বিতর্কের মুখে চার বছর শেষ

49

আগামী বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদায়, নজিরবিহীন কম ভোটার উপস্থিতি ছিল এই আমলে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
নানা বিতর্কের মধ্যদিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের চার বছর শেষ হচ্ছে আজ। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়। এর পরই সংসদ নির্বাচন নিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু প্রথম বছরে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ ও নির্বাচনী আইন সংস্কার কাজের কোনো অগ্রগতি করতে না পারলেও কুমিল্লা ও রংপুর সিটি ভোটের সাফল্য ইসির ঝুলিতে যুক্ত হয়। কিন্তু বিগত তিন বছরে ইসি-সচিব দ্বন্দ্ব, নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে বর্তমান কমিশন। সর্বশেষ গত বছর করোনা মহামারীর মধ্যে ভোট আয়োজন করে ইতিহাসের সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতির নজির সৃষ্টি করে বর্তমান কমিশন।
সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনের প্রশিক্ষণে ‘বিশেষ বক্তা’ ও ‘কোর্স উপদেষ্টা’ হিসেবে বক্তৃতা দিয়ে টাকা নেওয়ায় সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা অডিট আপত্তির মুখে পড়েছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থসংশ্লিষ্ট গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ এনে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের’ মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের ৪২ জন নাগরিক। এ ছাড়া দফায় দফায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে আলোচনায় ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। এদিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। তবে ইসি নিয়োগের আইন তৈরির বিষয়ে বর্তমান কমিশন এখানো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে বিগত ড. শামসুল হুদা কমিশনের আমলে ইসি নিয়োগের বিষয়ে একটি আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয়ে ওই সময়কার নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বলেন, ‘আমরা একটি আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। কমিশন সব সময়ে সরকারকে আইনের বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে।’
প্রথম বছরেই বিতর্কে জড়ান সিইসি :
২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে কমিশন। তবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঘোষিত রোডম্যাপের কাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ছিল না। নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওই সময় সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করা কিংবা নির্বাচনী আইন সংস্কারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি ইসি। তবে রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জনের স্বস্তি নিয়ে প্রথম বছর পূর্তি করে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। নতুন ইসি গঠনের পর মার্চে কুমিল্লা সিটির সুষ্ঠু নির্বাচন এবং বছর শেষে রংপুরের ভোটের সাফল্য যুক্ত হয়েছে এ ইসির ঝুলিতে। কোনো ধরনের গোলযোগ, সহিংসতা, কারচুপি ও অনিয়ম না থাকায় ওই সময় রংপুর সিটি ভোটকে ‘মডেল’ নির্বাচন বলছেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া ওই বছর ছোটখাটো নির্বাচনেও সুনাম কুড়িয়েছে নূরুল হুদা কমিশন। আর দায়িত্ব পালনের প্রথম বছরে সুষ্ঠু ভোট করে দলগুলোর কিছুটা আস্থায় আসে কমিশন। সব মিলিয়ে ওই সময় স্থানীয় সরকারের নির্বাচন এবং সংলাপে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের অংশগ্রহণের কারণে প্রথম বছরে স্বস্তিতে ছিল নির্বাচন কমিশন। যদিও সংলাপে জিয়াউর রহমানকে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা’ বলায় সিইসিকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সৃষ্টি হয় নানা বিতর্কের। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিইসি হিসেবে কে এম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদাত হোসেন চৌধুরী যোগ দেন কমিশনে।
ইসি ও সচিব দ্বন্দ্ব :
