পুলিশের গুলিতে শ্রমিকের প্রাণহানি

32

প্রাণঘাতী অস্ত্রের প্রয়োগ আর নয়
আবারো সরাসরি পুলিশের গুলিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘটনাটি এমন একসময় ঘটল যখন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সারা দেশে পুলিশের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশের দাবি অনুযায়ী, কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাড়তি প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ জন্য যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো মহড়া প্রদর্শিত হচ্ছে। বালুর বস্তা ফেলে মেশিনগান বসানো হচ্ছে। কিছু থানা ও চৌকিতে এভাবে ভারী অস্ত্র নিয়ে সতর্ক অবস্থায় থাকতে দেখা যাচ্ছে পুলিশকে। পুলিশের মানসিকতার মধ্যে এমন ভাব তৈরি হচ্ছে যেন তাদের ভয়াবহ শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিকরা কিছু দাবি নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। ওইসব দাবি শ্রমিক হিসেবে যে কেউ করতে পারেন। প্রকল্পের বিপুল খরচের বিপরীতে তাদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা দেয়ার দাবি অযৌক্তিক কিছু নয়। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, শ্রমিকরা এ দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করার অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাদের লক্ষ করে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছে। বাঁশখালী সদর থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে স্থানীয় এস আলম গ্রুপের সাথে চীনা একটি প্রতিষ্ঠান মিলে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শ্রমিকদের কিছু দাবিদাওয়া আছে। রমজানকে সামনে রেখে তারা ওইসব দাবিতে আন্দোলনে নামেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রমজান মাসে কর্মঘণ্টা ৯ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৬ ঘণ্টা করা, শুক্রবার কাজের সময় কমিয়ে ৪ কর্মঘণ্টা করা। ইফতার ও সাহরির সময় বিরতি দেয়া এবং বেতন মাসের ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করা। সেখানে ছয় হাজার শ্রমিক রয়েছে। তারা শনিবার কাজে না গিয়ে এসব দাবিদাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করেন। নির্মীয়মাণ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জায়গা নিয়ে ২০১৬ সালে এলাকাবাসীর সাথে বিরোধ বাধে, তখনো পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হন। তবে এবার সেই অর্থে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। খবরে জানা যায়, পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন আরো ৩০ জন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে তাদের লক্ষ করে। এরপর পুলিশ তাদের লক্ষ করে গুলি ছুড়লে হতাহতের ঘটনা ঘটে।’ এতগুলো মানুষের হতাহতের ঘটনা থেকে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, পুলিশ কোন পরিস্থিতিতে গুলি চালিয়েছে? তাদের হাতে কি গুলি ছোড়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না? বিক্ষোভ দমনে পুলিশ যদি গুলি ছোড়েওÑ তারও নিয়মকানুন রয়েছে। প্রথমে তারা রাবার বুলেট ছুড়তে পারে। কিন্তু ওই ঘটনায় রাবার বুলেট ছুড়েছে, এমন খবর পাওয়া যায়নি। ধরা যাক, তাদের হাতে রাবার বুলেট নেই। তাদের প্রাণঘাতী বুলেটই ছুড়তে হচ্ছে। তাহলে সেটা কি তারা সরাসরি শ্রমিকদের বুক লক্ষ করে ছুড়েছিল? সাধারণত কোমরের নিচে গুলি লাগলে শ্রমিকদের প্রাণহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার কথা নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এবার আগমনের প্রতিবাদের সময় সারা দেশে ২০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ওইসব প্রাণহানিতে একই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পুলিশ বিক্ষুব্ধ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে কিংবা প্রতিবাদ থেকে নিবৃত্ত করতে চাইলে সরাসরি গুলি চালানোর প্রয়োজন হয় না। সে ক্ষেত্রে এত হতাহতের ঘটনাও ঘটে না। বাঁশখালীতে শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা আশা করব তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করবেন। বাস্তবতা হচ্ছেÑ সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের গুলিতে হতাহত হওয়া মানুষ কোনো প্রতিকার পাননি। অনেক ঘটনায় কোনো তদন্ত হওয়ার তাগিদই বোধ করেনি সরকার। আমরা জানি না, এবার বাঁশখালীর হতাহত শ্রমিকরা ও তাদের পরিবার কোনো প্রতিকার পাবেন কি না। বলা হচ্ছে, মালিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা হতাহতের জন্য করা হবে। মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এ ধরনের নগদ সহায়তা ‘খুব নগণ্য’ বলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলোÑ পুলিশের মনোভাব। পুলিশ দেশের মানুষকে অনেকটাই যেন শত্রুরূপে গণ্য করছে। ফলে দৃশ্যত যেনতেন উপায়ে তাদের দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে পুলিশের এমন মনোভাব কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা এভাবে অস্ত্রের ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।