নিউজের জন্য নয়, দান করুন মন থেকে

514

সমীকরণ প্রতিবেদক:
প্রায় সময়ই অনুরোধ আসে, অমুক ভাই….মাস্ক দিয়েছে, নিউজটা ছাপালে ভালো হয়, একটু পর আবার ফোন, তমুক স্যার স্যানিটাইজার ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে, নিউজটা অবশ্যই ছাপবেন। সারা দিন-রাত-বিকেল এরকম অনুরোধের ফোন আসে বেশ কয়েকবার।
তাঁদের অনুরোধের নিউজ ও নিউজের ছবিগুলোয় মনোযোগ দেই। দেখি, কিছু দানসামগ্রী টেবিলের ওপর রাখা। কয়েকজন উৎসাহী মানুষ ধরে আছে সেগুলো। সেখানে দাতার চোখ গ্রহীতার দিকে নয়, ক্যামেরার দিকে। যেন সকল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ক্যামেরা। যেখানে দান করে নয়, দান দেখানো নিয়ে দাতা আসলে খুব উৎসাহী। আরও ভালো করে দেখি, অসহায় মানুষগুলো রোদের মধ্যে দানের বস্তু ধরে মলিনমুখে দাঁড়িয়ে। তাঁকে বারবার বলা হচ্ছে ক্যামেরার দিকে তাকাতে। হয়নি, আরেকবার নিতে হবে। না আরও একবার। এভাবে ক্লিক ক্লিক করে ছবি নেওয়া শেষ। এবার দান দেওয়াও শেষ। দাতা ও তাঁর অনুসারীরা এবার হাসিমুখে জাবর কাটেন। সব টিভি চ্যানেল ও পত্রিকায় নিউজ যাবে, তাই আত্মতৃপ্তিতে ঢেকুর তোলেন দাতা। ফোনে অনেককে বলেনও টিভি দেখার জন্য ও পত্রিকা পড়ার জন্য।
সুপ্রিয় দাতা, একবারও কি ভেবেছেন যিনি দান নেন, এ দান নিতে তাঁর কত ছোট হতে হয়। কতটা লজ্জা পেতে হয় তাঁকে। দান নেওয়া নিশ্চয় সুখকর কিছু নয়। আত্মসম্মানে লাগার কথা। লাগেও। কিন্তু জীবন যেখানে জটিল, সেখানে দুহাত বাড়ানো ছাড়া আর কী করতে পারে এই অসহায় মানুষগুলো। আর তাঁদের অসহায়ত্ব নিয়ে খেলা খেলে কিছু মানুষ। তখনই ভাবতে বসি, মূল উদ্দেশ্য কী, দান নাকি প্রচার? নিজের ঢোল নিজে পেটাও। এ নীতিতে আত্মপ্রচার আজ সমাজে তুঙ্গে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের মানুষই আছেন। যে যা করে না, আজ তাও বলেন। যে যা করে, আজ তাও বলেন। সেই ছোটবেলায় প্রবাদ পড়েছিলাম, আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। প্রবাদের কথাগুলো যেন আজ হালকা হয়ে গেছে। দাতা সাজা এই লজ্জাহীনরা বড় বড় কথার তুবড়িও ছোটান। তাঁদের ক্ষমতার দম্ভে স্তম্ভিত মানুষ। অনেকেই হয়তো দ্বিমত করবেন, দান করে দেখালে সমস্যা কি? এতে অনেক মানুষ জানবে। তাঁরা উৎসাহিত হবে। একদম ঠিক। তবে কোনটা সত্যিই দান, আর কোনটা লোক দেখানো মানুষ কিন্তু আজ সত্যিই তা বোঝে। একবার নেপালে ভূমিকম্প হয়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেময় নেপালে ত্রাণসামগ্রী হিসেবে পুরোনো কাপড় পাঠিয়েছিল ভারত। নেপাল সরকার তা না নিয়ে সবিনয়ে তা ফেরত পাঠিয়ে দেয়। পারলে ভালো কাপড় দিবে নয়তো নয়। তাঁদের কথা, আমার দেশের নাগরিক ব্যবহৃত কাপড় পরবে না। ভারত লজ্জা পেয়ে ফেরত নেয়। পরে ভালো কাপড় পাঠায়।
আমরা অনেকেই হয়তো আলমারিতে খুঁজে দেখি কোন জামাকাপড়গুলো পরার যোগ্য নয়, সেগুলো মানুষকে দিয়ে দেই। গরিবদের খাওয়াতে গেলে হাড্ডি-চর্বি ভর্তি মাংসগুলো দেই। আর নিজের জন্য ভালো মাংস রেখে দেই। এভাবে দান করে বিরাট সওয়াবের কাজ করে ফেলেছি বলে মনে করি। আসলেই কি তাই?
এই যে ফেসবুকে করোনা নিয়ে কত যে লাইভ দেখলাম। সবাই কি সচেতনতার জন্য করেছেন? নিজের আত্মপ্রচারের জন্য কি অনেকে করেননি? আপনি লাইভ করে আপনার টাইমলাইনে রাখুন। অন্যকে বিরক্ত করা কেন? বলা হয় গোপনে দান করার কথা। দান করার সময় যেন ডান হাত যেন না জানে বাম হাতের কথা। বাম হাত না জানে ডান হাতের কথা। অথচ দান আজ প্রচারেই প্রসারের সামগ্রী হয়ে গেছে। ৫ শ টাকার দান করে প্রচারের জন্য খরচ করা হয় ৫ হাজার টাকা। গরিব অসহায় মানুষদের সামনে রেখে এক ধরনের মহান সাজা। অন্যের পরামর্শে নয়, নিজেই নিজেকে শোধরান। দেখানো নয়, ক্যামেরায় নিউজের জন্য নয়, দান করুন সত্যিই মন থেকেই। সেটা যতটুকুই হোক না কেন। মন থেকে করা কাজ ঠিকই বুঝতে পারে মানুষের মন।