শুধু ভোটার উপস্থিতি নয়, নানা কারণে নির্বাচন কমিশন আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছিল। গত বছর আগস্টে ইসির ৬৭তম সভায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সচিবের ওপর আবারও প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন চার নির্বাচন কমিশনার। আইন সংস্কার কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন আইন, ২০২০’-এর খসড়া কমিশনের জন্য উপস্থাপন এবং কমিশনারদের না জানিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি নিয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খসড়া আইনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের প্রচলিত নাম ও পদবি পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়ে ইসি। এর আগে কমিশনে নিয়োগ ও কমিশনারদের পাশ কাটিয়ে ফাইল অনুমোদন দেওয়া নিয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে চার কমিশনার একযোগে সিইসি ও সচিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
করোনায় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক :
করোনা মহামারীর মধ্যে ভোট আয়োজন করে বিতর্কের মুখে ছিল নির্বাচন কমিশন। গত বছর ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পরে ২১ মার্চ জাতীয় সংসদের তিনটি আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে ইসি। ওই সময় বিভিন্ন মহল থেকে তিন উপনির্বাচন স্থগিত করার দাবি উঠেছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরও বলছিল, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণে অটল থাকে ইসি। ২১ মার্চ ভোট গ্রহণ হয় তিন নির্বাচনের। তবে ওই দিন নির্বাচনী এলাকায় ভোটার উপস্থিতি হয় নগণ্য সংখ্যক। নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয় কম ভোটার উপস্থিতির। ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫.২৮ ভাগ। পরে সমালোচনার মুখে ২৯ মার্চের চট্টগ্রাম সিটিসহ বেশ কিছু নির্বাচন স্থগিত করে কমিশন। অক্টোবর থেকে আবারও শুরু হয় নির্বাচন। তবে করোনাকালে গত বছরের সব নির্বাচনেই প্রায় ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। এদিকে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থসংশ্লিষ্ট গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ এনে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের’ মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের ৪২ জন নাগরিক। বিশিষ্ট নাগরিকদের এমন অভিযোগের কারণে দেশব্যাপী ইসি নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। তিনি বলেছেন, ইসিকে দায়ী করে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তা অনভিপ্রেত ও আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
নাম পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কে পড়ে ইসি :
নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করে। পরে বিতর্কের মুখে ইসি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদের নাম পরিবর্তন করে ‘পল্লিপরিষদ’, পৌরসভার নাম পরিবর্তন করে ‘নগরসভা’ আর সিটি করপোরেশনের পরিবর্তে ‘মহানগর সভা’ করার প্রস্তাব করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবও করেছিল ইসি। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের স্থলে ‘পল্লিপরিষদ প্রধান’, পৌরসভার মেয়রের পদবি পরিবর্তন করে ‘পুরাধ্যক্ষ’ আর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদবি পরিবর্তন করে ‘মহানগর আধিকারিক’ এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান যথাক্রমে ‘উপজেলা পরিষদ প্রধান ও উপপ্রধান’ করার প্রস্তাব হয়েছিল। পরে গত বছর আগস্টের কমিশন সভায় নাম পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত আসে।
নজিরবিহীন কম ভোটার উপস্থিতি ছিল :
গত বছরের শুরুতে ১৩ জানুয়ারি উপনির্বাচন হয় চট্টগ্রাম-৮ আসনে। ভোট গ্রহণের হার ছিল ২২.৯৪ শতাংশ। ১ ফেব্রুয়ারি ভোট হয় ঢাকার দুই সিটিতে। এর মধ্যে উত্তরে ভোট পড়েছিল ২৫.৮৬ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯.০৭ শতাংশ। করোনা শুরু হলে ২১ মার্চ ভোট হয় ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে। এর মধ্যে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে সর্বনিম্ন। ভোটের হার ছিল ৫.২৮ শতাংশ। গাইবান্ধায় ভোটের হার ছিল ৫৯.৩৬ শতাংশ এবং বাগেরহাটে ৫৯.৪৪ শতাংশ। এরপর ১৭ অক্টোবর ভোট হয় ঢাকা ও নওগাঁয়। এর মধ্যে ঢাকা-৫ আসনে ভোটের হার ছিল ১০.৪৩ এবং নওগাঁ-৬ আসনে ৩৬.৫০ শতাংশ। ১২ নভেম্বর ভোট হয় ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনে। এর মধ্যে ঢাকা-১৮ আসনে ভোটের হার ছিল ১৪.১৮ এবং সিরাজগঞ্জে ৫১.৭৬ শতাংশ। এমন কম ভোটার উপস্থিতির দায় দলগুলোর প্রতি দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। ঢাকার দুই সিটির ভোটের দিন সিইসি বলেন, ইসি ভোটের পরিবেশ তৈরি করে। তারা ভোটার আনে না। ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকার দায় প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর। এর দায় নির্বাচন কমিশনের নয়।