চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২৯ ডিসেম্বর ২০২০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নৌকার খোকন হলেন পৌর পিতা

সমীকরণ প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ২৯, ২০২০ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

উৎসবমুখর পরিবেশে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন : ইভিএম বিড়ম্বনায় পড়েছেন অনেক ভোটার
ধানের শীষের পোলিং এজেন্ডদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ : মোবাইল-নৌকা সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি
এসএম শাফায়েত/মেহেরাব্বিন সানভী:
সারা দেশের ২৪টি পৌরসভার সঙ্গে একযোগে উৎসবমুখর পরিবেশে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) সকাল ৮টায় শুরু হয় ভোট গ্রহণ, বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব ভোটার কেন্দ্রে প্রবেশ করেন, তাঁদের ভোট নিয়ে তারপর গণনা কার্যক্রম শুরু করা হয়। এদিকে, সকাল ৮টার আগে থেকেই বেশ কিছু ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এরমধ্যে নারী ভোটার সংখ্যাই বেশি ছিল। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ৩৩টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়। এ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৬৭ হাজার ৭৭৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ৩২ হাজার ৮০৪ জন ও নারী ৩৪ হাজার ৯৭০ জন।
পুলিশ ও আনসার সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেই কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন ভোটাররা। সকালের দিকে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের উপস্থিতিও বাড়তে শুরু করে। ভোটারর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ঝামেলাবিহীন অল্প সময়ের মধ্যে ভোট দিতে পেরে খুশি হয়েছেন অনেক ভোটার। আবার অনেকেই পড়েছেন ঝামেলায়। সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা ভোটারদের দেখিয়ে দিলেও ভুল করেছেন অনেকে। সবুজ বাটনে চাপ দিয়ে ভোট শেষ না করেই শুধু প্রার্থীর প্রতীক অনুযায়ী সাদা বাটনে চাপ দিয়ে বুথ থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেকে। পরক্ষণে কম্পিউটারের স্কিনে ভেসে আসছে ভোটটি সম্পূর্ণ হয়নি। আবার ওই ভোটারকে বুথে পাঠিয়ে ভোট সম্পন্ন করেছেন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা।
ইভিএম পদ্ধতিতে এই প্রথম নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে খুশি ভোটাররা। চুয়াডাঙ্গা রিজিয়া খাতুন প্রভাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে এসে গুলশানপাড়ার শরিফ উদ্দিন ও ইলোরা পারভীন জানান, এই প্রথম ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁদের। খুব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ চলছে। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। আগে যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এবার সেই ঝামেলা ছিল না। ভোটারদের লাইন থাকলেও লাইন শেষ হতে সময় লাগেছে কম। তা ছাড়া আগে, ব্যালট পেপার নিয়ে বুথে গিয়ে সিল মেরে ব্যালট পেপারটি সঠিক ভাজ করে বাক্সে ফেলতে হতো, এবার সেই ঝামেলাও ছিল না বলে জানান ভোটাররা। বাইরে থেকে ভোটাররা তাঁর নম্বর নিয়ে বুথে গিয়ে আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোটার পরিচয় সনাক্ত হওয়ার পর প্রার্থীর প্রতীক অনুযায়ী সাদা বাটন ও ভোটটি শেষ করার জন্য সবুজ বাটনে চাপ দিলেই ভোট দেওয়া শেষ।
তবে ইভিএম মেশিনে প্রথম ভোট দিতে যেয়ে বিড়ম্বনায় পড়া বেশ কিছু ভোটাররা বলেন, ‘তিনটা কালো মতো টিভি পড়ে আছে, বুঝব কি করে মেয়রের কোনটা আর মেম্বারদে কোনটা। কোনো মতে তিনটা বোতাম টিপে বেরিয়ে আসার সময় ওই বিটা বলে চাচা আবার জান, আপনার ভোট দেওয়া হয়নি। পরে ওই বিটাডা সাথে গিয়ে আমার পছন্দ অনুযায়ী বোতাম টেপার পর সবুজ বোতামে টিপে দিয়েছে।’ এদিকে শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হওয়া ভোটের মধ্যেও সকালে এম এ বারী কেন্দ্রে মোবাইল ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। সকালে অভিযোগ আসে ভি জে স্কুল কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ডদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। তবে পরক্ষণেই সব ঠিক হয়ে যায়। দুপুরের পর কেদারগঞ্জ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মোবাইল ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে মৃদু হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এর আগে গত রোববার দুপুরে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হয় ভোটের সরঞ্জাম। জেলা নির্বাচন অফিস ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৩৩টি ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বুঝে নেন এসব ভোটের সরঞ্জাম। এই প্রথম এ পৌরসভায় ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেমে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হয়। গত