ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বিএনপি

51

সমীকরণ প্রতিবেদন:
সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নানা প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আর এ লক্ষ্যে স্বাধীনতার মাস এই মার্চেই গুচ্ছ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে দলটি। এরই মধ্যে গৃহীত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূলসহ সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা নতুন বার্তা পাবেন। যা তাদের মনোবল চাঙা করবে। দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে কোণঠাসা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলের ভাঙন ঠেকাতে সক্ষম হলেও নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এবার লক্ষ্যস্থির করে এগিয়ে যেতে চায় দলটি। এরই অংশ হিসেবে স্বাধীনতার মাসে সুবর্ণজয়ন্তী কর্মসূচির মাধ্যমে দলের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। একের পর এক নির্বাচনে বিপর্যয়, এক যুগে একটি আন্দোলন সফল করতে না পারা, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফিরতে না পারা, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার খেতাব হারানোর শঙ্কা, কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলীসহ অসংখ্য নেতা গুম, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মামলার কারণে সব দিক থেকে কোণঠাসা বিএনপি দীর্ঘদিন যাবৎ সফল আন্দোলন করতে না পারলেও আবার জেগে ওঠার চেষ্টা করছে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, জিয়ার স্বাধীনতার খেতাব কেড়ে নিয়ে দলের আন্দোলন দমানোর ক্ষমতাসীনদের কৌশল এবার সফল হতে দেওয়া হবে না। সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচির মাধ্যমে জিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সব কার্যক্রম জাতির সামনে তুলে ধরবেন তারা। বিএনপি চায় এই কর্মসূচিতে পুরো দেশের একজন নেতাকর্মীও যাতে নিষ্ক্রিয় না থাকে। কমবেশি সবাই কোনো না কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারেন তেমন লক্ষ্য নিয়ে কাজ বণ্টন করা হচ্ছে। এই কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন জিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের খেতাব কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদ হবে অন্যদিকে দেশব্যাপী বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। এরপরেই এপ্রিলে ছোট পরিসরে হলেও দলের জাতীয় কাউন্সিল করা হতে পারে। এই সময়ের মধ্যেও কমবেশি আন্দোলনের কর্মসূচি থাকবে। এরপর সরকার পতনের কঠোর আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
মার্চ মাসের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ১ মার্চ সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচির উদ্বোধন, ২ মার্চ ছাত্র সমাজ কর্তৃক স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন শীর্ষক আলোচনা সভা, ৩ মার্চ ছাত্র সমাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ শীর্ষক আলোচনা সভা, ৭ মার্চ আলোচনা সভা, ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালন, ৯ মার্চ সেমিনার, ১০ মার্চ রচনা প্রতিযোগিতা, ১৩ মার্চ বছরব্যাপী রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন, ১৫ মার্চ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ২০ মার্চ আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক সেমিনার, ২২ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, জেড ফোর্স এবং বীর উত্তম জিয়াউর রহমান শীর্ষক সেমিনার, ২৩ মার্চ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমেলা, ২৪ মার্চ নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে স্বৈরাচারী এরশাদের জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল শীর্ষক সেমিনার, ২৫ মার্চ কালো রাত্রি শীর্ষক আলোচনা সভা, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শেরে বাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, রক্তদান কর্মসূচি, সারাদেশের্ যালি, ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে গমন ও বগুড়ায় বাগবাড়ী গমন এবং আলোচনা সভা। এছাড়া একই দিন সারাদেশের জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও পৌরসভা পর্যায়ে আলোচনা সভা। ২৮ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা, ৩০ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সুবর্ণজয়ন্তী মহাসমাবেশ ও ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা ও চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনীর উদ্বোধন।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরব্যাপী অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে করতে খন্দকার মোশাররফকে আহ্বায়ক ও আব্দুস সালামকে সদস্য সচিব করে ১৩৪ সদস্যের জাতীয় কমিটি করা হয়। কমিটিতে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতারা রয়েছেন। এছাড়া পুরো কার্যক্রম তদারকিতে ৭ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটিও করা হয়েছে। মার্চ থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরব্যাপী কর্মসূচি শুরু করতে জাতীয় কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির বাইরে আরও ২৫টি কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ১৫টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি এবং ১০টি বিভাগীয় কমিটি। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক কমিটিও হবে বলে জানা গেছে। যাতে দলের সব নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি সুবর্ণজয়ন্তী পালনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ বিএনপি স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দল। এজন্য সুবর্ণজয়ন্তী পালন বিএনপি দায়িত্ব মনে করে। এই ইস্যুতে দলের কর্মসূচি থাকবে সারা বছরব্যাপী। শুধু ঢাকায় নয়, প্রত্যেক সিটি করপোরেশন, প্রত্যেক জেলা সদর এবং উপজেলায় তৃণমূল পর্যন্ত পালন করা হবে কর্মসূচি। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে কর্মসূচি হবে। কর্মসূচিগুলো সমন্বয় করতে এরই মধ্যে বিষয়ভিত্তিক কমিটি করা হয়েছে।
সূত্রমতে, সুবর্ণজয়ন্তীর কর্মসূচির কারণে অন্য ইস্যুতে বিএনপি বসে থাকবে না। অন্য ইস্যুর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবিতে সারাদেশে বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচি শুরু করেছে বিএনপি। বরিশালে বিভাগীয় সমাবেশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া খুলনায় ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতসহ রাজশাহীতে ১ মার্চ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩ মার্চ এবং ঢাকা দক্ষিণে ৪ মার্চ বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। গত ১৩ ফেব্রম্নয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়েছে। অন্যান্য বিভাগের কর্মসূচিও শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। সব বিভাগের পর চট্টগ্রামে সমাবেশের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে। বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক লোকসমাগমের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
সূত্রমতে, দল গোছানোর পাশাপাশি ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে এখন থেকেই মাঠে সরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলের বাইরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী ছোট-বড় দল নিয়ে বৃহত্তর মোর্চা তৈরির উদ্যোগও আছে। দলের পরবর্তী কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। বিএনপি এর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করছে। কর্মসূচি নিয়ে মাঠেও আছে। পর্যায়ক্রমে আরও কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকবে। দেশের জনগণ বিএনপির সঙ্গে রয়েছে।