বিশ্বে ৮৮ কোটি ৮০ লাখ শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত

49

সমীকরণ প্রতিবেদন:
স্কুল আবার খোলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিভিন্ন দেশের সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘প্যান্ডেমিক ক্লাসরুম’ উদ্বোধন করেছে ইউনিসেফ। অপরদিকে ইউনেস্কোর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, পুরোপুরি ও আংশিকভাবে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী ৮৮ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুর পড়াশোনা অব্যাহতভাবে বাধার মুখে পড়ছে। ১৪ দেশের মধ্যে পানামাই সবচেয়ে বেশি দিন স্কুল বন্ধ রেখেছে। এরপর এল সালভেদর, বাংলাদেশ ও বলিভিয়ার স্কুল বেশি দিন বন্ধ আছে। যদিও এ মাসের ৩০ তারিখ বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ খোলার কথা রয়েছে। করোনা মহামারির কারণে বিশ্বে ১৬ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুর স্কুল প্রায় এক বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ। এছাড়া বিশ্বব্যাপী তিন-চতুর্থাংশের বেশি, প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ বা প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন ব্যক্তিগত শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ হারিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) স্কুল বন্ধ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ৩ মার্চ ইউনিসেফ নতুন এ তথ্য প্রকাশ করে।
স্কুল বন্ধ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ১৪টি দেশের বেশির ভাগ স্কুল গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। দেশগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের, যেসব দেশে প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ স্কুলগামী শিশুর ওপর এর প্রভাব পড়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেছেন, ‘আমরা যখন কোভিড-১৯ মহামারির এক বছর পূর্তির দিকে এগোচ্ছি, তখন বিশ্বব্যাপী শিক্ষাক্ষেত্রে লকডাউন যে ভয়াবহ জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করেছে, তা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়। যতই দিন যাচ্ছে, শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে ততই পিছিয়ে পড়ছে, যেখানে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শিশুদের সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। কাজেই আমরা এমন আরও একটি বছরে পদার্পণ করতে পারি না, যেখানে শিশুরা স্কুলে হাজির হয়ে শিক্ষা গ্রহণের সীমিত সুযোগ পাবে বা একেবারেই পাবে না। স্কুলগুলো খোলা রাখার বিষয়ে বা পুনরায় খোলার পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রচেষ্টা বাদ রাখা উচিত নয়।’
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি টোমো হোজুমি ৩০ মার্চ স্কুল পুনরায় চালু করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে একত্রে ইউনিসেফ বিদ্যালয়গুলো নিরাপদে পুনরায় চালু করতে সহায়তা দিতে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছে।’ শিশুদের পড়াশোনা ও সার্বিক সুস্থতার ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ রাখার পরিণতি ধ্বংসাত্মক বলে মনে করছে ইউনিসেফ। সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা এবং যারা দূরশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় না, তারা আর কখনো ক্লাসরুমে ফিরতে না পারার এবং এমনকি শিশুবিয়ে বা শিশুশ্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্কুলগামী শিশুদের বেশির ভাগই স্কুলগুলোর ওপর নির্ভর করে। কারণ, এতে তারা তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, সহায়তা চাইতে পারে, স্বাস্থ্য ও টিকাদান পরিষেবা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারে। যত বেশি সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকবে, তত বেশি সময় ধরে শিশুরা তাদের শৈশবের এই গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে।
‘প্যান্ডেমিক ক্লাসরুম’ উদ্বোধন :
শিক্ষা কার্যক্রমের এই জরুরি অবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবং স্কুলগুলো খোলা রাখতে বা পুনরায় খোলার পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সরকারগুলোর মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য ইউনিসেফ ৩ মার্চ ‘প্যান্ডেমিক ক্লাসরুম’ উদ্বোধন করেছে। এটি ১৬৮টি খালি ডেস্ক দিয়ে তৈরি এমন একটি মডেল শ্রেণিকক্ষ, যেখানে প্রতিটি ডেস্ক এক মিলিয়ন শিশুকে প্রতিনিধিত্ব করে, যারা এমন দেশে থাকে, যেখানে প্রায় এক বছর ধরে স্কুল বন্ধ রয়েছে। প্রতীকী এই ডেস্কগুলো বিশ্বের প্রতিটি কোনায় খালি থাকা ক্লাসরুমগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
হেনরিয়েটা ফোর বলেন, ‘এই শ্রেণিকক্ষটি খালি পড়ে থাকা লাখো শিক্ষাকেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করে, যেসব কেন্দ্রের অনেকগুলো প্রায় এক বছর ধরে শিক্ষার্থীশূন্য। প্রতিটি খালি চেয়ারের পেছনে একটি ফাঁকা স্কুলব্যাগ ঝোলানো আছে, যা একটি শিশুর থেমে যাওয়া সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎকে অনির্দিষ্টকালের বিরতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এই বিষয়টিকে অস্পষ্ট করে তুলতে আমরা আর বন্ধ দরজা ও বন্ধ ভবন চাই না। এই ‘প্যান্ডেমিক ক্লাসরুম’টি সরকারের প্রতি একটি বার্তা। আমাদের অবশ্যই স্কুল পুনরায় খোলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং স্কুলগুলোকে আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে খোলার বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’ বিশ্বজুড়ে সংক্রমণের হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় স্কুলগুলো খোলা রাখতে প্রচেষ্টাই বাদ দেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করছেন জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর।
এদিকে শিক্ষার্থীরা যখন আবার ক্লাস রুমে ফিরবে, তখন তাদের পুনরায় মানিয়ে নিতে এবং পড়াশোনার ঘাটতি মোচনে প্রয়োজন হবে সহায়তার। স্কুল পুনরায় খোলার পরিকল্পনাগুলোতে অবশ্যই শিশুদের পড়াশোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের বিকাশ এবং সার্বিক কল্যাণের জন্য স্কুলে প্রতিকারমূলক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃত পরিষেবা নিশ্চিত করাসহ প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্যান্য প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ইউনিসেফ সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়। ইউনেসকো, ইউএনএইচসিআর, ডব্লিউএফপি ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে ইউনিসেফের জারি করা স্কুল পুনরায় চালু করার কাঠামোতে জাতীয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ রয়েছে।