বাউল গানে দর্শক মাতাবেন কুদ্দুস বয়াতী

43

চুয়াডাঙ্গার সরিষাডাঙ্গায় ঐতিহ্যবাহী বিশু শাহ্ বাউল মেলা আজ
সমীকরণ প্রতিবেদক:
সমগ্র বাংলাদেশকেই বলা যায় বৃহৎ এক মেলার দেশ। দেশের এমন কোনো জনপদ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বছরের কোনো না কোনো সময়ে মেলা বসে না। বাঙলির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে খুঁজে পাওয়ার সব থেকে সহজ মাধ্যম হলো গ্রামবাংলার বিভিন্ন লোকজ মেলা। বাউল মেলা সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপের অনুসন্ধান আর এটাই বাউল ধর্মদর্শনের প্রধান উৎসব। বাউলদের বিচিত্র জীবন দর্শন আর বাউলভক্তদের নিয়েই প্রতিবারের মতো এবারও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের সরিষাডাঙ্গা গ্রামের আধ্যাত্মিক সাধক বিশু শাহ্-এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বার্ষিক ওরস মোবারক ও বাউল মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আজ শুক্রবার এ বাউল মেলার উদ্বোধন করা হবে। প্রত্যেকবার তিন দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এবার শুধু এক দিন এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিশু শাহ্ মাজার কমিটির সভাপতি আব্দুস সালাম জোয়ার্দ্দার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুবোল বোস মনি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সরিষাডাঙ্গা টাইগার স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী রাসেল আরেফিন পলাশ, হারদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদ মাসুম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এমএ মারুফ। প্রতিবারের ন্যায় এবারও প্রথম পর্বের উপস্থাপনা করবেন দৈনিক সময়ের সমীকরণের বার্তা সম্পাদক ও জাতীয় পত্রিকা দৈনিক নয়া দিগন্তের জেলা প্রতিনিধি হুসাইন মালিক। এ ছাড়া সংগীতপর্বগুলোর উপস্থাপনায় থাকবেন কণ্ঠশিল্পী হিরন উর রশিদ শান্ত ও সাংবাদিক অনিক সাইফুল। মেলাটি সার্বিক পরিচালনা করবেন মোমিনপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জোয়ার্দ্দার।
এ বাউল মেলার সার্বিক দায়িত্বে থাকা মোমিনপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, নইলে পরে ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি’, এই বিখ্যাত উক্তিকে সামনে রেখে চলবে ওরস মোবারক ও বাউল মেলা। ইতোমধ্যে মেলার সবধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।’
বিশু শাহ্ মাজারের খাদেম জয়নাল জোয়ার্দ্দার জানান, ‘এবার বাবা বিশু শাহ্-এর ৮৮তম ওফাত দিবস। আর প্রতিবছর এই দিনে এ আধ্যাত্মিক সাধককে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।’
এবারের মেলায় এপার বাংলা-ওপার বাংলার লালন শিল্পীরা অংশ নেবেন। আর আজকের মেলার প্রধান আকর্ষণ দেশবরেণ্য বাউল শিল্পী কুদ্দুস বয়াতী ও তাঁর দল। এছাড়া কুষ্টিয়া লালন শাহ্ একাডেমির শিল্পী, বিশু শাহ্ বাউল একাডেমির শিল্পী ও দেশবরেণ্য বাউল শিল্পীরা বিশু শাহ্ মুক্তমঞ্চে লালনের রেখে যাওয়া বিখ্যাত গান পরিবেশন করে বাউলপ্রেমীদের মন মাতাবেন।
যুবলীগ নেতা রানা আহমেদ ও খালেক শাহ্রে তত্ত্বাবধায়নে এবং আদিয়ান মার্ট নামের অনলাইন ভিত্তিক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে দেশ-বিদেশের বাউলদের গানে ও পুণ্যার্থীদের ভিড়ে মুখরিত হবে ঐতিহ্যবাহী বিশু শাহ্-এর ৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এ বাউল মেলা।
মেলার ইতিহাস:
এ মেলার ইতিহাস সম্পর্কে যত দূর জানা গেছে, বিশু শাহ্ ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলার জাঁহাপুর গ্রামের মরহুম আরজান বিশ্বাসের ছেলে। জেলা সদরের কুতুবপুর ইউনিয়নের দত্তাইল গ্রামের মরহুম একিম শাহ্-এর শিষ্য ছিলেন তিনি। তিনি প্রায় ৪০ বছর সরিষাডাঙ্গায় অবস্থান করেছিলেন এবং নিজের আস্তানা গড়ে তোলেন। বাংলা সাল অনুযায়ী ২০ ফাল্গুন ১৩৪৬ সালে ১০৫ বছর বয়সে গুরু একিম শাহ্-এর আস্তানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিশু শাহ্-এর ভক্তদের কাছ থেকে জানা গেছে, তিনি মৃত্যুর আগেই বলে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন সরিষাডাঙ্গা গ্রামে তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয়। তাঁর কথা মতোই ভক্তরা তাঁর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর বিশু শাহ্-এর মৃত্যু দিবসে আজকের এই দিনে তাঁর মাজারে আয়োজন করা হয় বাৎসরিক ওরস মোবারক।
এলাকাবাসীর কাছ থেকে আরও জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগে ওরস মোবারকের পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে বাউল মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করেন সরিষাডাঙ্গা গ্রামের খন্দকার আশরাফ, বাবলু আহমেদ, হাসেম আলী সর্দার, খালেক শাহ, রমজান, মাজিদসহ সেই সময়ের উঠতি বয়সী কিছু যুবক। তাঁরা তখনকার ছাত্রনেতা বর্তমান মোমিনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জোয়ার্দ্দারের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জোয়ার্দ্দার, সালাম জোয়ার্দ্দার, শহীদ পাগলসহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ওই যুবকদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে বড় পরিসরে ওরসের পাশাপাশি বাউল মেলার আয়োজন করেন। সেই থেকে আজ অবধি বাউল মেলাটি প্রতিবছর এই দিনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।