চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২০ ডিসেম্বর ২০১৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় কবি নজরুল – মুন্সি আবু সাইফ

সমীকরণ প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ২০, ২০১৬ ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় কবি নজরুল
– মুন্সি আবু সাইফ
কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের প্রতিভার সূতিকাগার হিসেবে সমধিক পরিচিত। মীর মশাররফ হোসেন, ফকির লালন শাহ, কাঙাল হরিনাথ প্রমূখ দিকপালের অনন্য অবদানে কুষ্টিয়া বিশ্বময় পরিচিতি লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে কুষ্টিয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য সাহিত্য কর্মগুলোর একটা বড় অংশে কুষ্টিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের কোন না কোন সময়ে বিভিন্ন অবস্থা ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া  ও বর্তমান চুয়াডাঙ্গায় এসেছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম ১৯২৭ কুষ্টিয়ায় আগমন করেন। গবেষণাসূত্রে জানা যায় যে, শ্রী হেমন্ত কুমার সরকারের আমন্ত্রণে ১৯২৭ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে ‘বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দলের’ সম্মেলন উপলক্ষে নজরুল কুষ্টিয়ায় এসেছিলেন। তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায় যে, নদীয়ার জেলা শহর কৃষ্ণনগর থেকে নজরুল সপরিবারে কুষ্টিয়ায় আসেন।
বাংলার কৃষক প্রজা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন হেমন্ত কুমার সরকার। রাজনৈতিক প্রয়োজনে হেমন্ত কুমারকে প্রায় কুষ্টিয়ায় থাকতে হতো। সেজন্য তিনি শহরের আমলাপাড়ায় একটি বাড়ী (ঊষস ঈড়ঃ ও উবি ঈড়ঃ) ভাড়া নিয়েছিলেন। নজরুল সপরিবার এই বাড়ির  উবি ঈড়ঃ -এ অবস্থান করন। তাছাড়া সৌমন্দ্রেনাথ ঠাকুর (১৮৭৩-১৯৬২), ফিলিপ ¯প্র্যাট প্রমুখ কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দও ঐ সম্মেলনে যোগদান করেন। এ সময় তাঁরা অবস্থা করেন ঊষস ঈড়ঃ -এ।
নজরুল ইসলাম এ সময় জেলার  বিভিন্ন সভা সমিতিতে বক্তৃতা করেন। গণজাগরণমূলক গান পরিবেশন করে কবি আন্দোলনের যৌক্তিক দিক তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কবি সেখানকার তরুণদেরকে গান শেখাতেন। কবির সমস্ত কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য ছিলো কুষ্টিয়ার জনগণ-কৃষক-শ্রমিক ও তরুণদেরকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে উজ্জীবিত ও সংগঠিত করা।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৮ সালে দ্বিতীয়বার কুষ্টিয়া আসেন। বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দলের আঞ্চলিক সম্মেলন উপলক্ষে কবি দ্বিতীয়বারের জন্য কুষ্টিয়া সফর করেছিলেন। এবারও  তিনি হেমন্ত কুমারের পূর্বের বাসায় উঠেন। কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে বিখ্যাত যতীন্দ্র মোহন হলের পরিমল রঙ্গমঞ্চে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। হেমন্ত কুমার, ফিলিপ ¯প্র্যাট প্রমুখ নেতা ভারতের স্বাধীনতা ও কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। এ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম ‘কৃষাণের গান’ ‘অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীত’ প্রভৃতি বিখ্যাত গানগুলো পরিবেশন করেন। নজরুলের তেজস্বী কণ্ঠের সুরেলা গান সেখানে উপস্থিত প্রায় এক হাজার প্রতিনিধিকে উৎসাহিত করে।
১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি অথবা  মার্চ মাসে হেমন্ত কুমারের আমন্ত্রণে বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে কবি তৃতীয় বারের মতো কুষ্টিয়া সফর করেন। এবারে কিন্তু কবি একা একা আসলেন না। সাথে আসলেন কবির শিশু পুত্র বুলবুল (১৯২৬-৩০), সব্যসাচী (সানি) (১৯২৯-৭৪) [ তখন দু’মাসের শিশু], স্ত্রী প্রমীলা ও শাশুড়ী গিরিবালা দেবী। এবারও কবি হেমন্ত কুমারের বাসায় উঠেন। হেমন্ত কুমার সরকারের সভাপতিত্বে বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলন শুরু হয়। মুজফ্ফর আহম্মদ, আবদুল হালিম, ফিলিপ ¯প্র্যাট প্রমূখ নেতৃবৃন্দ এ সম্মেলনে যোগদান করেন। কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সভায় যোগ দিয়েছিলেন। বহু আলাপ-আলোচনার পর এতে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের পরামর্শক্রমে শ্রেণীভিত্তিক সংগঠন ‘বঙ্গীয় কৃষকলীগ’ নামে কৃষক শ্রেণির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন করা হয়।
এ সম্মেলন অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলামই  ছিলেন প্রধান আকর্ষণ। তিনি ‘কৃষাণের গান’ ‘জেলেদের গান’ ‘শ্রমিকের গান’  প্রভৃতি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাঁর দরাজ কণ্ঠে শ্রোতারা উল্লাসিত হয়ে ওঠে। দর্শক শ্রোতার তুমুল করতালি ছাড়াও তখনকার দিনের প্রথায়-থিয়েটারী ঢঙে পুন: পুন ‘এনকোর’ ধ্বনিতে বিরাট হলটি কেঁপে কেঁপে উঠেছিলো।
সম্মেলনের কাজ শেষ হবার পরের দিনই মুজফ্ফর আহমদ, আবদুল হালিম ও ফিলি ¯প্র্যাটদের সঙ্গে নজরুল পরিবারের সদস্যরাও কলকাতায় ফিরে যান। কিন্তু নজরুল ইসলাম আরো দু’এক দিনের জন্য কুষ্টিয়ায় থেকে যান।
একই সময়ে এখানে অবস্থানকালে কুষ্টিয়া মিউনিসিপ্যালিটির পক্ষ থেকে নজরুলকে এক গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। ৩ মার্চ মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান শ্রী তারাপদ মজুমদারের পৃষ্ঠ পোষকতায় এ সংবর্ধনার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। হেমন্ত কুমার সরকার তাঁকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা ও সহযোগিতা দান করেন। গোপীপদ চট্রোপধ্যায়, মাহতাব উদ্দীন আহমদ, ফজলুল বারী চৌধুরী, হারুন-অর রশীদ, গোলাম রহমান, নিশিকান্ত পাত্র, তাজউদ্দীন আহমদ (তাজু মিঞা) প্রমূখ ঘনিষ্ঠভাবে এ সংবর্ধনার আয়োজনে জড়িত ছিলেন।
বিকালে স্থানীয় যতীন্দ্র মোহন হলে এ সংবর্ধনা সভা বসে। এতে স্থানীয় যুবক আবদুর রহমান (১৯০৪-১৯৮০) ও তোফাজ্জল হোসেন কবি-প্রশস্তিমূলক স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। সভায় কবি নিজ কণ্ঠে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। সংবর্ধনার উত্তরে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘আজ আপনারা আমায় যে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেছেন এ শুধু আমার প্রাপ্য নয়, যুগে যুগে যত কবি এসেছেন তাঁদেরও প্রাপ্য। আপনাদের এ দান বাকরূপে তাঁদের দরবারে পৌছে দেওয়াই আমার কাজ। এ সংবর্ধনা সভায় শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
কুষ্টিয়ার পার্শ্ববর্তী থানা কুমারখালীতেও কবিকে নিমন্ত্রণ করে নেওয়া হয় এবং এক সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ সংবর্ধনার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন আবদুর রহমান। অন্যসহ-উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল গণি, শ্রী ভোলানাথ মজুমদার, গোঁড়া মৈত্র ও আরো ক’জন স্কুলছাত্র। কুমারখালীর যোগেন্দ্রনাথ এম.এই. স্কুলমাঠে কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। তিনি এ সংবর্ধনা সভায় ‘জাতের নামে বজ্জাতি” গানটি পরিবেশন করেন। আবৃত্তি করলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। কুমারখালীর মাটি ও মানুষ সেদিন নজরুলকে সংবর্ধনা দিতে পেরে ধন্য হয়ে উঠেছিলো।
