চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১৫ আগস্ট ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নাটোরের সেই ভাইরাল সহকারী অধ্যাপক নাহারের আত্মহত্যা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
আগস্ট ১৫, ২০২২ ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: কলেজছাত্রকে বিয়ে করে সারা দেশে ভাইরাল হওয়া নাটোরের খুবজিপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন। অসম বিয়ের কারণে ফেসবুকে নেতিবাচক মন্তব্যসহ নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এই শিক্ষিকা। তার স্বামী মামুন জোরালো ভাবে বলেছিলেন, ভালোবাসার কোনো বয়স নেই, মন্তব্য কখনো গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তার এমন বক্তব্যও সারা দেশে ভাইরাল হয়। জীবনের শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত এক সাথে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন আলোচিত এই ছাত্র-শিক্ষিকা দম্পতি। কিন্তু বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় গতকাল রোববার ভোরে নাটোর শহরের বলারীপাড়ার ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন এই শিক্ষিকা। তবে হত্যা না আত্মহত্যা বিষয়টি নিশ্চিত হতে বাসা থেকে আটক স্বামী কলেজছাত্র মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। প্রায় ৪৭ বছর বয়সী শিক্ষিকা খায়রুন নাহার ২২ বছর বয়সী স্বামী মামুনকে নিয়ে নাটোর শহরের বলারীপাড়ার নান্নু মোল্লা ম্যানশনের চারতলায় ভাড়া থাকতেন।
পুলিশ, ভবনের পাহারাদার নাজিম উদ্দিন ও নিহতের স্বজনরা জানান, নাটোরের বলারীপাড়ার হাজী নান্নু মোল্লা ম্যানশনের ফটক নিয়মিত রাত ১০টায় বন্ধ করে দেয়া হয়। গত শনিবার রাত ১১টার পর খায়রুন নাহারের স্বামী মামুন বাসায় আসেন। আবার রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে পাহারাদারকে দিয়ে গেট খুলে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান। এ সময় বাসার পাহারাদার নাজিম উদ্দিন তাকে এত রাতে বাইরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেন। পরে রোববার সকাল ৬টার দিকে মামুন বাসায় ফিরে আসে। একটু পরেই সে বাসার পাহারাদারকে জানায় তার স্ত্রী খায়রুন নাহার সিলিংফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সাথে সাথে তিনি ওই বাসায় গিয়ে দেখতে পান বাসার বসার ঘরের মেঝেতে অধ্যাপিকার লাশ পড়ে রয়েছে। বিষয়টি তার সন্দেহ হওয়ায় তিনি মামুনসহ কক্ষের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে সাথে সাথে বাসার মালিক নান্নু হাজীকে বিষয়টি জানান। বাসার মালিক নাটোর থানায় ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানান। সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় পৌর এলাকার মো: খয়ের উদ্দিনের মেয়ে। তার স্বামী মামুন হোসেন একই উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের পাটপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে ও নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। খায়রুন নাহার ছাত্রজীবনেই রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার আড়ানী এলাকায় বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের সাথে দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই ছেলেসন্তান আছে। সেই স্বামীর সাথে তালাকের এক বছর পর ফেসবুকের মাধ্যমে মামুনের সাথে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের ছয় মাস পর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর কাজী অফিসে গিয়ে দু’জন বিয়ে করেন। বিয়ের প্রায় ছয় মাস পর গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে বেশ আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সারা দেশের সচেতন মানুষ ছাত্রকে শিক্ষিকার বিয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে হাজারো মন্তব্য করেন। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর নিজের কর্মস্থলের কোনো সহকর্মী খায়রুন নাহারের সাথে কথা বলত না। আত্মীয়স্বজনরাও তাকে ত্যাগ করেছিল। এর মধ্যে অসম বয়সের বিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কটূক্তি তাকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল।
গতকাল সকালে পুলিশ মামুনকে আটকের সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে মামুন বলেন, খায়রুন নাহারের বিভিন্ন ব্যাংক ও এনিজওতে ১৬ লাখ টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে তার ছেলে ৬ লাখ টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। এসব বিষয়ে খায়রুন নাহার মানসিকভাবে খুবই চাপে ছিলেন। তাই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। নিহত সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের ভাতিজা নাহিদ হাসান বলেন, নতুন এই বিয়ের পর থেকেই মামুন তার ফুফুর কাছে পালসার মোটরসাইকেলসহ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছে। নতুন করে আবার আর ওয়ান-৫ মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার জন্য বউকে চাপ দিচ্ছিল। তিনি বলেন, মামুন নেশা করত। মামুনের চাপেই তার ফুফু আত্মহত্যা করেছে। নিহত সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের চাচাতো ভাই সাবির উদ্দিন বলেন, অসম বয়সের বিয়ে হওয়ায় খায়রুন নাহারের কলেজের কোনো সহকর্মী তার সাথে কথা বলতেন না। বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজনরা যোগাযোগ রাখতেন না। বিয়ের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় খায়রুন নাহার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মামুনের কোনো স্বজনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাবা মোহাম্মদ আলীর মোবাইল ফোন বন্ধ। তার চাচা আহম্মদ আলী মেম্বারকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। এ দিকে ঘটনার পর নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা, পিবিআই পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন ও সহকারী পুলিশ সুপার মহসিনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় পিবিআই পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন বলেছেন, সব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও তদন্ত অগ্রসর হলে এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা যাবে। নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেছেন, বিষয়টি আত্মহত্যার মতোই মনে হচ্ছে। সিলিংফ্যানে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে যেভাবে ওড়না আগুন দিয়ে পুড়িয়ে খায়রুন নাহারকে তার স্বামী নামিয়েছেন এটা বিশ^াসযোগ্য। কাপড় এবং ফ্যানের কিছু অংশ পোড়া অবস্থায় দেখা গেছে। তারপরও মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত স্বামী মামুন বাইরে থাকাসহ সবগুলো পয়েন্ট মাথায় রেখেই পুলিশ তদন্তকাজ শুরু করেছে। মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।