চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ৫ জুন ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাচারের টাকা দেশে ফেরানো কঠিন

প্রচলিত আইনি কাঠামোতে বিশেষ ছাড়ের উদ্যোগ * এ সুবিধা কার্যকরে আইনি জটিলতা অনেক
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুন ৫, ২০২২ ২:৩২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় পাচার করা টাকা দেশে ফেরাতে প্রচলিত আইনি কাঠামোতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটেই এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পাচারকারীদের ওই সুবিধা দিতে হলে সংবিধানসহ বেশ কিছু আইন লঙ্ঘনের শঙ্কা আছে। এছাড়া বিশ্বের সামনে দেশের ভাবমূর্তি বিশেষ করে এপিজির আপত্তির মুখ পড়ার ভয়ও আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে-ওই সুযোগ দিতে হলে পাচারকারীদের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, আয়কর অধ্যাদেশ ও দুর্নীতি দমন আইনের কিছু ধারা থেকেও অব্যাহতি দিতে হবে।

এই প্রক্রিয়ায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) থেকেও আপত্তি উঠতে পারে। তবে সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। সূত্র জানায়, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনলে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে তা আয়কর রিটার্নে দেখাতে হবে। সে ক্ষেত্রে ওই অর্থ নিয়ে সরকারের কোনো সংস্থা এ বিষয়ে প্রশ্ন করবে না। এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েই এ ব্যাপারে কাজ হচ্ছে। তবে বাজেটের আগে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হলে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা থেকে পাচারকারীদের অব্যাহতি দিয়ে আইন বাস্তবায়নকারী মূল কর্তৃপক্ষকে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। এছাড়াও বাজেটের অর্থবিল আইনের মাধ্যমেও পাচারকারীদের অব্যাহতি দিয়ে এটা করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে ৯ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কেননা ওই দিন বাজেট পেশ হবে। এর সঙ্গে অর্থবিলও উপস্থাপন করা হবে। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেটের আগেই সরকার এটি করতে চায়। সেক্ষত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। এছাড়া কোনোভাবেই দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। ওই সুযোগ দিলে একদিকে দুর্নীতি উৎসাহিত করা হবে। অন্যদিকে নাগরিকের সমান অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। এতেই সংবিধান লঙ্ঘন হবে। কেননা, দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে এটাই সংবিধানের নীতি। কিন্তু তা না করে বিশেষ ছাড় দিয়ে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করলে আইনের সমান প্রয়োগ হবে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের সুযোগ কোনো ক্রমেই দেওয়া ঠিক হবে না। দিলে বহুবিধ আইনের লঙ্ঘন হবে। দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হবে। আর দিলেও টাকা ফেরত আসবে বলে মনে হয় না। ডলার সংকট মোকাবিলায় এ সুযোগ দেওয়ার কারণ নেই। ডলার সংকট মোকাবিলা করতে সরকারের দুটি পদক্ষেপই যথেষ্ট। এক. টাকা পাচার বন্ধ করা এবং দুই. রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে হুন্ডি বন্ধ করা। এ দুটি করলে জাদুকরী ফল মিলবে। এগুলো করা কঠিন কিছু নয়। সূত্র জানায়, বাজেটের আগে ওই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, দেশ থেকে সীমার অধিক বৈদেশিক মুদ্রা নিতে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগাম অনুমোদন নিতে হয়। রপ্তানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা যথাসময়ে না এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হয়। দেশ থেকে পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগ করতে বা কোনো সম্পদ গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু অনুমোদন ছাড়া কেউ যদি দেশ থেকে সম্পদ পাচার করে থাকেন বা রপ্তানি আয় বিদেশে রেখে দেন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রচলিত আইনি কাঠামোয় ওইসব সম্পদ বিদেশ থেকে দেশে আনার সুযোগ নেই। এদিকে দেশে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় পাচার করা অর্থ দেশে এনে বর্তমান সংকট মেটানোর ব্যবস্থা করতে চায় সরকার।

অন্য একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করে অনেকে বিপাকে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট দেশের আয়কর ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষের কাছে এত অর্থসম্পদ কিভাবে অর্জন করেছেন তার বৈধ কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। এসব কারণে করোনার সময়ে পাচার করা সম্পদ অনেকেই কাজে লাগাতে পারেননি। এতে পাচারকারীদের মধ্যে ভয় ঢুকেছে। যে কারণে তারা পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। এ অর্থ দেশে আনতে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও আয়কর অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন আইনের কিছু ধারা থেকে তাদের অব্যাহতি দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সার্কুলার জারি করে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা থেকে পাচারকারীদের অব্যাহতি দিতে হবে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়নের প্রধান সংস্থা বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। এ আইন থেকে পাচারকারীদের অব্যাহতি দিতে কাজ করতে হবে বিএফআইইউকে। দুটি সংস্থার পক্ষেই এটি করা কঠিন। কেননা, তাদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে কাজ করতে হয়। পাচার করা টাকা ফিরে এলে বাংলাদেশে দুভাবে মানি লন্ডারিং হয়েছে বলে প্রমাণিত হবে। এক. দেশ থেকে টাকা পাচার সুযোগ রয়েছে এবং দুই. পাচার করা টাকা দেশে এসেছে এটা প্রমাণ হবে। এ দুটোই মানি লন্ডারিং। বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিমুক্ত দেশ। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএফআইইউ পাচারকারীদের সুবিধা দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।