চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ১৭ আগস্ট ২০১৭
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বছরে এক হাজার কোটি টাকার পশু বেচাকেনা : সহযোগিতা নেই জেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের বলে অভিযোগ : চুয়াডাঙ্গা জেলায় নানান প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে চলছে পশু পালন!

সমীকরণ প্রতিবেদন
আগস্ট ১৭, ২০১৭ ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রিফাত রহমান: নানান প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় পশু পালন চলছে। বছরে এক হাজার কোটি টাকার পশু বেচাকেনা হলেও জেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের কোন সহযোগিতা নেই। লোকবলের অভাবে এ জেলায় দেওয়া হয়না পশু চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ঔষুধ।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নিভৃত পল্লী পাটাচোরা গ্রামের খোরশেদ আলী মন্ডলের ছেলে রবিউল হোসেন ২০১২ সালে শখের বসে পৃথিবী খ্যাত একটি ‘ব্লাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগী কেনে। এই ছাগী থেকে ২ বছরের মাথায় ১০-১২টি ছাগল জন্ম নেয়। ওই ছাগল রাখার জন্য তিনি একটি টিনের ছাউনি তৈরি করেন। এভাবে ছাগলের বংশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে রবিউল হোসেনের তৈরি করা ৩টি ছাউনিতে ৮০টি ছাগল রয়েছে। এই ছাগল বিক্রি করে তিনি তার  দুই ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াশুনা করাচ্ছেন। বড় ছেলে ফরহাদ (২০) এইচএসসি পাশ করে তার কাজে সহায়তা করছে আর ছোট ছেলে ফয়সাল (১৭) এইচএসসিতে এবং এক মাত্র মেয়ে রুপা (১০) পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে। প্রতিমাসে তিনি ৪-৫টি ছাগল বিক্রি করে সংসার চালিয়ে ছেলে মেয়ের পড়াশুনার খরচ চালায়। এ মাসে তিনি ৩টি পাঁঠা বিক্রি করেছে ৭২হাজার টাকা আয় করেছেন। ছাগল বিক্রি করে রবিউল গত তিন মাস আগে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩টি গরু কিনেছেন। কোরবানী ঈদের আগে তিনি গরু ৩টি ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে আসা করছেন। রবিউল হেসেন অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তর থেকে তাকে কোন সহযোগীতা করে না, এমন কি কোন খোঁজ খবর  নেয়না। ছাগলের পিপিআর ও পক্সের  কোন ভেকসিন দপ্তর থেকে দেওয়া হয়না। এগুলো তারা অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ছাগল পালনের ক্ষেত্রে প্রাণী সম্পদ দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা পাওয়ার জন্য নিবন্ধন করার ব্যবস্থা থাকলেও সেটা করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার সহযোগীতা পাননি। সে কারনে আজ পর্যন্ত তার ছাগল খামারটি  নিবন্ধীত হয়নি।
এ ব্যাপারে দামুড়হুদা উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (সহকারি) আনোয়ার হেসেন জানান, সরকারি ভাবে কোন সুযোগ সুবিধা না থাকায় আমরা সেটা দিতে পারিনা। পিপিআর ও পক্সের ভ্যাকসিন নেই সে জন্য ওগুলো দেওয়া যাচ্ছেনা। নিবন্ধনের বিষয় তিনি বলেন, ৬০ এর অধিক ছাগল থাকলে ‘এ গ্রেডে নিবন্ধন করতে ১ হাজার টাকা খরচ হয়। নিবন্ধন না করলে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগীতা দিতে পারিনা।
চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের স্কুলপাড়ার মজিবর রহমানের ছেলে সুমন (৩০) স্কুলের পাশে বছরে ১৫ হাজার টাকা চুক্তিতে অল্প জায়গা ইজারা নিয়ে সেখানে ২টি টিনের ছাউনি তৈরি করে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে ৪ মাস আগে বিভিন্ন জাতের ২৩টি গরু কিনে মোটাতাজা করছেন। তিনি দেশী, হলেস্টাইন, লাল সিন্ধী জাতের গরু পালন করছেন। গরু গুলোকে তিনি নেপিয়ার ঘাস, ধানের বিচালী ও ধানের গুড়ো খাওয়াচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, চুয়াডাঙ্গা প্রাণী সম্পদ দপ্তর থেকে তাকে গরু পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগীতা করেনা। ঠিক একই অভিযোগ করেছেন সদর উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের মসজিদপাড়ার দলুরদ্দীন মন্ডলের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৩৫)। তিনি বলেন, দেশী বিদেশী মিলিয়ে তিনি ৬টি গরু পুষছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি প্রাণী সম্পদ দপ্তরের কোন সহযোগীতা পাননি। একই গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে আরিফুল (৩০) জানান, তিনি ১৮টি গরু পুষছেন। মাঠে চরিয়ে এবং ঘাস খাইয়ে গরু গুলো তিনি লালনপালন করছেন। তিনি বলেন, এ জেলার কোটি কোটি টাকার গরু ছাগল বেচাকেনার কারবারে কোন প্রকার সহযোগীতা করছেনা প্রাণী সম্পদ দপ্তর।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের তথ্য সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্টির মানুষ দারিদ্র বিমোচন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং আর্থিভাবে স্বচ্ছলতার জন্যই ১৯৯০ সাল থেকে পৃথিবী খ্যাত ‘ব্লাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগল ও উন্নত জাতের দেশী, বিদেশী শাহীওয়াল, ফ্রিজিয়ান গরু পালনে সচেষ্ট হয়। এরপর থেকে গ্রামাঞ্চল গুলোতে মানুষ পশু পালনে সক্রিয় হচ্ছেন। এছাড়া বর্তমানে ব্রাহামা জাতের গরু পালন করা হচ্ছে। তবে এখানে শাহীওয়াল জাতের গরুর জাত জনপ্রিয়। কারন এ জাতের গরু তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠে, দেখতে ভাল এবং এর গোস্ত বেশী হয়। পৃথিবী সেরা ‘ব্লাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগলের গোস্ত অত্যান্ত সুস্বাদু  ও মান ভাল এবং চামড়ার চাহিদা বেশী। এছাড়া এ জেলায় আবহাওয়া ভাল ও ছাগল পালনে কম জায়গার প্রয়োজন হওয়ায় এখানে ‘ব্লাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগল ভাল হয়।
এ জেলা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায় ১১ হাজার ১২৫টি গরু ও ১০ হাজার ২২৯টি ছাগলের খামার রয়েছে। কোরবানী ঈদের সময় গরু ৪৫ হাজার, সারা বছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার  ও ছাগল ১ লাখ, সারা বছর ১ লাখ ২০ হাজার উৎপাদন হয়। গেল বছর গরু ৫৫ থেকে ৫৮ হাজার ও ছাগল ১ লাখ ১০ হাজার উৎপাদন হয়েছিলো। গরু ও ছাগল পালনের ক্ষেত্রে খাবারের জন্য ধানের বিচালী, কাঁচা ঘাস, গমের ভূষি, রাইস পালিশ, ডালের ভূষি, খৈল, লবন, চিটাগুড়, গম ও ভূট্টা ব্যবহৃত হয়। প্রতি ১০০ কেজি ওজনের পশুর ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৭০-৮০ টাকার খাবার খরচ হয়। চুয়াডাঙ্গা জেলায় চারণভূমির অভাব রয়েছে।
প্রতি ৪ মাসের জন্য ১০০ কেজি ওজনের পশুর চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয় ২০০-৩০০ টাকা। প্রাণী সম্পদ দপ্তর থেকে গরু ও ছাগলের চিকিৎসার জন্য কৃমিনাশক টেবলেট, বিভিন্ন ধরনের টিকা, রুচি বর্ধক অসুখ দেখা দিলে চিকিৎসা, কৃমির ঔষুধ, প্রযুক্তির সহায়তা, টিকা, প্রশিক্ষণ ও কিছু প্রকল্প থেকে ইর্মপুট সরবরাহ করা হয়। কোরবানী উপলক্ষে পশু দ্রুত মোটাতাজা করতে পশুকে স্বাভাবিক খাদ্য দেওয়া হয়। প্রাণী সম্পদ দপ্তর থেকে খামার গুলোতে নিবিড় তত্বাবধায়ন করা হচ্ছে। কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে যে হাট বসে সেখানে প্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল দল পশু চিকিৎসা দেয়। চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় হাট গুলোতে প্রতি সপ্তায় ২০-৩০ হাজার পশু বিক্রি হয় এবং সেই পরিমান পশু অন্য জেলায় চলে যায়। চুয়াডাঙ্গা জেলা ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে প্রচুর গরু আসতো। কিন্তু সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ কড়াকড়ি নজরদারীর কারনে গরু আসছেনা। তবে অত্যান্ত গোপনে কৌশল অবলম্বণ করে রাতের আঁধারে কিছু গরু সীমান্ত গলিয়ে এদেশে ঢুকছে। এবং সে গুলো রাজস্ব ছাড়াই অবৈধভাবে স্থানীয় হাটে বেচাকেনা হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার বিশিষ্ট হাট ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা বিমান জানান, এ জেলায় ৯টি পশু হাট রয়েছে। এখানে প্রতি সপ্তায় গরু ও ছাগল বেচাকেনা হয়। হাট গুলো হলো, জেলার সদর উপজেলায় চুয়াডাঙ্গা পৌর পশু হাট, দশ মাইল পশু হাট, আলমডাঙ্গা উপজেলায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আলমডাঙ্গা পৌর পশু হাট, ঘোষবিলা পশু হাট, লক্ষীপুর পশু হাট, হাটবোয়ালিয়া ও গোকুলখালী পশু হাট এবং জীবননগর উপজেলায় শিয়ালমারী ও দামুড়হুদা উপজেলায় ডুগডুগি পশু হাট। তিনি জানান, এ হাট গুলোতে কোটি কোটি টাকার গরু ছাগল বেচাকেনা হয়। প্রতি সপ্তায় চুয়াডাঙ্গা পৌর পশু হাটে ১০ লাখ, দশ মাইল পশু হাটে আড়াই কোটি, আলমডাঙ্গা পৌর পশু হাটে ৬ কোটি, ঘোষবিলা পশু হাটে দেড় কোটি, লক্ষীপুর পশু হাটে ৬০ লাখ, হাটবোয়ালিয়া পশু হাটে ৬০ লাখ, গোকুলখালী পশু হাটে ২ কোটি, শিয়ালমারী পশু হাটে সাড়ে ৪ কোটি ও ডুগডুগি পশু হাটে সাড়ে ৩ কোটি টাকার গরু ছাগল বেচাকেনা হয়।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে আরিফুল (৩০) জানান, গরুর খাদ্যের দাম বেশী হওয়া এবং কোরবানী ঈদের আগে বেশী পরিমান খাদ্য খাওয়ানোর কারনে প্রত্যেকটি গরু প্রতি ব্যয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। দামুড়হুদা উপজেলার নিভৃত পল্লী পাটাচোরা গ্রামের খোরশেদ আলী মন্ডলের ছেলে ররিউল হোসেন জানান, প্রতিটি ছাগলের খাওয়া ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
প্রাণী সম্পদ দপ্তর কোন প্রকার সহযোগীতা ছাড়াই আর্থিভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য অত্যান্ত পরিশ্রম ও রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় পশু পালন করা হচ্ছে। এ জেলায় প্রতি মাসে ৮০ কোটি টাকার পশু বেচাকেনা হয়। বছরে হয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।
প্রাণী সম্পদ দপ্তরে বরাদ্দ পাওয়া ঔষুধ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেওয়া ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের খামারী ও পশু পালনারীদের সহযোগীতা না করা প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কুমার পাল বলেন, বরাদ্দ পাওয়া ঔষুধ বিক্রি করে দেওয়া অভিযোগ ঠিক নয়। তাছাড়া জনবল কম থাকায় পশু পালনকারীদের সহযোগীতা করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়না। তবে আমরা স্বল্প জনবল নিয়ে আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।