দেড় লাখ টাকায় বিক্রির গুঞ্জন!

33

চুয়াডাঙ্গায় সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতককে নিয়ে বিভ্রান্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় সদ্যভূমিষ্ট এক দিন বয়সের এক নবজাতককে নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে নবজাতকটিকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে এক নিঃসন্তান দম্পতির নিকটে। গতকাল রোববার রাতে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পুলিশ ওই শিশুটিকে উদ্ধার করে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুটিকে দত্তক নিতে চাওয়া দম্পতি শিশুটির আশা ছাড়েনি।
জানা যায়, গত শনিবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সড়কের উপশম নার্সিং হোমে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন দৌলতদিয়াড় এলাকার তালাকপ্রাপ্তা সুমাইয়া নামের মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবতী। তিন মাস পূর্বে সুমাইয়াকে নিজ ভাড়া বাড়ি চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মার্কাজ মসজিদপাড়ায় এনে রাখেন সদর উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি গ্রামের হান্নানের মেয়ে ববিতা। সুমাইয়ার গর্ভের সন্তানটি নিতে চেয়েছিলেন তাঁরই এক নিকট আত্মীয় একই এলাকার গোপালপুর গ্রামের নিঃসন্তান দম্পত্তি রিপন আলী ও তাঁর স্ত্রী লিপা খাতুন। এদিকে গত শনিবার সুমাইয়া বাঁচ্চা প্রসব করলে গতকাল বাঁচ্চাটি নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে যান রিপন আলী ও তাঁর স্ত্রী লিপা। এরপর থেকেই সদ্য ভূমিষ্ট ওই বাঁচ্চাটির দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানতে পেরে সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ভবতোষ শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। গতকাল রাত ৯টার দিকে ওই দম্পত্তি শিশুটিকে নিয়ে উপসম নার্সিং হোমে ফিরে আসে এবং বাঁচ্চাটি তাঁর মায়ের নিকট দেন।
এদিকে বাঁচ্চাটির বিক্রির বিষয়ে ও সুমাইয়াকে নিজের বাড়িতে এনে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে ববিতা বলেন, ‘মার্কাজ মসজিদপাড়ায় ভাড়া থাকার পূর্বে আমি দৌলতদিয়ারে ভাড়া থাকতাম। সেসময় মাঝে মধ্যে সুমাইয়া পাগলীকে দেখতে পেতাম। আমার স্বামী কর্মসূত্রে কুষ্টিয়া থাকে। এখানে একাই থাকি আমি। সুমাইয়া সাত মাসের অন্তঃসত্তা হওয়ায় তাঁকে মানবিক দিক থেকে নিজের সঙ্গে রাখার সিদ্ধান্ত নিই। এছাড়াও আমার এক নিকট আত্মীয় নিঃসন্তান হওয়ায় সুমাইয়ার বাঁচ্চাটির বিষয়ে তাঁদেরকে জানায়। এতে করে বাঁচ্চাটি যেন একটি নিরাপদ আশ্রয় পায়। এরপর থেকেই রিপন আলী ও লিপা দম্পত্তি সুমাইয়ার দেখাশোনা করে আসছিল। বাঁচ্চাটিকে বিক্রি করা হয়নি।’
রিপন আলী ও লিপা দম্পত্তির কাছে জানতে চাইলে রিপন আলী বলেন, ‘আমাদের ১৪ বছরের দাম্পত্ত জীবনে কোনো সন্তান হয়নি। রাজশাহীতে চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু ডাক্তার বলেছে আমার স্ত্রী কখনও সন্তান সম্ভাবা হবে না। কিন্তু একটি সন্তানের জন্য অনেক কবিরাজের কাছেও ঘুরেছি। তবে তিন মাস পূর্বে ববিতার থেকে ওই বাঁচ্চাটির বিষয়ে জানতে পারি। তখন থেকেই গর্ভবতী নারী ও গর্ভের সন্তান দুজনেরই খোঁজখবর রাখতে শুরু করি। এরপর থেকে বাঁচ্চাটি প্রসব হওয়া পর্যন্ত ওষুধপত্র ধরে আমাদের ৩০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। আমরা বাঁচ্চাটি আইনি প্রত্রিয়া সম্পন্ন করেই নিতে চাই।’
চুয়াডাঙ্গা উপসম নার্সিং হোমের সত্ত্বাধিকারী ডা. জিন্নাতুল আরা বলেন, ‘অন্তঃসত্তা সুমাইয়াকে গত শনিবার উপসম নার্সিং হোমে নেওয়া হয়। সিজারিয়ান পদ্ধতিতে শনিবার শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়। সার্জারি কনসালটেন্ট ডা. এহসানুল হক তন্ময় সুমাইয়ার অস্ত্রপচার করেন। এদিকে আজ (গতকালা রোববার) রাতে শুনছি নবজাতক শিশুটিকে অন্য এক দম্পত্তি নিয়ে গেছে। পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁরা নবজাতকটিকে আবার নার্সিং হোমে ফিরিয়েও এনেছে।’ বাঁচ্চাটিকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। উপসম নার্সিং হোমে আমরা মা-শিশু দুজনকেই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া চেষ্টা করেছি।’
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ ফকরুল আলম খান বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে বাঁচ্চাটিকে তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু জন্মদাত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন ও তাঁর নিজস্ব কোনো ঘর-বাড়ি নেই, সেক্ষেত্রে বাঁচ্চাটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তবে নিঃসন্তান এক দম্পতি বাঁচ্চাটিকে দত্তক নিতে আগ্রহী বলে জানতে পেরেছি, বাঁচ্চাটি তারাই নিয়ে গিয়েছিল। যেহেতু শিশুটির একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হওয়া প্রয়োজন, তাই ওই দম্পত্তি চাইলে আইনের মাধ্যমে বাঁচ্চাটিকে দত্তক নিতে পারবে।’
দেড় লাখ টাকায় বাঁচ্চাটি বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘বাঁচ্চাটিকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে, এমন একটি তথ্য আমরা শুনেছিলাম। বিষয়টি গুরুত্বের সহকারে তদন্ত করা হয়েছে, তবে কোনো সত্যতা মেলেনি।’