বরাদ্দ অপ্রতুল, সমন্বয়হীনতা

186

সমীকরণ প্রতিবেদন:
ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, সমন্বয়হীনতা, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে ঘাটতি, বেকারত্বসহ বিভিন্ন অবহেলায় প্রাণশক্তিতে ভরা তরুণদের অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে যে জনমিতিক সুবিধায় আছে, তা একটি সময় পর বড় ধরনের অসুবিধায় পরিণত হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১৫ কোটি জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে নানা সমস্যার সম্মুখীন। ৩৬ শতাংশ শহরের তরুণ এবং ৪২ শতাংশ গ্রামের তরুণ কর্মসংস্থান কিংবা কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যুবা নারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ এবং যুবা পুরুষদের ৩৩ শতাংশ কোনো ধরনের আয়-উপার্জন করতে পারছেন না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে ৪৭ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তরুণদের অর্ধেকের বেশি মনে করেন, তাদের স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে ভাবেন না দেশের নীতিনির্ধারকরা। তারা উৎকণ্ঠিত নীতিনির্ধারকদের বৈষম্যমূলক এই নীতি নিয়ে।
সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপল্গয়মেন্ট রিসার্চ (সিডার) ‘কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা ২০১৭’ শিরোনামে যে সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে বেরিয়ে আসে- যার শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি, তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কম। এ ধরনের নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত তরুণ প্রজন্ম হতাশা থেকে বাঁচতে নিচ্ছেন দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত। বৈধ বা অবৈধ যেকোনো উপায়ে তারা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। অথচ জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থার তথ্য মতে বাংলাদেশ সেইসব ভাগ্যবান দেশের তালিকায় আছে যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ রয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য সরকারের যে পরিকল্পনা, তাতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তরুণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধান করার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের টাকাও নেই। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ২২টি মন্ত্রণালয় যারা যুব ও যুব উন্নয়ন সম্পর্কিত কাজগুলো করে, তাদের জন্য গত বছর বাজেটে বরাদ্দ ছিল এক লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান বাজেটে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতে রাখা হয়েছিল মাত্র ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। মন্ত্রণালয়গুলোতে আলাদাভাবে বা যৌথভাবে তরুণদের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। আবার মন্ত্রণায়গুলোর কর্মকা-ের মধ্যে সমন্বয়েরও ঘাটতি আছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে তরুণদের প্রশিক্ষণের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে তারা চাকরির বাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেন। ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি যুবককে প্রশিক্ষিত করে তোলার পরিকল্পনা আছে সরকারের। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। বর্তমানে প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ-তরুণী চাকরির বাজারে ঢুকছেন। ১০০ কোটি টাকা মানে মাথাপিছু মাত্র ৫০০ টাকা। ১২-১৪ বা ১৬ বছরের শিক্ষা যাদের কর্মোপযোগী করতে পারেনি, মাথাপিছু ৫০০ টাকা ব্যয় করে তাদের যোগ্যতার সেই ঘাটতি দূর করা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তরুণদের মনে। ২০১৭ সালে দেশে যুব নীতিমালা হয়। যুব নীতিমালায় যুবদের দক্ষতা বৃদ্ধি আর তাদের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি দেশের শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় যুবদের অংশগ্রহণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়েও যুবদের এই অংশগ্রহণ নিয়ে নীতিমালায় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় যুবনীতি বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং নীতিমালা তৈরি হওয়ার দুই বছর পরও অ্যাকশন পল্গ্যান তৈরি হয়নি। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, সাধারণ মানুষের উন্নয়ন এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই নীতিমালা তৈরি করা হয়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নাগরিকের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং তরুণদের উন্নয়নে বাজেটে আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তরুণদের জন্য শ্রমবাজারে তেমন কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। কারণ শিল্প একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই কর্মসংস্থানে সংখ্যাগত উলল্গম্ম্ফন নেই। এ ছাড়া অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অন্যান্য শিল্পও উলেল্গখযোগ্য হারে বাড়ছে না। ফলে শিল্পনির্ভরতা বাড়তে থাকলেও সেখানে কর্মসংস্থানে অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বেকার ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার; যা আগের বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ওপরে আছে কেবল পাকিস্তান। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মহীন থাকার কারণ কি দক্ষতার ঘাটতি, নাকি কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়া? বিশ্বব্যাংক বলছে, এর পেছনে দক্ষতার ঘাটতি যেমন আছে, একইভাবে আছে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগও। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা চাকরির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছেন। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা পাচ্ছেন, তাতে তারা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইংরেজি ভাষায় আত্ববিশ্বাসী মাত্র ১৬ শতাংশ। শুধু চাকরি নয়, কেউ যদি উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে তারা ব্যবসা করার পুঁজি কোথা থেকে পাবেন, এমনকি নিজেদের চাহিদাগুলোর ব্যাপারে বেশিরভাগ তরুণ সচেতন নন। এ ছাড়া উদ্যোক্তা-সহায়ক পরিবেশের অভাবে তারা অনেকেই এই পথে বেশি দূর হাঁটতে পারছেন না।
তরুণ উদ্যোক্তা মোস্তাফা দীপু বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার কথা অনেকেই বলেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন তরুণের পক্ষে একটি ব্যবসা শুরু করে তা চালিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যদি তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত হবেন। তরুণদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সমকালের মুখোমুখি হয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি সরকারের নানা উদ্যোগ ও লক্ষ্য তুলে ধরে শুনিয়েছেন আশার কথা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় তিন কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সারাদেশে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি চালু করা হবে। বেকার যুবকদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ, ঋণ প্রদান ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে তৈরি করতে প্রতিটি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণদের মাদক থেকে মুক্ত রাখতে ও সুস্থ বিনোদনের জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় যুব বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। তরুণদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য গঠন করা হবে যুব গবেষণা কেন্দ্র। যুবকদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও চাহিদা নিরূপণ করে এসব কেন্দ্র থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।