পাচার হচ্ছে কোটি টাকার স্বর্ণের বার, আসছে মাদক

4

জীবননগর, দামুড়হুদা ও মহেশপুর সীমান্তে চোরাকারবারিদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট
মাদক ব্যবসায়ীদের নয়া কৌশল : বস্তাবন্দি করে ফেনসিডিল রাখা হয় পুকুরে কিংবা জলাশয়ে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গা। এই জেলার বিভিন্ন সীমান্ত রুট দিয়ে ভারতে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণের বার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করছে সোনা-রুপার তৈরি অলংকার ও মাদকদ্রব্য। বিজিবি ও পুলিশের হাতে প্রায়ই সোনার বার, সোনার অলংকার ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্যসহ চোরাকারবারিরা আটক হলেও থেমে নেই তাদের অবৈধ ব্যবসা। জেলার জীবননগর, দামুড়হুদা ও ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে চলছে তাদের চোরাকারবার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা নিমতলা, ঠাকুরপুর, কার্পাসডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর, সদরপাড়া নতুনপাড়া, হরিহরনগর, বেনীপুর এবং ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কুসুমপুর, শ্রীনাথপুর, বাগাডাঙ্গা, মাটিলা সীমান্ত দিয়েই মাদকদ্রব্য ও সোনা পাচার হয়ে আসছে। সীমান্তবর্তী অনেক গ্রামে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সদস্যরা তাদের নিজ বাড়িতে কৌশলে মাদকদ্রব্য বিক্রি করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সীমান্তবর্তী এক গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে বিজিবি-পুলিশের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা কৌশল হিসেবে বস্তাবন্দি ফেনসিডিল ইটবেঁধে পুকুরে কিংবা জলাশয়ে ডুবিয়ে রাখেন। আবার কখনও চুলার ভেতরে কিংবা পরিত্যক্ত ও আবর্জনাযুক্ত স্থানে মাদকদ্রব্য লুকিয়ে রাখেন। পরে সুযোগ মতো মাদকসেবী কিংবা ব্যবসায়ীদের কাছে তা সরবরাহ করা হয়।
এদিকে বিজিবি-পুলিশ প্রায়ই মাদকের ছোট-বড় চালান আটক করছে। তবে মাদকদ্রব্য উদ্ধার হলেও চোরাকারবারিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে মাদকের আসা ঠেকানো যাচ্ছে না।
জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ঘুরে জানা গেছে, অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হলেও নানা অজুহাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বিজিবি ও পুলিশের কথিত সোর্সদের সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক দাপট। এসব কথিত সোর্সদের অনেকেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিংবা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, জীবননগর থানা পুলিশ ২৭ আগস্ট এক কেজি গাঁজাসহ পৌর শহরের লক্ষ্মীপুর থেকে মর্জিনা নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে। ২৮ আগস্ট উপজেলার নতুনপাড়া গ্রামের রাসেল (২০) ও আরিফকে (২০) দুই কেজি গাঁজা ও ৩৭০ বোতল ইস্কুফকোডিন মাদকসহ আটক করা হয়। একই দিন বেনীপুর ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ১৬৩ বোতল ফেনসিডিল আটক করে। এদিকে ৩০ আগস্ট মাধবখালী বিজিবি মাঠে অভিযান চালিয়ে ৭৫ বোতল এবং একই দিনে উপজেলার মাধবখালী বিজিবি অভিযান চালিয়ে নবদুর্গাপুর মাঠ থেকে ১৮৬ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে। ৮ সেপ্টেম্বর উথলী বিজিবি ৮৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। একই ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ৯ সেপ্টেম্বর দর্শনার বাষট্টি আড়িয়া থেকে এক কেজি গাঁজা উদ্ধার করেন।
এদিকে উপজেলার সীমান্ত পয়েন্টগুলো দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সোনা পাচার হয়ে আসছে। দেশ থেকে সোনার বার বেরিয়ে গেলেও পরে তা অলংকার হয়ে ফের প্রবেশ করে। শুধু জীবননগর সীমান্তে নয়, পাশের ঝিনাইদহের মহেশপুর ও দামুড়হুদা উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে একই অবস্থা চলছে।
উপজেলার সীমান্ত ইউপি সদস্য ইসরাফিল হোসেন পুকু গত ৯ মে এক কেজি ৬৩ গ্রাম ওজনের তিনটি সোনার বারসহ বিজিবির হাতে আটক হন। ১৫ জুন দামুড়হুদা উপজেলার মুন্সীপুর সীমান্ত থেকে বিজিবি সদস্যরা চার ভরি সোনা ও ৭০ ভরি রুপাসহ ভারতীয় নাগরিক সিতাব আলীকে গ্রেপ্তার করেন। গত ১৮ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা সদর থানা ও আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে আলমডাঙ্গার বন্ডবিল থেকে আড়াই কেজি সোনাসহ তিন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেন। গত ২২ আগস্ট অভিযান চালিয়ে ছয় কেজি ওজনের রুপার গহনা জব্দ করে বিজিবি। এসময় মহেশপুর উপজেলার তেলটুপি গ্রামের ফজল করিমের ছেলে আব্বাস আলী ও জীবননগর উপজেলার মেদিনীপুর গ্রামের সুলতান মণ্ডলের ছেলে আনন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১ সেপ্টেম্বর বিজিবি দর্শনা সীমান্তের ঠাকুরপুর কবরস্থান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিন কেজি ৭৪০ গ্রাম ওজনের সোনার বার উদ্ধার করে। এছাড়া ১২ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার মুন্সীপুর সীমান্ত থেকে ২২ কেজি ৬০০ গ্রাম ভারতীয় রুপার গহনা উদ্ধার করেন বিজিবি সদস্যরা।
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, সোনা-রুপা ও মাদক চোরাচালানের বিষয়ে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা রয়েছে। যারা মাদক ও সোনা-রুপা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত তারা কোনোভাবে ছাড় পাবে না।
দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, দর্শনা সীমান্তে প্রায় প্রতিদিনই মাদকের ছোট-বড় চালান আটক হচ্ছে। সম্প্রতি সোনা-রুপার কয়েকটি চালান বিভিন্ন সীমান্তে আটক হয়েছে।
ঝিনাইদহ খালিশপুর-৫৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. কামরুল আহসান বলেন, সীমান্তে সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সক্রিয় আছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষা ও পুলিশ কঠিন অবস্থানে থাকায় ফেনসিডিল আসা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম। তিনি আরও বলেন, সোনা পাচারের সঙ্গে সমাজের অনেক রাঘববোয়াল জড়িত। তবে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে এবং বহনকারীরা পণ্য দ্রুত হাতবদল করায় আটক করা সম্ভব হয় না। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)