কয়েকদিন থেকে ৩৩টি ভোট কেন্দ্রে একযোগে ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেমের (ইভিএম) মাধ্যমে পরীক্ষামূলক ভোট প্রদান কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি পয়েন্টে ভোটারদের ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম (ইভিএম) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোট প্রদানের ধারণাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মেয়র পদে দলীয় প্রতীক নৌকায় ২২ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম মালিক খোকন নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মজিবুল হক মালিক মজু মোবাইল ফোন প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৭ হাজার ৬৫৭। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনিত প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম মনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৬। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনিত প্রার্থী তুষার ইমরান হাতপাখা প্রতীকর ৪ হাজার ৫৯৭ ভোট পেয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তানভীর আহমেদ মাসরিকী কম্পিউটার প্রতীকে ৪৫৩, মুনিবুল হাসান নারিকেল গাছ প্রতীকে ৩০১ ও সৈয়দ ফারুক উদ্দিন আহম্মেদ জগ প্রতীকে ২৪২ ভোট পেয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার সংরক্ষিত ৩টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে মোট ১৩ জন প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে ১ নম্বর ওয়ার্ডে ৭ হাজার ২৩৪ ভোট পেয়ে চশমা প্রতীকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন শাহিনা আক্তার। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সুফিয়া খাতুন আনারস প্রতীকে ২ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়েছেন। ২ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে আনারস প্রতীকে সুলতানা আঞ্জু ৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাসিমা খাতুন টেলিফোন প্রতীকে ৪ হাজার ৬৩৭। ৩ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে চশমা প্রতীকে শেফালী খাতুন ৯ হাজার ২৪৩ ভোট পেয়ে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোমেনা খাতুন জবা ফুল প্রতীকে ১ হাজার ৪১১ ভোট পেয়েছেন।
গেল বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে স্ক্রু ড্রাইভার প্রতীকের প্রার্থী বিল্লাল হোসেন বেল্টুর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
২ নম্বর ওয়ার্ডে আব্দুল আজিজ জোয়ার্দ্দার ডালিম প্রতীকে ১ হাজার ৪০৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুন্সি রেজাউল করিম খোকন গাজর প্রতীকে পেয়েছেন ১ হাজার ৬ ভোট। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পানির বোতল প্রতীকে মহলদার ইমরান ১ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাহিদ হোসেন জুয়েল ডালিম প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৫৬৪। ৪ নম্বর ওয়ার্ডে টেবিল ল্যাম্প প্রতীকে মাফিজুর রহমান মাফি ১ হাজার ৭৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ সেলিম ডালিম প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৫৯৫। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ব্রিজ প্রতীকে মুন্সি আলাউদ্দীন আহম্মেদ ১ হাজার ৫৭৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোলাম মোস্তফা শেখ ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ২৩০। ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ফরজ আলী শেখ পাঞ্জাবি প্রতীকে ২ হাজার ২২৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজাদ আলী পানির বোতল প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৯১২। ৭ নম্বর ওয়ার্ডে পাঞ্জাবী প্রতিকে উজ্জল হোসেন ১ হাজার ৬৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুল আরিফ বিশ্বাস ব্লাক বোর্ড প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ১০৬। ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গাজর প্রতীকে সাইফুল ইসলাম ১ হাজার ৭৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফিরোজ শেখ ব্লাক বোর্ড প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৯১। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে টেবিল ল্যাম্প প্রতীকে ৮৯২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন কামরুজ্জামান চাঁদ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মফিজুর রহমান মনা ব্রিজ প্রতীকে ৫৬৩ ভোট পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্রে নির্বাচন করেন ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু। তিনি মোবাইল প্রতীক নিয়ে ২৪ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দার টোটন নৌকা প্রতীক নিয়ে পান ১০ হাজার ৫৬ ভোট।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।