চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৮ মে ২০১৯
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নিরাপদ খাবার পানির সঙ্কটে গ্রামবাসী!

সমীকরণ প্রতিবেদন
মে ১৮, ২০১৯ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জীবননগরে আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় প্রায় দেড়শ জন আক্রান্ত
মিঠুন মাহমুদ:
জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের মিনাজপুর ও ঘোষনগর গ্রামে জীবনঘাতী আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ১শ’ ৫০ জন রোগী। জেনে শুনে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই বিষযুক্ত পানি পান করে একের পর এক শিশু, কিশোর, নারী ও পুরুষকে আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে হচ্ছে। জীবননগর উপজেলার অনেক গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এর মধ্যে উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের মিনাজপুর ও ঘোষনগর গ্রামের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। ওই গ্রামের ৬৮ শতাংশ নলকূপের মাত্রারিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। জনবহুল গ্রামটিতে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার লেগেই আছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে না পারায় অনেকেই জেনে শুনে বিষযুক্ত আর্সেনিক পানিই ব্যবহার করছেন। আর্সেনিক নামের অদৃশ্য বিষপান করে এ গ্রামেই অন্তত ৫০ জনের সামনে মৃত্যু নামের জম এগিয়ে আসছে। একটি গ্রামে আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্তের এ চিত্র ভয়াবহ। জীবননগর উপজেলাটি একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সরকারি হিসেব মতে ১শ’ ১৮ জন আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্বিষহ যন্ত্রনায় জীবনযাপন করছে। এসব রোগীর ব্যাপারে ওইসব গ্রামে নিরাপদ পানি ও আর্সেনিকযুক্ত টিউবওয়েল সনাক্তকরণের ব্যাপারে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উল্লে¬খযোগ্য কোনো তৎপরতা নেই।


স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে জীবননগর উপজেলায় নলকূপের পানিতে আর্সেনিক সনাক্তকরণের জন্য বাংলাদেশ আর্সেনিক মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্ল¬াই প্রকল্পের আওতায় ১২ জন সুপারভাইজার ও ৪শ’ ৫০ জন মাঠকর্মী নিয়োগ করে আর্সেনিক সনাক্তকরণের কাজ শুরু করে। ৪ মাস জরিপ করে উপজেলার ৮০টি গ্রামের ১১ হাজার ৬শ’ ৪০টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৫শ’ ৩০টি নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ধরা পড়ে। ওই সময় সংশি¬ষ্ট বিভাগের কর্মীরা আর্সেনিক যুক্ত নলকূপ লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করে দেন। কিন্তু ৯-১০ বছর পরই আর্সেনিকযুক্ত নলকূপের লাল রঙ উঠে যাওয়ার কারণে বর্তমানে ওইসব নলকূপের পানি ব্যবহার করা হচ্ছে হরহামেশাই।
এছাড়া গত ১৫ বছরে উপজেলায় আরো প্রায় ৭ হাজার নলকূপ নতুন করে বসানো হয়েছে। কিন্তু নতুনকরে বসানো এ নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপের লাল রঙ উঠে যাওয়ার কারণে জেনে শুনে এবং নতুন করে বসানো অপরিক্ষিত নলকূপের পানি না জেনে পান করার কারণে উপজেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং অপরিক্ষিত নলকূপের পানি ব্যবহারকারী লোকজনও আর্সেনিক আতঙ্কে ভুগছে।
২০০৪ সালে উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগ বিশুদ্ধ পানি সংকট লাঘবে দেশি-বিদেশি তহবিলের মাধ্যমে কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানির জন্য গভীরনলকূপ স্থাপন করে দেয়। কিন্তু সঠিকভাবে স্থাপন ও সংরক্ষণ না করায় একের পর এক তারা পাম্প ও রিংওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। এ কারণে এলাকাবাসী তার সুফল বেশি দিন পায়নি। আর্সেনিকের ভয়াবহতার ফলে ওই এলাকায় দেখা দিয়েছে সামাজিক সমস্যা। নীরব ঘাতক আর্সেনিকের কারণে এ এলাকার জনশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। শারীরিক কাঠামোতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে।
আর্সেনিকে আক্রান্ত মিনাজপুর গ্রামের আরিফ হোসেন জানান, ‘গত ১০বছর যাবত আর্সেনিকে ভুগছি। হাসপাতালে গেলে আয়রন ক্যাপসুল দিয়ে বলে খেতে থাকো সেরে যাবে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত সমস্যা হচ্ছে।’ একই অভিযোগ করেন মুনতাজ মন্ডল। তিনি বলেন, ‘এই আর্সেনিকের কারণে আমার বড় ভাই মৃত্যুবরণ করেছে। কত নেতাদের কাছে গেলাম আর্সেনিকমুক্ত একটা কলের জন্য কিন্তু সবাই আশ্বাস দিয়ে গেল, কিন্তু কেউ একটা আমাদের নিরাপদ পানি খাওয়ার জন্য কল দিলো না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, যে সমস্ত মানুষ আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত তাদের তালিকা তৈরি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উপজেলাতে বর্তমানে ১১৮ জন আর্সেনিকের রোগী ফ্রি চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জীবননগর উপজেলার সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল রাজিব হোসেন রাজু জানান, মিনাজপুর ও ঘোষনগর গ্রামসহ উপজেলার যে এলাকাতে আসের্নিক দেখা দিয়েছে, সে সব এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান বরাবর আমরা তালিকা চেয়েছি, তালিকা দিলে আমরা কাজ শুরু করে দিবো।
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি এ উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি মাত্র। ওই এলাকাতে যে এত আর্সেনিক আছে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে খুব দ্রুত বিভিন্ন গ্রামে আর্সেনিকমুক্ত নলকুপ স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং আর্সেনিক সনাক্তকরণের পর আর্সেনিকযুক্ত নলকূপে লাল রঙ করে দেয়া হবে।
তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, মিনাজপুর এলাকাতে যে সব গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো অপরিকল্পিতভাবে স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে ওই সমস্ত গভীর নলকূপের পানিতেও আর্সেনিক দেখা গেছে। তবে গোটা এলাকায় এখন আর্সেনিকের ভয়াবহে দিনযাপন করছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো। ‘কেউ কি নেই, তাদের নিরাপদ পানির সু-ব্যবস্থা করার’ এমনটি প্রশ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।