চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৪ জানুয়ারি ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিনিয়োগ মন্দায় বাড়বে বেকারত্ব

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ১৪, ২০২৩ ৫:২২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন:
চলতি বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমবে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে। শুধু তা-ই নয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যে মন্দাভাব বিরাজ করছে, তার জেরে বিনিয়োগ কমবে; বাড়বে বেকারত্ব। শ্রমের মূল্য কমে যাবে। উৎপাদনশীলতাও কমবে। এছাড়া কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ফসল উৎপাদন কমবে। এতে খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। অর্থনৈতিক চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেশের অর্থনীতিবিদরা এ আশঙ্কা করছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশে মূল্যস্ফীতি আকাশ ছুঁয়েছে। চলতি বছরে এ হার আরও বাড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মুদ্রা মানের আরও পতন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এদিকে এরইমধ্যে শিল্পে বিনিয়োগে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, সে চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) পরিমাণ ২০২২-এর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এর আগের বছরের তুলনায় ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে ৯২৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ৬০৬ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। ২০২২ এর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও উলেস্নখযোগ্যভাবে বাড়েনি। একইভাবে, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা কমেছে। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতার পেছনে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, ডলারের চড়া দাম, জ্বালানি স্বল্পতা ও সর্বোপরি অনিশ্চিত পরিস্থিতি দায়ী। অনিশ্চয়তায় কমে গেছে শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি। ডলার সংকট ও অর্থনীতিতে অস্থিরতার কারণে শিল্প স্থাপনের নতুন প্রকল্প, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সংস্কারের উদ্যোগ কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকের ভাষ্য, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। অনেক দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এ অবস্থায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, তবে এটা স্থায়ী নয়। দেশীয় প্রবৃদ্ধি অবিচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি কৌশল ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে আমদানি হওয়া মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশই ব্যবহৃত হয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস ধরে তৈরি পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশ কম। এছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চিয়তা রয়েই গেছে। শীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি কোন দিকে গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে শিল্পমালিকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন কোনো পরিকল্পনায় কেউ যাচ্ছেন না। অতি প্রয়োজনীয় হলেই কেবল কেউ কেউ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করছেন।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘শিল্পমালিকরা কেউ কেউ চলমান সংকটের আগেই মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র খুলেছিলেন। তারা বাধ্য হয়ে যন্ত্রপাতি আমদানি করেছেন। তবে যারা ঋণপত্র খোলেননি, তারা হাত গুটিয়ে রেখেছেন। এতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হলেও কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনে আসা সম্ভব হবে না।’ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘গত এক-দেড় বছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তার প্রধান কারণ পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তাই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছিলেন। বর্তমানে রপ্তানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি নেই। সে কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ কমে আসছে। এতে করে নিকট ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যেতে পারে।’ ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, ‘মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি মানেই নতুন বিনিয়োগ। অর্থনীতির এই অস্থিরতার মধ্যে কেউ নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে আমদানি বন্ধ রয়েছে। উচ্চ মূল্য থাকায় আমদানি কমিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা আর সরকারও অপ্রয়োজনীয় আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ এনেছে। মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল হলে ফের আমদানি বাড়তে পারে।’
এদিকে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দায় সদ্য বিদায়ী বছরে বেকারত্বের বহর দীর্ঘ হওয়ার চিত্রও বেশ আগে থেকেই স্পষ্ট। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির গলায় বেকারত্বের কাঁটা চলতি বছর আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোভিড অতিমারির পর থেকেই দেশের সংগঠিত এবং অসংগঠিত দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক কর্মী-ছাঁটাই হয়েছে। পাশাপাশি, দুই ক্ষেত্রেই লেবার ড্রপ-আউটের সংখ্যা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। কাজ ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে, অতিমারি পরবর্তীকালে অনেকেই আর ফেরত আসেননি কাজে। এই অবস্থায় সার্বিকভাবেই শ্রম-সংকট তৈরি হয়েছে দেশে। তবে মাসভিত্তিক বেকারত্ব বৃদ্ধির কোনো পরিসংখ্যান কেউ তৈরি করেনি। এদিকে দেশে বেকারের মোট সংখ্যা কত? এ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যের মধ্য আগে থেকেই বিশাল ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে- দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তবে ২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা তিন কোটি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বেকারত্বের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে যে উপায় ও সংজ্ঞায় বেকারত্ব নিরূপণ করা হয়, সে সংজ্ঞা অচল এবং অবাস্তব। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি সম্পর্কিত জরিপে বেকারত্বের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে- ‘১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের এমন ব্যক্তিকে বেকার বিবেচনা করা হয়েছে, যে সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করা বা কাজের জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ করেনি।’ তবে অর্থনীতিবিদরা এই সংজ্ঞার সঙ্গে একমত নন। তাদের দাবি, এই সংজ্ঞা বাংলাদেশে বেকারত্বের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আংশিক কর্মসংস্থান সম্পর্কিত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এই সংজ্ঞা মোট দেশজ উৎপাদনের অন্য উপাদানের মধ্যকার মৌলিক ভারসাম্যহীনতাকেই প্রতিফলিত করে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) হিসাবে, করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারালেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন অন্তত ৫ কোটি মানুষ (প্রতি পরিবারে গড়ে চারজন করে সদস্য)। বেসরকারি আরেক হিসাবে, করোনাকালে ৩৫ লাখ থেকে সাড়ে ৬ কোটি মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছেন, যাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত বলা হয়, তাঁদের বেশিরভাগ করোনা মহামারিতে চাকরি কিংবা কাজ হারিয়ে, বেতন কমে দরিদ্র অবস্থানে এসে পড়েছেন। একে ‘আংশিক বেকারত্ব’ বলা হচ্ছে। তাঁদের কারও কাছে চেয়ে কিংবা হাত পেতে নেওয়ার অভ্যাস নেই। করোনা-পরবর্তীতে এদের একটি বড় অংশ আর আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারেননি। এর উপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অর্থনৈতিক নানা সংকটে বিনিয়োগ মন্দায় বেকারত্বের হার ধাপে ধাপে আরও বেড়েছে। চলতি বছর বেকারত্বের প্রবৃদ্ধি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।