প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ

62

জনস্বাস্থ্যে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা পণ্যের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। এসব বর্জ্য পরিবেশ বিষাক্ত করার পাশাপাশি দেশের নগরীগুলোর বেশির ভাগ নালা ও খালের পানি প্রবাহ আটকে দিচ্ছে। সাগরও দূষিত করছে এবং সামুদ্রিক মাছের পেটেও প্লাস্টিকের অতি সূক্ষ্ম কণা পাওয়া যাচ্ছে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বছরে চার লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য দেশে প্রবেশ করে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডিও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন মতে, গত তিন বছরে আনুমানিক ১২ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য বাংলাদেশে ঢুকেছে, যা পরিবেশ তথা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।
একই সংস্থার অন্য এক প্রতিবেদন বলছে, দেশে যেখানে জৈববর্জ্য বৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যরে বৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ শতাংশ। দেশে ব্যবহৃত বেশির ভাগ প্লাস্টিক মাটি ও পানিতে গিয়ে জমা হয়। এগুলো আলাদা করে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কোনো প্রক্রিয়া নেই। এগুলো মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতিকারক ডাই-অক্সিন ও হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করে। যা উদ্ভিদ ও মাছের সাথে মিশে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে অ্যাজমা, ফুসফুসের ক্যান্সার, পাকস্থলীর সমস্যা, চর্মরোগ বাড়ছে। মাছ এবং গৃহপালিত প্রাণীর পেটেও প্লাস্টিকের গুঁড়ো পেয়েছে এসডিওর গবেষক দল। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য, দেশের পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ৮৭ শতাংশই পরিবেশবান্ধব সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে ফেলা হয় না। এর আগে ২০১৫ সালে আরেক গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্র উপকূলে প্লাস্টিক বর্জ্য অব্যবস্থাপনার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত গঙ্গা নদীর (ভারতের গঙ্গা, বাংলাদেশের পদ্মা ও মেঘনা) বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্লাস্টিক দূষণের নতুন নতুন উৎস তৈরি হচ্ছে। দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে জেলেদের ফেলে দেয়া ও হারিয়ে যাওয়া নাইলনের জাল। এসব সামগ্রী নদীর পানি বিষিয়ে তুলছে, একই সাথে তা মাছের পেটে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। অনেক দেশে এক মাসেও এত পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য হয় না। পলিথিন ও প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা এখানকার বেশির ভাগ মানুষই জানে না। দেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে তার ১৭ শতাংশই প্লাস্টিকজাতীয়। এসব বর্জ্যরে অর্ধেক সরাসরি পানিতে বা নিচু ভূমিতে ফেলা হয়। এদিকে ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১২৪ টন প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৮৬ শতাংশ ফের ব্যবহার করা হয়। বাকি যে অংশটি ব্যবহৃত হয় না, তার বেশির ভাগ পলিথিন। এগুলো সরাসরি মাটি ও পানিতে গিয়ে জমা হচ্ছে। ফলে মাটি ও পানির জৈবগুণ নষ্ট করছে। আর খাদ্যচক্রে ঢুকে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে, যা ক্যান্সারসহ নানা রোগের কারণ ঘটাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে প্লাস্টিকদূষণ দেশের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁঁকি তৈরি করবে। সারা দেশে ব্যবহার হওয়া প্লাস্টিক খাল ও নালা হয়ে নদীর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। এটি সামগ্রিকভাবে ওই পুরো অঞ্চলের প্রতিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলছে। সরকার চাইলেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্লাস্টিকের তৈরি জাল ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। সুতার তৈরি জাল ও বাঁশের তৈরি মাছ ধরার সামগ্রী জনপ্রিয় করতে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। একই সাথে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পথে হাঁটতে হবে সরকারকে।