প্রশ্ন ফাঁসে কঠোর শাস্তি

211

দেশে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ভর্তি, মেডিক্যাল কলেজ, ব্যাংক-বীমাসহ প্রায় সবরকম নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি শক্তিশালী, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তথা চক্র গড়ে উঠেছে দেশে। এর সর্বশেষ উদাহরণ পটুয়াখালীতে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় ধাপের প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যসহ ৪৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও অর্থদন্ড দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন তদন্ত করে সিআইডি ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ৮৭ জন শিক্ষার্থীসহ ১২৫ জনের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করেছে অভিযোগপত্র। সিআইডির তদন্তে ২০১১ সাল থেকে ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় এই চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে অন্তত ২১৪ জনের, যাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমান ও সাবেক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। তাদের বিপুল অর্থ-সম্পদেরও সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ভর্তি ছাড়াও সরকারী-বেসরকারী ব্যাংক, অন্তত দুটি বিসিএস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় জড়িত ছিল চক্রটি। গত বছর জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি প্রশ্ন ফাঁস সম্পর্কিত বহুল আলোচিত বিষয়ে লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে যা বলেছিলেন তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, যে বা যারা প্রশ্ন ফাঁসের মতো জঘন্য ও নিন্দনীয় একটি কাজের সঙ্গে জড়িত তারা প্রকৃতপক্ষে দেশ এবং জাতির শত্রু। তাদের নীতিনৈতিকতা বলে কিছু নেই। কেবল অর্থের বিনিময়ে তারা যা খুশি তাই করতে পারে। করেও যাচ্ছে এই চক্রটি, যার সঙ্গে একশ্রেণীর প্রশ্নকারী, শিক্ষক, সংরক্ষক, সরবরাহকারী, মুদ্রাকর, সর্বোপরি কোচিং সেন্টার, শিক্ষার্থী, অভিভাবক পর্যন্ত জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। তারা দেশ ও জাতির আগামী প্রজন্মকে মেধাহীন করার পাঁয়তারা করছে। সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শত উদ্যোগ সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাচ্ছে না কিছুতেই। পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষা, এমনকি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাসহ প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বাধিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায়। এতে স্বভাবতই সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কর্মকর্তারা বেশ হতাশ, বিব্রত এবং অসহায় হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বেশকিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনসহ জড়িতদের ধরিয়ে দিলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের চিন্তা-ভাবনাও চলছে বলে জানা যায়। তবে এতেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। কেননা, নিকট অতীতে বিভিন্ন সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ধরপাকড়সহ যৎসামান্য শাস্তি হলেও উৎসস্থল তথা আসল ‘নাটের গুরুরা’ থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আসলে শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থা। নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা, কোচিং বাণিজ্য, সর্বোপরি বিসিএসসহ বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা অফিসে প্রতিবছর নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের নিমিত্ত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন-ফাঁস-খাতা দেখা তথা মূল্যায়ন পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন তথা অবৈধ বাণিজ্য হয়ে থাকে। রাজধানীসহ সারাদেশে এসব ঘিরে গড়ে উঠেছে সুবিশাল একটি স্বার্থান্বেষী চক্র । শিক্ষায় ও চাকরিতে নিয়োগ নীতি-নৈতিকতা এবং মান বলতে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থায় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রপতি প্রস্তাবিত কঠিন শাস্তির অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।