বর্ণিল উৎসবে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন আজ শুরু সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় পদপদবি

419

Bp-2016-10-21-097-4সমীকরণ ডেস্ক: নজরকাড়া সাজসজ্জা আর উৎসাহ-উদ্দীপনায় আজ সকাল ১০টা থেকে শুরু হচ্ছে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর অনুষ্ঠেয় চোখ ধাঁধানো এই সম্মেলনে হঠাৎ করে সাধারণ সম্পাদক পদের পরিবর্তনের গুঞ্জনে প্রস্তুতির সঙ্গে নেতাকর্মীদের মধ্যে কে কোন পদ পাচ্ছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। সভাপতি পদে শেখ হাসিনার পুনর্র্নিবাচিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে অনেক আগেই। তবে চমক হিসেবে সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্থলে নতুন মুখ ওবায়দুল কাদেরের আসার কথা শোনা যাচ্ছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য অনেক পদে রদবদলের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সম্মেলনে মহাজোটের সব শরিক দলের নেতাসহ, ১১ দেশের ৫৫ রাজনৈতিক এবং নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গণতান্ত্রিকভাবে পথচলা দেশের প্রাচীন এই দলটির সম্মেলন উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সোওরাওয়ার্দী উদ্যানকে বেশ ক’দিন আগেই সাজানো হয়েছে নতুনরূপে। আলোকসজ্জা, ব্যানার, ফেস্টুন ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় বড় প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছে ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। এছাড়াও সম্মেলনস্থলের নৌকাসদৃশ সুবিশাল মঞ্চ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। যার সামনে সাড়ে ৬ হাজার কাউন্সিলর ও ২০ হাজার ডেলিগেটসসহ প্রায় ৪০ হাজার লোকের ধারণক্ষমতাবিশিষ্ট সুবিশাল প্যান্ডেল রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্মেলনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন গতি আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার কারণে সাংগঠনিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়া আওয়ামী লীগও সংগঠিত হবে এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। সম্মেলনে প্রবীণ নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কর্মোদ্যোগী ও মেধাবী তারুণ্যের সম্মিলন ঘটিয়ে নতুন উদ্যম সৃষ্টির সম্ভাবনা খুব বেশি। ৮১ সদস্যের কার্যনির্বাহী সংসদে বেশ কিছু পদে নবীন-প্রবীণের সমাহারের চেষ্টা আছে। তবে ২০০৯ সালের গণহারে রদবদলের সম্ভাবনা ক্ষীণ। সে ক্ষেত্রে নতুন কিছু মুখ আসবে, থাকবে রদবদল ও পদোন্নতির মতো বিষয়। তবে ছয় দশকেরও বেশি পুরনো দলটিতে সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা এবারও স্বপদে বহাল থাকছেন। এবার তিনি অষ্টমবারের মতো দলীয়প্রধানের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি ১৯৮১, ১৯৮৭, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৯ এবং ২০১২ সালে সভানেত্রী নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন- তা নিয়ে এতদিন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নাম শোনা গেলেও শেষ মুহূর্তে এসে ওবায়দুল কাদেরের নাম শোনা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ওবায়দুল কাদেরের দায়িত্ব নেয়াকে অনেক নেতাই এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন।
তথ্যমতে, এবারের সম্মেলনে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সম্মেলনে ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপে ভাগ হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। সম্মেলনকে বর্ণাঢ্য ও দৃষ্টিনন্দন করতে সম্মেলনস্থলের প্রবেশমুখসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। মঞ্চের ডান পাশে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং এম মনসুর আলীর ছবি। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেলের ছবিও স্থান পেয়েছে ওই পাশটিতে। আর বাম পাশে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের প্রতিকৃতি। রয়েছে শেখ কামাল ও শেখ জামালের ছবিও।
দলীয় সূত্রমতে, সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রতীক্ষিত সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হবে। শেখ হাসিনা রমনা পার্কের বিপরীতে নির্মিত গেট দিয়ে সম্মেলনস্থলে এসেই মঞ্চে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার আদলে তৈরি মঞ্চে আরোহণ করবেন। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও অভ্যর্থনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাসিম তাকে স্বাগত জানাবেন। এর পরই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হবে। দলীয় পতাকা উত্তোলন করবেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। উদ্বোধনের এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে শেখ হাসিনা সভাপতির স্বাগত বক্তব্য দেবেন। এরপর সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ দলের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করবেন। যা দলের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের কাছে পৌঁছে দেবে।
কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ এসব কার্যাবলী শেষে সম্মেলনে বিদেশি অতিথিরা বক্তব্য দেবেন। এরপর শুরু হবে মধ্যাহ্নভোজের বিরতি। যাতে খাদ্য উপ-কমিটির সদস্যরা এর মূল দায়িত্ব পালন করবেন। যদিও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে তাতে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। বিরতির পর সাংগঠনিক নানা দিক তুলে ধরে জেলা ইউনিটের সব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা একে একে বক্তব্য দেবেন। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তা মঞ্চেই শুনবেন। সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ শেষে সন্ধ্যার পর শুরু হবে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। যেখানে দেশের বরেণ্য শিল্পীরা তাদের পরিবেশনা উপস্থাপন করবেন। দলীয় সূত্রমতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই সম্মেলনের প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষ হবে।
সম্মেলনের শৃঙ্খলা রক্ষায় সম্মেলনে গাড়িসহ আসা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বিদেশি অতিথি ও ভিআইপিদের গাড়ি ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউশন সংলগ্ন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। আর গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে সম্মেলনস্থলে প্রবেশের প্রধান পথ হবে টিএসসির গেট। এ ছাড়া রমনা কালীমন্দির গেট, চারুকলা ইন্সটিটিউট গেট এবং শিশুপার্ক সংলগ্ন গেট দিয়েও প্রবেশের সুযোগ থাকবে।
৫৫ বিদেশি রাজনৈতিক: এদিকে মহাসমারোহে অনুষ্ঠেয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত, চীন, কানাডা, ইতালিসহ অন্তত ১১টি দেশের ৫৫ জন বিদেশি অতিথি আসছেন। যা ইতোমধ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের সূত্র জানায়, সম্মেলনে আসা অধিকাংশ অতিথিই ভারতের। এর মধ্যে বিজেপির ভাইস প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য বিনয় প্রভাকর ও সংসদ সদস্য রূপা গাঙ্গুলী, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ও রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা গোলাম নবী আজাদ, সংসদ সদস্য প্রদীপ ভট্টাচার্য, মৌসুম নুর ও অভিজিৎ মুখার্জী, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিমান বসু, সর্বভারতীয় ?তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি ও তার পিএস সুকান্ত আচার্য, সর্বভারতীয় ফরওয়ার্ড বস্নকের সাবেক সংসদ সদস্য দেবব্রত বিশ্বাস।
এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা বিজেপির প্রেসিডেন্ট বিপ্লব কর দেব, নিতি দেব, আসাম ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, সর্বভারতীয় ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সবুর তপাদার, আসাম গণপরিষদের নেতা আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার মহন্ত, জেজি মহন্ত ও সংসদ সদস্য ধ্রুবজ্যোতি শর্মা, মনিপুর পিপলস্? পার্টির প্রেসিডেন্ট নংমেইকাপম শোভাকিরণ সিং, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কনথাউজম কৃষ্ণচন্দ্র সিং ও সাধারণ সম্পাদক (মনিপুর) মাচাং সইবাম, মেঘালয়ের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির সাংসদ মজিদ মেনন, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জরামথাংগা, ভাইস প্রেসিডেন্ট লথাংলিয়েনা, উপদেষ্টা রাকেশ শর্মা ও উপদেষ্টা রসাংজুয়ালা আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের অতিথিরা হলেনথ জেনি রাথবোন, সিটি অব কারডিফ কাউন্সিলের কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী ও ল্যান্ডাফ নর্থ। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়ালেসের মেম্বার অব পার্লামেন্ট হুগ ম্যক ডারমট ও লেবার পার্টির মানিনদারজিৎ সিং। ইতালির ডেমোক্রেটিক পার্টির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির কনসালট্যান্ট সংসদ সদস্য ইউগো পাপি ও সংসদ সদস্য খালিদ চাওকি। ভুটানের তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী দিনা নাথ ডুনগেল ও ড্রাক ফুওয়েনসাম দলের সংসদ সদস্য দর্জি ওয়াংদি। অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সংসদ সদস্য ফুকস্?, অটোমোনাস ট্রেড ফেডারেশনের ও সিনেটর আর্নেস্ট গ্র্যাফ্ট। ইউনাইটেড রাশিয়ার ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি সংসদ সদস্য সারেগেই ঝেলেজেডনিয়াক, উপদেষ্টা ভ্যালেরিয়া গোরোখোভা, রিপাবলিকান পার্টি অব রাশিয়ার আলেক্সান্ডার পোটাপোভ। শ্রীলংকার ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির নেতা ধর্মমন্ত্রী এএইচ মোহাম্মদ হাশেম, রহমাতুল মালিক পাটিমগম, আইটিএকের নেতা সংসদ সদস্য শান্তি শ্রীকানদারসা ও শ্রীলংকান ফ্রিডম পার্টির নেতা সংসদ সদস্য জগৎ পুস্পকুমার। নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি, রাধিকামস সাক্য, সংসদ সদস্য রাজন ভট্টাচার্য, রাজেশ ভট্টাচার্য, নেপাল কংগ্রেস নেতা রাম শর্মা মহাত। কানাডার কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও সংসদ সদস্য দিপক ওভরাই। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার ঝেং জিয়াসং, ডিরেক্টর জেনারেল ইয়ান ঝিবিন, ডেপুটি ডিরেক্টর জিয়া পেং, কাও ঝিগাং এবং গাও মিন।
সরাসরি সমপ্রচার হবে সম্মেলন: এদিকে ক্ষমতাসীন দলটির ত্রিবার্ষিক এই জাতীয় সম্মেলন দলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সরাসরি (লাইভ) সমপ্রচার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে প্রস্তুতি কমিটির পক্ষ থেকে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলও তা সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশনায় এবারের সম্মেলনে ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে। এ কারণেই তা আওয়ামী লীগের নিজস্ব ফেসবুক পেজে সম্মেলন সরাসরি দেখা যাবে।
