নতুন বাজেট নিয়ে ভাবনা

34

বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত
২০২১ সালের প্রথম চার মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেট নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা যাচ্ছে, এবারের বাজেটের আকার ছয় লাখ কোটি টাকার কিছু কমবেশি হতে পারে। চলতি বছর বাজেট দেয়া হয়েছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। প্রতিবছর বাজেট তৈরির আগে আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা হয়, তাদের পরামর্শ ও সুপারিশ ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হয়। কিছু গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে বাজেটের মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। এবার সে রকম সংলাপ হয়েছে সামান্যই। অর্থ বিভাগ এবং এনবিআর ভার্চুয়ালি বা সরাসরি যেটুকু আলোচনা করেছে তা খুব একটা ফলদায়ক হয়েছে এমন বোধ হয় না। এর মূল কারণ কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি। মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ থেকে জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়। লকডাউন, সাধারণ ছুটি ইত্যাদি কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চরম স্থবিরতা নেমে আসে। বন্ধ হয়ে যায় কল-কারখানায় উৎপাদন। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবন-জীবিকায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই এর বিরূপ প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে। কমে যায় রফতানি আয়। আমদানিতেও ধস নামে। একমাত্র প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই ছিল নিম্নগামী। সেই প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পেছনেও মুখ্য ভূমিকা মনে করা হয় সরকারের দেয়া ২ শতাংশ এবং কিছু ব্যাংকের বাড়তি আরো ১ শতাংশ হারে দেয়া প্রণোদনার। এখন যে পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়েছে এমন নয়। বরং করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় তরঙ্গ আরো প্রবল বলে প্রমাণিত হয়েছে। নতুন করে লকডাউন, যান চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শিল্প-কারখানা খোলা রাখা হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে চলতে পারে সেই সুযোগও দেয়া হচ্ছে। এতে মহামারী পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে; তা অনুমান করা শক্ত নয়। ফলে এবারের বাজেটেও মহামারীর প্রভাব থাকবে সেটি নিশ্চিত। আমরা জানি, সরকার এখনো গত অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ঘোষণা করতে পারেনি। করোনা পরিস্থিতির স্থবিরতার পরও গায়ের জোরে মূল বাজেটে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সর্বশেষ সেটি ৪ শতাংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশি দেখানো হতে পারে বলে পত্রিকান্তরের রিপোর্টে জানা যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার বানিয়ে দেখানো গত এক যুগের একটি মন্দ অনুশীলন। অর্থনীতির কোনো হিসাবই ইচ্ছামতো বাড়িয়ে-কমিয়ে দেখানোর সুযোগ নেই। কিন্তু সেটিই করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে করোনাকালে এ লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় থাকবে। কারণ চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫০ শতাংশেরও কম। আগামী বাজেটেও মহামারী থেকে মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচানোর লক্ষ্যে বিশেষ বরাদ্দ থাকবে বলে মনে হয়। কারণ করোনার টিকা নিয়ে এরই মধ্যে অনেক জটিলতা দেখা দিয়েছে। বেশি দামে ভারত থেকে টিকা আনার চুক্তি করেও তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন ভারত ছাড়া অন্য আরো দেশ থেকে টিকা আনা যায় কি না সেই চেষ্টা চলছে। দেশেই টিকা উৎপাদন করা হবে এমন একটি উদ্যোগের কথাও শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা কর্মসূচিও নিতে হতে পারে। করোনা চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও আমাদের ব্যর্থতা আছে। অক্সিজেনের স্বল্পতা আছে। অন্যান্য সরঞ্জামও অপ্রতুল। এসব খাতে বরাদ্দ রাখা জরুরি। সব দিক বিবেচনায় আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ খুব বেশি না বাড়ানোই উচিত হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারও একটি বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরির কথাই ভাবছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে দেশে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি সরকারকে ভাবতে হবে।