চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৩ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিএনপির সামনে কঠিন যেসব চ্যালেঞ্জ

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ১৩, ২০২১ ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে এখন তিনটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে- দলের কারাবন্দী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি আদায় এবং দল পুনর্গঠন শেষে জাতীয় কাউন্সিল ছাড়াও একটি জোরালো আন্দোলন করা। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি কঠিন এসব চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবেলা করবে সেটাই মুখ্য বিষয়। যদিও সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যু যেমন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে লাগাতার কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতেÑ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান-দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে বেগম জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরদার করা বিএনপির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দল পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও সিনিয়র অনেক নেতা ক্ষুব্ধ। তবে বিএনপিতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই দাবি করে দলটির নেতারা বলছেন, এই মুহূর্তে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জনগণের রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। আর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। কারণ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়ার মুক্তি আজ একাকার হয়ে গেছে। এটি শুধু বিএনপির না, সমগ্র দেশবাসীর জন্য চ্যালেঞ্জ।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঘুরে দাঁড়াতে দল পুনর্গঠন শুরু করে বিএনপি। কিন্তু বিগত তিন বছরেও তা সম্পন্ন হয়নি। এবার আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে দল পুনর্গঠন শেষ করতে সময় নির্ধারণ করেছে দলটির হাইকমান্ড। ২০১৯ সালের মার্চে নির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও আর কাউন্সিল হয়নি। কবে নাগাদ কাউন্সিল হবে সেটাও অনিশ্চিত। অবশ্য দলটির নেতারা বলছেন, দল পুনর্গঠন শেষে উপযুক্ত সময়ে বিএনপির কাউন্সিল হবে। কেননা, দুর্নীতির দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার মুক্তির দাবিতে গত প্রায় চার বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ অসংখ্য কর্মসূচির পাশাপাশি আইনি লড়াইয়ে আস্থা রেখেছিল দলটি। যদিও দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির জন্য কঠোর কর্মসূচি দিতে বিএনপির হাইকমান্ডের ওপর তৃণমূলের চাপ অব্যাহত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কঠোর আন্দোলনে যায়নি দলটি। গতানুগতিক ও সাদামাটা অহিংস কর্মসূচিই পালন করে আসছে বিএনপি।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে বিএনপির কোনো আগ্রহ নেই। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থাটা এখন এই সরকারের হাতে বিনষ্ট হয়ে গেছে। নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার না থাকলে নির্বাচন কমিশন কিছুই করতে পারে না। সে কারণেই আমরা বিগত নির্বাচনগুলো বর্জন করেছি। ইসি গঠনে ইতঃপূর্বে সার্চ কমিটিতেও অভিমত দিয়েছি। কিন্তু এই সরকার কোনো কিছু গ্রহণ করে নাই। সে কারণেই আমাদের পুরাতন দাবি নির্বাচনের সময়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে হবে। তিনি বলেন, জেলাপর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন করে বিএনপির কাউন্সিল করবে। সেভাবেই আমাদের প্রস্তুতি চলছে। মহামারী করোনার প্রকোপের কারণে বন্ধ থাকা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এরই মধ্যে পুরোদমে শুরু হয়েছে। জেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

জানা গেছে, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যেই বিএনপিসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের সময় নির্ধারণ করেছে বিএনপি। বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন যেমনÑ ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল তাদের তৃণমূল কমিটি গঠনপ্রক্রিয়া শেষ করেছে। তবে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনে এগিয়ে আছে। গত ৬ নভেম্বর জাসাসের নতুন আহ্বায়ক কমিটি এবং তার আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর কৃষক দলের নতুন কেন্দ্রীয় (আংশিক) কমিটি গঠন করা হয়েছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শ্রমিক দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতী দল, ওলামা দল ও মহিলা দলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি যুবদল, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর স্বেচ্ছাসেবক দল, ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল, ২০১৪ সালের এপ্রিলে শ্রমিক দল, ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মহিলা দল, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল তাঁতী দল, ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মৎস্যজীবী দল এবং ২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষে এখন পর্যন্ত কাউন্সিল করতে পারেনি এসব সংগঠনের নেতারা। বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। সব মিলিয়ে দলটির পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের তথ্য মতেÑ সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক শাখা রয়েছে ৮০টি। তন্মধ্যে আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হয় ৪২টিতে, আংশিক কমিটি হয় দু’টিতে আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি আছে ১৫টি ইউনিটে। সম্প্রতি টাঙ্গাইল জেলা, বরিশাল জেলা উত্তর ও দক্ষিণ এবং বরিশাল মহানগরে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক তৎপরতা চলমান প্রক্রিয়া। কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন শুরুর পর সারা দেশে বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন উজ্জীবিত। সরকারের বাধাবিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন স্থগিত থাকায় পুনর্গঠনটা হয়ে ওঠেনি। এখন উপজেলা ও পৌর কমিটির কাউন্সিল চলছে। পর্যায়ক্রমে জেলা কমিটির নেতা নির্বাচন হবে কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমে।

জানা যায়, দুই বছরেরও বেশি সময় আগে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের প্রস্তুতির ঘোষণা বিএনপিকে আরো বেশি উদ্বিগ্ন করে তোলে। সরকারের এমন কৌশলকে ‘পাতানো ফাঁদ’ হিসেবেই ভাবছে দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন- তাদেরকে অপ্রস্তুত রেখেই আবারো যেনতেনভাবে আরেকটি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন না হলে এবং বর্তমান সরকার কাঠামোর মধ্যে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হলে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে হিসেবে নির্বাচনের আরো দুই বছর বাকি। এরই মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় হঠাৎ করেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার দিকনির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার ওই ঘোষণায় বিএনপি কিছুটা হকচকিয়ে ওঠে। তবে নির্বাচন নিয়ে এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি নয় বিএনপি।

আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী নির্বাচনে এই রেজিমের (আওয়ামী লীগ) অধীনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না। শুধু তাই নয় কোনো আলোচনায় বিএনপি যাবে না। কারণ আমরা বিগত দিনে আলোচনাও করেছি, নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছি। তার ফলাফল দেশের মানুষ পেয়েছে, বিশ্ববাসীর কাছে এটা পরিষ্কার দিনের আলোর মতো। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট- একমাত্র নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আলোচনা শুরু হতে পারে। বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করতে হলে এখন থেকে পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কারণ, ইতোমধ্যে সরকারের মেয়াদের অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেছে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করলেই সরকার তা মেনে নেবে না। তাই এ দাবি আদায়ে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।