পরিবহন শ্রমিক ও পুলিশের নামে গরুপ্রতি বিভিন্ন অংকের চাঁদা আদায়

362

পথে পথে গরুর ট্রাকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

সমীকরণ ডেস্ক: ধীরে ধীরে রাজধানীতে বাড়ছে পশুবাহী ট্রাকের সংখ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চাঁদাবাজিও। বিভিন্ন মহাসড়কে পথেঘাটে এমনকি গরুর হাটগুলোতে ছোবল মারছে চাঁদাবাজরা। কোথাও কোথাও পরিবহন শ্রমিক, কোথাও ক্ষমতাসীন দল, কোথাও বা পুলিশের নামে তোলা হচ্ছে টাকা। এছাড়া সীমান্তের ঘাটগুলোতেও চাঁদাবাজি চলছে।
গরু ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতীয় গরু আনতে সীমান্তের ওপারে বিএসএফকে দিতে হয় মোটা অংকের ‘পাসিং খরচ’। সেখান থেকেই শুরু। এরপর বাংলাদেশ সীমান্তে গরু আনার পর সরকার নির্ধারিত রাজস্বের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। এরপর গরুর ট্রাক রাজধানীতে নিতে পথে পথে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় ব্যবসায়ীদের।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন হাট: শনিবার রাজধানীর আফতাবনগর, গাবতলী ও শাহজাহানপুর গরুর হাট সরেজমিন ঘুরে এবং ট্রাকশ্রমিক, গরুর পাইকার ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন উত্তরবঙ্গ থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। এছাড়া সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে যশোর পর্যন্ত দুটি ও যশোর সীমান্ত থেকে ঢাকা পর্যন্ত প্রায় ১৩টি স্পটে চাঁদা দিতে হয়।
গোয়ালন্দ: চুয়াডাঙ্গা থেকে ২৮টি গরু বোঝাই আসা ট্রাক চালক মো. হিরা জানান, দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত আসতে তার কাছ থেকে ঝিনাইদহে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ২৫০ টাকা, ফরিদপুরে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ৫০ টাকা এবং ট্রাক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের নামে ২০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে গরু নিয়ে আসা ট্রাক চালক মো. মমিন অভিযোগ করে বলেন, তিনি দালালের সহযোগিতা ছাড়া দৌলতদিয়া ট্রাক বুকিং কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে পারেননি। এ জন্য তাকে দালালের হাতে এক হাজার ৪৬০ টাকার জায়গায় দুই হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।
যশোর: বেনাপোল সীমান্ত থেকে ঢাকার গাবতলী পর্যন্ত কোরবানির পশু পৌঁছাতে অন্তত ১৩ জায়গায় চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে ব্যাপারীদের অভিযোগ। যশোরের বাগআঁচড়া, নাভারণ, ঝিকরগাছা, চাঁচড়া, খাজুরা, মাগুরা, মধুখালী, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোয়ালন্দঘাট, মানিকগঞ্জ, সাভার ও গাবতলীতে ঘাটে ঘাটে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এতে গরু আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দুর্ভোগের শিকার ব্যাপারীরা। ভারতীয় গরুর পর্যাপ্ত আমদানি থাকলেও দেশে বিভিন্ন স্থানে চাহিদা কমেছে। গত বছরের তুলনায় এবার বেনাপোল সীমান্তের হাটগুলোতে বাইরের ব্যাপারীর আনাগোনা কম। স্থানীয় ব্যাপারীরা অধিকাংশ পশু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাকে পাঠাচ্ছেন। গরু ব্যাপারী রাজু আহমেদ জানান, পুটখালী সীমান্ত থেকে ঢাকার গাবতলীতে গরু নিয়ে যেতে অন্তত ১৩টি স্থানে ট্রাক প্রতি ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত হারে চাঁদা দিতে হয়। টাকা দিতে রাজি না হলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে চাঁদা দিচ্ছি। আরেক ব্যাপারী হাশেম আলী জানান, সীমান্তের হাটে বাইরের ব্যাপারী আসছে কম। আমরা ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গরুর পাঠাচ্ছি। গরু পাঠাতে গিয়ে চাঁদা দিতে হচ্ছে। উত্তর অঞ্চলে বন্যার কারণে ভারতীয় গরুর চাহিদা কম। তবে আমদানি কমেনি। যথেষ্ট গরু আসছে ভারত থেকে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।
সাতক্ষীরা : সীমান্তের ঘোনা গরু হাটে আসা নোয়াখালীর পাইকারী ব্যবসায়ী শামসুল হক বলেন, ভারতে একেকটি বড় গরু কেনার পর বিএসএফকে ‘পাসিং খরচ’ হিসেবে দিতে হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। দেশে আনার পর গরুপ্রতি সরকার নির্ধারিত রাজস্ব ৫০০ টাকা হলেও দিতে হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। এরপর পথে পথে দু’তিন স্থানে চাঁদা দিতে হয়। ফেনী থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আবুল খায়ের বলেন, ভারতীয় গরুতে চাঁদাবাজি শুরু হয় ভারত থেকেই। সীমান্ত পার করার পর ঢাকা বা অন্য কোনো জেলায় নিয়ে যেতে পথে পথে গুনতে হয় চাঁদা। এভাবে বড় গরু প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা চলে যায়। আমরা গরু বিক্রি করে লাভ করব কিভাবে।
কুষ্টিয়া : পথে পথে চাঁদাবাজি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মরপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের ব্যাপারী আসাদুল ম-ল বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের হাটে গরু নিয়ে যেতে তিন পয়েন্টে পুলিশকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচারণ করে। এমনকি টেনেহিঁচড়ে ট্রাক থেকে নামিয়ে লাঞ্ছিত করে। তখন মনে হয় ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ডাকাতি-ছিনতাই করে খাই। শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার আলামপুর পশুর হাটে দেখা হয় আসাদুল ম-লের সঙ্গে। আরেক ব্যাপারী কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মতিয়ার রহমান বলেন, ঈদের আগে (শনিবার) আলামপুরের শেষ হাট। তাই বেশি করে গরু কিনতে হবে। পুলিশের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেন ব্যাপারী মতিয়ার। তিনি জানান, ঢাকায় গরু নিয়ে যেতে পথে পথে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। বিশেষ করে হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ব্যাপারীরা। লালন শাহ সেতু এলাকায় পুলিশ, বনপাড়া ও যমুনা সেতু সংলগ্ন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশকে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় বলে জানান মতিয়ার।
এর মধ্যে পদ্মার ওপারে ৫ স্থানের মধ্যে ফরিদপুর মোড়ে ৫শ’, কালীগঞ্জে ৩শ’, মাগুরায় ৩শ’ ও দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরি ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত ৭৪০ টাকা দিয়েছেন। কামাল হোসেনের অভিযোগ, অন্যান্য মালামাল নিয়ে ফেরি পার হওয়ার সময় ফেরি ঘাটে ভাড়া ও সিরিয়াল বাবদ তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৬৬০ টাকা নেয়া হলেও গরুর ট্রাক থেকে নেয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪শ’ টাকা। তবে বাড়তি এ টাকার কোনো রশিদ দেয়া হচ্ছে না।