বছর শেষে নির্বাচন

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বছর শেষে হতে যাওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানা সমীকরণ চলছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোট বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমমনা দলগুলোকে সাথে নিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে এখন আন্দোলনমুখী। বর্তমান সরকারের পদত্যাগসহ ১০ দফা দাবিতে বিভিন্ন জোট ও দলের সমন্বয়ে ৫৪টি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিয়ে যুগপৎভাবে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চলছে দলটি। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে চারটি জোট গঠন হয়েছে। এসব জোটের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি আরো নতুন জোট গঠনেরও তৎপরতা চলছে। তবে এসব জোটে থাকা অধিকাংশ দলই নিবন্ধনহীন। এসব দল হলো- ১২ দলীয় জোটে থাকা জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), কল্যাণ পার্টি, লেবার পার্টি, জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক দল-জাগপা (তাসমিয়া প্রধান), এনডিপি, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক পার্টি এবং সাম্যবাদী দল। গত ৯ ডিসেম্বর ২০ দলীয় জোটের বিলুপ্তি হলে এই জোটের সৃষ্টি হয়।
২০ দলীয় জোটের বিলুপ্তির কারণে ১১টি দল নিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ নামে আরেকটি জোটের সৃষ্টি হয়। এই জোটে আছে- ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ডেমোক্রেটিক লীগ, পিপলস লীগ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, সাম্যবাদী দল, গণদল, ন্যাপ ভাসানী এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি পার্টি। এ দু’টি জোট গঠনের পর ছোট ছোট ১৫টি সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সমমনা পেশাজীবী গণতান্ত্রিক জোট’ নামে আরো একটি জোটের আত্মপ্রকাশ হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় থেকে। এই জোটের সংগঠনগুলো হলো- ইয়ুথ ফোরাম, জিয়া নাগরিক সংসদ, ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট, শহীদ জিয়া আইনজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নাগরিক দল, বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি, সংবিধান সংরক্ষণ পরিষদ, গণতন্ত্র রক্ষা মঞ্চ, জাতীয়তাবাদী চালক দল, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ ৭১, ঘুরে দাঁড়াও বাংলাদেশ, মুভমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাসি, বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাটিক কাউন্সিল, দেশ রক্ষা মানুষ বাঁচাও আন্দোলন ও বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ।
এছাড়া সাতটি বাম ধারার রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। এই জোটের দলগুলো হচ্ছে- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। চারটি বাম রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যও’ বিএনপির সাথে পালন করছে যুগপৎ কর্মসূচি। এই চারটি দল হলো- সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কবাদী-লেনিনবাদী) ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল। এদিকে কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন ‘এলডিপি’ কোনো জোটে না থাকলেও বিএনপির সাথে সমন্বয় করে যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, মোস্তফা মহসিন মন্টুর নেতৃত্বাধীন ‘গণফোরাম’, বাবুল সর্দার চাখারীর নেতৃত্বাধীন পিপলস পার্টি কোনো জোটে না থাকলেও সরকার পতন ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় রয়েছে। বিএনপিসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ৫৪ দলের মধ্যে ছয়টি দলের নিবন্ধন রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাগপাসহ কয়েকটি দলের নিবন্ধন বর্তমান সরকারের আমলে বাতিল করা হয়।
এ দিকে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, জাসদ ও ১১ দলের সমন্বয়ে ২০০৪ সালে ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোট গঠনের শুরুতেই ১১ দলীয় জোটের একাধিক শরিক দল এ জোটে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে একে ‘১৪ দলীয় জোট’ বলা হলেও এ জোটে দল সংখ্যা আট থেকে ১০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে জাতীয় পার্টি (জেপি) ও তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলীয় জোটে যোগদান করলে দল সংখ্যা ১২টি হয়। জাতীয় পার্টি নিয়ে মহাজোট গঠন করলে দলের সংখ্যা হয় ১৩টি। পরে জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হলে জোটে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টি। এদিকে ১৪ দল ও মহাজোটে থাকা বর্তমানে নিবন্ধিত দল হলো আটটি। দলগুলো হলো- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল-এমএল, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টি- জেপি। ২০২২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাজোটের শরিক দল জাসদ থেকে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে একটি অংশ বের হয়ে বাংলাদেশ জাসদ নামে নতুন দলের ঘোষণা দেয়। একটি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জাসদ বিএনপির সমমনা ১২ দলীয় জোটের সাথে সমন্বয় করে যুগপৎ আন্দোলনে কাজ করার চেষ্টা করছে। কমরেড সাইদ আহমেদের নেতৃত্বে মহাজোটের আরেক শরিক দল বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল বিভক্ত হয়ে বিএনপির ২০ দলীয় জোটের সাথে যোগ দেয়। পরে ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত ঘোষণা হলে সমমনা জোটের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে আসছে। মহাজোটের আরেক শরিক দল ‘গণ আজাদী লীগের’ সাবেক মহাসচিব আতাউল্লাহ আতা দলের একটি অংশ নিয়ে জোট থেকে বের হয়ে যান। যদিও অন্য কোনো জোটে তিনি যোগ দেননি। মহাজোটের অন্যতম শরিক দল তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসাচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ আউয়াল জোট থেকে বের হয়ে একই নামে দল চালাচ্ছেন।
দুই জোটের বাইরে নিবন্ধিত দল:
দুই জোটের বাইরে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ২২টি। দলগুলো হলো- বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, ঐক্যবন্ধ নাগরিক আন্দোলন, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), গণফ্রন্ট, গণফোরাম, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জাকের পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষিক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ফ্রন্ট।
এসব জোট ও দলের নেতাদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, পরপর দু’টি বিতর্কিত নির্বাচন হওয়ায় দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাই সব রাজনৈতিক দল বিএনপির সাথে যুগপৎ ধারায় আন্দোলনে সম্মত হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য একটি ভালো দিক। তারা আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এসব দল ও জোটকে নামসর্বস্ব বলা হলেও এগুলো জনগণের ক্ষোভ প্রকাশের আলাদা আলাদা প্লাটফর্ম। এতগুলো দলের একটি ইস্যুতে একমত হওয়াকেও তারা সরকারের পরাজয় বলে মনে করছেন। ৫৪ দল সম্পর্কে জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও কিছু ইসলামিক দল বাংলাদেশে শক্তিশালী। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে। তা ছাড়া বাকি দলগুলো আসলেই নামসর্বস্ব দল। এসব দল দিয়ে আন্দোলন করে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না।
১২ দলীয় জোটে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন:
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, অবৈধ সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিএনপির সাথে চলমান যুগপৎ আন্দোলনকে গতিশীল ও বেগবান করার উদ্দেশ্যে একটি সাত সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে ১২ দলীয় জোট। গতকাল রোববার ১২ দলীয় জোটের এক সভায় এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন- জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা, বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, এনডিপির চেয়ারম্যান কারি মোহাম্মদ আবু তাহের ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম।