চুয়াডাঙ্গা শুক্রবার , ২৯ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফের হুন্ডির ফাঁদে পড়ছে দেশ!

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ২৯, ২০২২ ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে গত মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) দেশের খোলা বাজারে ডলার বিক্রি হয়েছে ১১২ টাকায়। আর ব্যাংকগুলোতে ডলারের বিনিময় রেট ছিল ১০২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১০৫ টাকা। এ হিসাবে ব্যাংক ও খোলা বাজারে ডলারের দামের পার্থক্য ছিল ৭ টাকা থেকে সাড়ে ৯ টাকা। ডলারের বিনিময় দরে খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংকের এ বিশাল ফারাকে দেশে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিক গোয়েন্দা ও অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, দেশ নতুন করে হুন্ডি বাণিজ্যের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের বড় অংশই হুন্ডি চ্যানেলে দেনদেন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এতে দেশে ডলার সংকট সহসা কাটবে কি না- তা নিয়েও সন্দিহান তারা।

রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন গবেষক বলছেন, দেশের রেমিট্যান্সের বাজার মোটামুটি ৪০ বিলিয়ন ডলার, যার অর্ধেকই আসে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে। হুন্ডিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় এমনিতেই প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এর ওপর ব্যাংক ও খোলাবাজারের মধ্যে ডলার মূল্যের বড় ব্যবধান অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠবে। বিশেষ করে আমদানি বাণিজ্যে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ ডিরেক্টর ডক্টর খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠানো হলে ব্যাংকের চেয়ে বেশি টাকা সরাসরি গ্রাহকের হাতে পৌঁছায়। সুবিধাটি পেতেই প্রবাসীরা অনেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠায়। আর হুন্ডির মাধ্যমে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধ কাজে ব্যবহার করা হয়। করোনাকালীন সময় এ ধরনের অপতৎপরতা কম থাকলেও এখন নতুন করে তা আবার শুরু হয়েছে। ফলে হুন্ডির বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা অনেক বেড়েছে। অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে ডলারের দাম বাড়ার এটি একটি কারণ বলেও মনে করেন তিনি। হুন্ডির মাধ্যমে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা কোনো কাজে ব্যবহার হয়, তা তাদের জানা নেই বলে জানিয়েছেন প্রায় সব গ্রাহক। তবে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের চেয়ে ডলারের বিনিময় মূল্য অনেক বেশি পাওয়ায় তাদের প্রবাসী স্বজনদের অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।

তারা জানান, সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা যোগ ও রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রতিষ্ঠানভেদে ১ থেকে ২ শতাংশ চার্জ বাদ দেওয়ার পর ১০০ ডলারের বিপরীতে যে টাকা পাচ্ছেন, হুন্ডিতে তার চেয়ে আরও ৭ থেকে ৯শ’ টাকা বেশি মিলছে। অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পাঠালে প্রতি এক হাজার ডলারে ৭ থেকে ৯ হাজার টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। অথচ কিছু দিন আগেও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্সের অর্থপ্রাপ্তির ফারাক ছিল বর্তমানের অর্ধেক।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টার প্রেস নেটওয়ার্কের (আইপিএন) গবেষক আনোয়ারুল হক বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারে ডলারের দামের ফারাক অনেক বেশি। এ জন্য বেশি টাকার আশায় অনেকেই অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে। তবে শুধু কম টাকা পাওয়ার কারণেই প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে অনাগ্রহী- এমনটা নয় বলে মনে করেন আর্থিক গোয়েন্দারা। তারা জানান, অবৈধ প্রবাসীরা হুন্ডিতে ছাড়া দেশে টাকা পাঠাতে পারে না। এছাড়া মানি লন্ডারিং বিষয়ে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে দেশে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগে যেখানে খুব সহজেই রেমিট্যান্স পাঠানো যেত, এখানে সেখানে নানা ধরনের প্রশ্ন করা হচ্ছে। এ কারণে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা কমেছে, হুন্ডির ঘটনা বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্যের এক্সচেঞ্জ হাউজের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে কিছু নিয়ম মানতে হয়। প্রবাসীদের অনেকেই সেই নিয়ম মানতে নারাজ। বিকাশসহ হুন্ডি চক্রের আধিপত্য বাড়ায় প্রবাসীদের একটা বড় অংশ ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজেই আসেন না বলে জানান ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। ব্যাংক সূত্রগুলো জানায়, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে হলে আয়ের বৈধ সনদ দিতে হয়। একইভাবে পাঠানো অর্থের সুবিধাভোগীদের পুরো তথ্য দিতে হয়। এর ফলে অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলকে হয়রানি মনে করে বিকাশসহ হুন্ডিতে টাকা পাঠাতে বেশি আগ্রহী। এছাড়া যেসব প্রবাসী বৈধতা পাননি, তারা টাকা আয় করলেও ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাতে পারেন না। ফলে তারা সবাই বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে অবৈধ পন্থা বেছে নিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ব্যাংক থেকে তুলতে গিয়ে আরেক ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। সেই সঙ্গে সময়ক্ষেপণ হয়। অন্যদিকে হুন্ডিওয়ালারা সরাসরি বাড়িতে গিয়ে টাকা পৌঁছে দিয়ে আসেন। এছাড়া হুন্ডিতে স্বল্প সময়ে নিকটজনের কাছে অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে।

