোধন করতে হলে তা করতে হবে।’

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।