চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ১০ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিদেশী দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে যেতে পারে দেশ

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ১০, ২০২২ ১২:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পর বাংলাদেশ বিদেশী দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ সবুজ (স্বস্তিকর) অবস্থানে আছে। এটি ধীরে ধীরে হলুদ অবস্থানে (অস্বস্তিকর) যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আপাতস্বস্তি নাও থাকতে পারে। এখন আমরা বিদেশী দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে বেশি মূল্যে বেশি ঋণ করছি। যেমন চীন, রাশিয়া ও ভারত। এসব দেশের ঋণের রেয়াতি সময় (গ্রেস পিরিয়ড) শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরবরাহকারী ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু দায়দেনা ৪৩২ ডলার। অন্য দিকে পাইপলাইনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো সাশ্রয়ী ঋণ ব্যবহার করতে পারছি না। সাংবাদিকদের সাথে গতকাল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত বাংলাদেশের সরকারি দায়দেনা শীর্ষক আলাপচারিতায় নাগরিক প্ল্যাটফর্ম কনভেনর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। তিনি একটি লিখিত উপস্থাপনায় সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বহুপক্ষীয় উৎসের বদলে আমরা দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছি। অথচ পাইপলাইনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো সাশ্রয়ীঋণ ব্যবহার করতে পারছি না। বিদেশী দায়দেনার দেশী উৎসের দায়দেনাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গত তিন বছরে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী দুই উৎস থেকেই ঋণ নেয়া বেড়েছে। আবার বিগত দু’টি জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর, নির্বাচনের বছর ও পরের বছর ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দেশের দায়দেনা পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় নির্বাচনী চক্র সূচক হিসেবে উঠে আসছে।
বাংলাদেশে কি শ্রীলঙ্কার মতো সঙ্কট হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি তা দেখি না। কোনো দেশের সাথে অন্য দেশের তুলনীয় নয়। মূল বিষয় হলো, শ্রীলঙ্কা থেকে কী শিখলাম। একসময় আমাদের দেশেও বন্ড ছাড়ার ধোয়া উঠেছিল। সরকার এই বিষয়ে রক্ষণশীল ছিল। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে ওই দেশের বিশেষজ্ঞরা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তবু দেশটির সরকার তা করেছে।
একটি হিসাব তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের সার্বিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি দায়দেনা ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। মাথাপিছু সরকারি দায়দেনা ৪৩২ ডলার। তিনি মনে করেন, সরকারি ঋণ পরিশোধসহ সার্বিক দায়দেনায় পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে হলে বিদেশী ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণ, ব্যক্তি খাতের ঋণ, সরকারের সংযুক্ত দায়দেনাও বিবেচনায় আনা উচিত। এসব হিসাবে আনা হলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়ন থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলার করে দায়দেনা বাড়াচ্ছি। ০.৭ বিলিয়ন ডলার করে প্রতি বছর দেনা পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। দায়দেনা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি হারে বাড়ছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দেনা বৃদ্ধির হার খুবই বেশি। অভ্যন্তরীণ দায়দেনা ৬৯ বিলিয়ন ডলার। গত এক দশকে ওই দেনা বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের পরে এই বৃদ্ধির হার ১৫ থেকে ১৯ শতাংশ হারে বাড়ছে। অপর দিকে বৈদেশিক দায়দেনার পরিমাণ ৬০.১৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক দায়দেনা ১৬.৬ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ এবং ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৪.৭ থেকে ১৬.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ঋণের সুদ পরিশোধের হিসাব করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালে বৈদেশিক সুদ পরিশোধ করা লাগত ৩৮.৯১ শতাংশ ও অভ্যন্তরীণ ৬১.০৯ শতাংশ। ২০১৩ সালের পর ঋণ বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের হার বেড়েছে। ২০২১ সালে এসে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে ৬৭.৬৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ৩২.৩৫ শতাংশ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ উল্টোচিত্র। এর কারণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ হচ্ছে ক্রমান্বয়ে উচ্চ সুদের হারে।
ড. দেবপ্রিয় মনে করেন, সরকারি দায়দেনা পরিস্থিতি পাঁচ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যেমন বিনিময় হারের ঝুঁকি বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার বাড়ছে, বিদেশী ঋণের সুদহার বাড়ছে, উচ্চমূল্যে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা হ্রাস পাওয়া। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগের ও পরের বছরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থপাচারের পরিমাণ বেড়ে যায়। গ্লোবাল ইন্টিগ্রিটির তথ্য সেটাই বলছে। গণতান্ত্রিক অস্থিতিশীলতা ও আস্থার সঙ্কট দেখা দিলে এ ধরনের প্রবণতা বেড়ে যায়।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি ঋণও গত ১০ বছরে অনেকটা বেড়েছে। বেসরকারি খাতে যারা নমনীয় লাইবর হারে ঋণ নিয়েছেন তাদের সুদহার বাড়ছে। এই বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, এই ঋণ খেলাপি হলে দেশের ঋণমানে প্রভাব পড়বে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।