জানা যায় যে, কুমারখালীতে নজরুল বিপ্লবী সাহিত্য সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের (১৮৩৩-১৮৯৬) প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কাঙাল কুটিরেও গমন করেছিলেন।
সেবার সম্মেলনে এসে তিনি হেমন্ত কুমার সরকার ও নিশিকান্ত পাত্রসহ সাংগঠনিক কাজে শহর থেকে কিছু দুরে গড়াই নদীর অপর পারে হাটশ হরিপুর গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা কংগ্রেস ও খেলাফত কর্মী রেজওয়ান আলী খান চৌধুরীর বাড়ীতে উঠেন। তখন বেলা প্রায় ১১টা। কবি বৈঠক খানায় বসা মাত্র বহুজন তাঁকে দেখতে আসে। বেলা ৪টার দিকে খান সাহেব হারুন-অর রশীদ ও খেলাফত কর্মী গোলাম রহমান এসে কবিকে তাঁদের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। তিনি গোলাম রহমানদের প্রশস্থ বারান্দায় উঠলেন। দেখতে দেখতে সে বারান্দা প্রাঙ্গণ লোকে ভরে গেলো। কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট কবিয়াল আফাজ উদ্দিন সরকার ও রওশন আলী মিয়াও এলেন। এঁরা সকলের পক্ষ থেকে কবিকে গান শোনাবার অনুরোধ করেন।
সেদিন বিকেলেই কবি শিকারে বের হন। শিকার মেলে একটি হরিয়াল ও একটি ঘুঘু। সন্ধ্যায় শুরু হয় গানের আসর। হারমোনিয়ামযোগে কবি প্রথমে গাইলেন ‘আসে বসন্ত ফুল বনে”। তার পরে ক্রমান্বয়ে ‘আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই, চল্ চল্ চল্ , ‘বাজলো কি রে ভোরের সানাই’-এমনি করে একটির পর একটি অনেকগুলো গান। তারাবির নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় আসর বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারেনি। শ্রোতারা পরের দিন গানের আসর বসানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু পর দিন অজ্ঞাত কারণে সে অনুরোধ রতি হয়নি। পরদিন সকালেই তাঁরা এখান থেকে চলে যান।

নজরুল ইসলাম কুষ্টিয়ায় এসেছেন মুলতঃ রাজনৈতিক কারণে। দীর্ঘদিন তিনি কুষ্টিয়ায় অবস্থানও করেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন এদিক -ওদিক। কুষ্টিয়ার মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছে সেদিন।
চুয়াডাঙ্গা
নজরুল ইসলামের চুয়াডঙ্গায় আগমন নানা কারনে আলোচিত বিষয়। ঐতিহাসিকসূত্রে জানা যায় যে, কবি ১৯২৮সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার অন্তর্গত কার্পাসডাঙ্গা গ্রামে এসেছিলেন। এ সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন শ্বাশুড়ি গিরিবালা, স্ত্রী প্রমীলা ও শিশুপুত্র বুলবুল। নৌকাযোগে উজানে যাওয়ার প্রতিকূলতা ছিলো বলে তাঁরা কৃষ্ণনগর হতে দর্শনা পর্যন্ত ট্রেনে আসেন। পরে দর্শনা থেকে গরুর গাড়ীতে করে কার্পাসডাঙ্গায় পৌঁছেন।
কবি ও তাঁর পরিবার এখানে মহিম সরকারের পরিবারের আতিথ্য গ্রহণ করেন। মহিম সরকারের স্ত্রী তাঁদেরকে আপন জনের মতোই আদর-আপ্যায়ন করেন। তাঁরা এখানে ক’দিন বেড়ান। এ সময় তাঁরা নিশ্চিন্তপুরেও যান।
ধারণা করা হয় যে, কার্পাসডাঙ্গার খ্রিস্টান পল্লী থেকেই কবি তাঁর বিখ্যাত ‘মৃত্যু ক্ষুধা’ উপন্যাসের প্লট পরিকল্পনা করেছিলেন। তাছাড়া ‘লিচুচোর’ কবিতাটিও এখানে রচিত হয়ে থাকতে পারে। তবে অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, “আমার কোন কুলে আজ ভিড়লো তরী” এই বিখ্যাত গানটি কবি কার্পাসডাঙ্গায় বসে রচনা করেছিলেন। নজরুল ইসলামের এ সফর  ব্যক্তিগত বা পারিবারিক না রাজনৈতিক হুলিয়া মাথায় নিয়ে সংগঠিত হয়েছিলো তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। সম্মানিত পাঠক, বিষয়টি নিয়ে আমি স্বতন্ত্র গবেষণা করছি। তাড়াতাড়ি বিষয়টি আপনাদের সামনে স্পষ্ট করার চেষ্টা করবো।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।