এক নজরে ৬৭ বছরে ১৯ সম্মেলন: দীর্ঘ ৬৭ বছরের পথ চলা এই আওয়ামী লীগের দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তারই জ্যেষ্ঠ কন্যা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল চলছে সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে। সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এরপর ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মাথায় দলটির নেতৃত্বে আসেন জাতির জনক ও অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে বাঙালির দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মূল রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়। ইতিহাস বলছে, উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এ দলটির প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক। এরপর ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় কাউন্সিলে সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৫ সালে তৃতীয় কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব বহাল থাকেন। ১৯৫৭ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৪ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ এবং শেখ মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। বলা হয়ে থাকে, ওই বছরের ১৮-২০ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন থেকেই শুরু হয় শেখ মুজিবের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার পথ-পরিক্রমা। এরপর ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাজউদ্দিন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে সভাপতি হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ছেড়ে দিলে সভাপতির দায়িত্বে আসেন এএইচএম কামরুজ্জামান। সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন জিল্লুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসকরা রাজনীতি স্থগিত করে দেন। তবে ১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। যাতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় মহিউদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে। ১৯৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করা হয়। ১৯৭৮ সালের সম্মেলনে সভাপতি হন আবদুল মালেক উকিল এবং সাধারণ সম্পাদক হন আবদুর রাজ্জাক।
১৯৮১ সালে জাতির পিতার বঙ্গবন্ধুর প্রবাসে অবস্থানরত জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন। দেশে ফেরার আগেই ওই বছরের সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন আবদুর রাজ্জাক। ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ ওই সম্মেলন শুধু আওয়ামী লীগের জন্যই নয়, গোটা জাতির কাছেই এক বিশেষ মাইলফলকের জন্ম দেয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার তথা ভোট ও ভাতের রাজনীতিতে সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়। কিন্তু এই সম্মেলনের পর সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কয়েকদিন পরই প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হলে আবারও দেশে এক অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত অবস্থা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে এরশাদ ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কবলে পড়ে। ফলে চতুর্দশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে বিলম্ব হয়। তবে আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে দল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ১ থেকে ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দলের চতুর্দশ সম্মেলন। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত রাজনৈতিকভাবে আওয়াামী লীগ আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পঞ্চদশ সম্মেলন হয় ১৯৯২ সালের ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর। যাতে শেখ হাসিনা সভাপতি পুননির্বাচিত হলেও সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন জিল্লুর রহমান। তাৎপর্যপূর্ণ ওই সম্মেলনে বিশ্ব ও জাতীয় পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়। সম্মেলনের পর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গণসংগ্রাম, তত্ত্ববাবধায়ক সরকারের দাবিতে গণ-আন্দোলন প্রভৃতির কারণে ষষ্ঠদশ সম্মেলন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। এরপর গণসংগ্রামে বিজয়ের প্রেক্ষাপটে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে দলের ষষ্ঠদশ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সুদীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় আসায় ওই সম্মেলন দেশকে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যাভিমুখী পথে ঘুরে দাঁড়াতে যথার্থ ভূমিকা রাখে। সম্মেলনে শেখ হাসিনা এবং জিল্লুর রহমান দলের ফের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের বিশেষ কাউন্সিলে একই কমিটি বহাল থাকে। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনা এবং আবদুল জলিল দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই দলের অষ্টাদশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে বহাল থাকেন এবং নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলেও শীর্ষ পদ দুটি বহাল থাকে।