নেই জনবল, নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি

28

বাংলাদেশের একমাত্র শিশু হাসপাতালটি এখন নিজেই রোগী
ঝিনাইদহ অফিস:
ঝিনাইদহে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের একমাত্র ২৫ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি এখন ঢাল তলোয়ার না থাকা নিধিরাম সর্দ্দারের মতো। হাসপাতালে না আছে জনবল, না আছে শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি। নানা সংকটে হাসপাতালটি এখন নিজেই রোগী। নয়নাভিরাম পরিপাটি সুরম্য ভবনটি কেবল শিশু হাসপাতালের নাম পরিচয় নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে ১৬ বছর। ফলে শিশু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পেলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনবল নিয়োগ না করায় সুরম্য স্টাফ কোয়ার্টারগুলো খালি পড়ে আছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ১৫ বছর আগে দেওয়া শিশু হাসপাতালের ৩ কোটি টাকা মূল্যমানের যন্ত্রপাতির কোনো হদিস নেই। সেগুলো গায়েব হয়ে গেছে। কিছু পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি এই শিশু হাসপাতালটি ঝিনাইদহে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পর গত ৯ জানুয়ারি শিশু হাসপাতালটি যন্ত্রপাতি, ডাক্তার ও জনবল সংকট নিয়ে চালু করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম (সাবেক স্বাস্থ্য সচিব) ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানাসহ ঝিনাইদহের জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অথচ উদ্বোধনের ৬ মাস পার হলেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি ডাক্তারসহ অন্যান্য পদে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি না থাকায় ল্যাবরেটরি ফাঁকা পড়ে আছে। জনবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি চেয়ে ৭ বার চিঠি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবার। কোনো উত্তর আসেনি। সর্বশেষ ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন দপ্তর থেকে গত ১১ মার্চ ৫২৩ নম্বর স্মারকে জনবল নিয়োগ ও একই তারিখে ৫২১ নম্বর স্মারকে যন্ত্রপাতি চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর পত্র পাঠানো হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্মে আটকে আছে ঝিনাইদহ শিশু হাসপাতালের ভবিষ্যৎ।
ওই চিঠি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি শিশু হাসপাতালটিতে একমাত্র নার্স ব্যতীত অধিকাংশ পদ শূন্য। চিকিৎসকের ৫টি পদের মধ্যে স্থায়ী নিয়োগ আছে মাত্র একজন চিকিৎসকের। অফিসিয়াল কাজের জন্য ৫ জন স্টাফের মধ্যে একজনও নেই। এছাড়া ওয়ার্ড বয়, আয়া, কুক, মশালচি, মালি, ঝাড়ুদার ও সুইপার পদে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দুই জন কনসালট্যান্টের মধ্যে আছেন একজন। দাপ্তরিক বা অফিসিয়াল কাজ করার জন্য কোনো লোক নেই। নেই কম্পিউটার ও প্রিন্টার। অনেকটা হাওলাদ ও চেয়েচিন্তে সরকারি শিশু হাসপাতালের কাজ পরিচালিত হচ্ছে বলে স্টাফরা জানান।
হাসানুজ্জামান নামে এক শিশু রোগীর অভিভাবক জানান, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মোটামুটি ভালো। ওয়ার্ডের পরিবেশ চমৎকার। এখান থেকে ফ্রি ওষুধও দেওয়া হয়। কিন্তু খাওয়া ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সিস্টেম নেই। শিশু হাসপাতালটি শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেগ পেতে হয়।
বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটির জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আলী হাসান ফরিদ (জামিল) জানান, শিশু রোগীদের সবচেয়ে বেশি সমস্য হচ্ছে তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। হাসপাতালে কোনো যন্ত্রপাতি না থাকায় শিশুদের দূর-দূরান্ত থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ একটি করে ফটোথেরাপি, ইনকিউবেটার, নেবুলাইজার, এক্স-রে ও সাকার মেশিন হলে আপাতত চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতো। তিনি বলেন, নিজেদের টাকায় একটি কম্পিউটার ও প্রিন্ট মেশিন কেনা হয়েছে। ৮ জন স্বেচ্ছাসেবীর বেতন দিচ্ছেন ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিণ্টু ও জাহেদী ফাউন্ডেশন। তিনি বলেন, শিশু হাসপাতালে ১৫টি স্টিলের আলমারি, ৭টি ফাইল কেবিনেট, ৩৪টি লোহার র‌্যাক, ৭০টি চেয়ার ও ৩৬টি ফুল সেক্রেটারিয়েট টেবিল থাকলেও পড়ে থেকে সেগুলো বেশির ভাগ ব্যবহারের অযোগ্য। তবে ঘষে মেজে কাজ চালানো হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, করোনা মহামারির কারণে সবকিছু পিছিয়ে যাচ্ছে। ১০ দিনের কাজ এখন এক বছরেও হচ্ছে না। সবাই ব্যস্ত করোনা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা শিশু হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গতা ফিরিয়ে আনতে প্রতিনিয়ত চিঠির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ রাখছি। আশা করা যায় জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট দূর হবে।’
ওই হাসপাতালের নার্স ও স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে ডা. আলী হাসান ফরিদ (জামিল) দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারি শিশু হাসপাতালটির ক্রমাগত শোভা বর্ধন করা হচ্ছে। পরিত্যাক্ত জমিতে ফুল বাগান ও ফলদ ও বনজ বৃক্ষ লাগানো হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতাল চত্বর দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। মূল ভবন ও স্টাফ কোয়ার্টার সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে লোক নিয়োগ করা হয়েছে।