হুন্ডি বাড়ার কারণ নিয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএএমআরইউ) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালদ্বীপ, ইরাকসহ বেশকিছু দেশ থেকে বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর কোনো উপায় নেই। আবার অনেক প্রবাসী শ্রমিক অবৈধভাবে আছেন, তারাও বৈধভাবে টাকা পাঠাতে পারেন না। তাই তাদের বাধ্য হয়েই হুন্ডির আশ্রয় নিতে হচ্ছে। আবার মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্সের একটা অংশ সিঙ্গাপুর হয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক টাকা হুন্ডি হয়ে দেশে আসে। হুন্ডির প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকরা যেখানে কাজ করেন, সেখানে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে রাখেন। ব্যবসায়ীরা একদিকে এজেন্টদের কাছে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে তাদের চ্যানেলের মাধ্যমে শ্রমিকদের নির্ধারিত লোকের কাছে টাকা পৌঁছে দেন। অন্যদিকে, সংগ্রহ করা সেই মুদ্রা আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ে ব্যবহার করা হয়।

আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীরা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিং করে থাকেন। এরা হুন্ডির বাজার থেকে ডলার কিনে সেটি পূরণ করেন। সোনা পাচার, মাদকদ্রব্য কেনাবেচাসহ অনেক অবৈধ লেনদেনেও এই হুন্ডির টাকা ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও অন্য আরও কিছু উপায়ে হুন্ডি ব্যবসা হয়। বিশাল বড় চক্র এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রবাসী অধ্যুষিত সব দেশেই তাদের এজেন্ট আছে। হুন্ডি বন্ধে এ গবেষক কর নীতিমালা সংশোধনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সরকারের উচিত হবে কর নীতিমালা এমনভাবে তৈরি করা, যাতে হুন্ডির চাহিদা কমে আসে। চাহিদা না কমলে হুন্ডি ব্যবসায়কে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বড় বড় শহর ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে হুন্ডি কারবারিদের তৎপরতা রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা কেনার জন্য রয়েছে কার্ব মার্কেটে, যা ওপেন সিক্রেট। যাদের প্রয়োজন তারা অবৈধ পথে পাঠানোর জন্য কার্ব মার্কেট থেকে বিদেশি মুদ্রা কিনে থাকে। যার মধ্যে ডলার অন্যতম।
সূত্র মতে, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সঙ্গত কারণে চট্টগ্রাম শহরের হুন্ডি কারবারিদের তৎপরতা বেশি। এছাড়া ঢাকা, সিলেটেও হুন্ডি চক্রের সদস্যদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী হিসেবে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের যেমন আধিক্য রয়েছে, তেমনি যুক্তরাজ্যে রয়েছে বৃহত্তর সিলেটের মানুষের আধিক্য। এছাড়া অন্যান্য জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবাসে রেমিট্যান্সযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে। যা দিনে দিনে বাড়ছে। অথচ সে তুলনায় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা তেমন বাড়েনি। প্রবাসীদের একাধিক স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনায় যথেষ্ট ঝুঁকিও রয়েছে। কেননা হুন্ডি প্রক্রিয়ায় পাঠানো অর্থের কোনো প্রমাণ কারবারিরা রাখে না। তাই তারা এ অর্থ না দিলে প্রবাসীদের স্বজনদের কিছু করার থাকে না। এমনকি এ ক্ষেত্রে আইনগত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ অসম্ভব।

এদিকে খোলাবাজারে ডলারের দাম হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় হুন্ডি চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা বেড়াতে যাওয়া স্বজনদের কাছে নগদ ডলার পাঠানো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ কর্মকর্তার ভাষ্য, সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, সাইপ্রাস, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আগে থেকেই অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এর ওপর ব্যাংকের চেয়ে খোলা বাজারে প্রতি ডলারের দামের ফারাক ৮ থেকে ৯ টাকা হওয়ায় সামনের দিনগুলোতে বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা আসার পরিমাণ আরও কমে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। এতে দেশের বাজারে ডলারের সংকট আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করেন তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডক্টর আতিউর রহমান বলেন, খোলাবাজারে ডলারের দাম বাড়ার ফলে ইনফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়াতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকেই। এবার হঠাৎ করে যেহেতু খোলাবাজারে ডলারের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তাই অতি মুনাফার লোভে প্রবাসীদের অনেকেই অবৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে আগ্রহী হবেন। এটা ঠেকাতে হলে হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করা জরুরি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।