চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১৮ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল সিলেট নগরী

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ১৮, ২০২২ ২:১৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: মাত্র দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে সিলেট নগরজুড়ে থৈ থৈ অবস্থা। যেন হঠাৎ নামা পাহাড়ি ঢল কিংবা বাঁধ ভাঙা বন্যায় তলিয়ে গেছে গোটা নগরী। বাসাবাড়ি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিচতলায় উঠে পড়ে পানি। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। এই অবস্থায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। নেটিজেনরা ফেসবুকে মেয়রের অপরিকল্পিত উন্নয়নের সমালোচনায় মুখর। স্থানীয়রা বলছেন, সিটি করপোরেশনের (সিসিক) অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্যার পর ড্রেনে জমা হওয়া আবর্জনা পরিষ্কার না করার কারণেই বৃষ্টিতে এই ভোগান্তি। আর সিসিক জানিয়েছে, বন্যার পর ড্রেন পরিষ্কার করা হয়নি। এতে পানি আটকে তলিয়েছে নগর।

শনিবার রাত ১১টার দিকে সিলেটে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। গেল কয়েক দিনের দাবদাহের পর বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি আনলেও জলাবদ্ধতার বিড়ম্বনায়ও কম ভোগায়নি। টানা একসপ্তাহ চলা দাবদাহে অতিষ্ঠ ছিল জনজীবন। বৃষ্টির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। অবশেষে শনিবার মধ্যরাতে স্বস্তির বৃষ্টি আসে সিলেটে। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। মাত্র দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় নগরের বেশির ভাগ এলাকা। রাতে নগরের সোবহানিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কে হাঁটুর উপরে পানি জমে গেছে। এর মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। সোবহানিঘাট ছাড়াও বৃষ্টিতে নগরের জিন্দাবাজার, বারুতখানা, হাওয়াপাড়া, আম্বরখানা, চৌহাট্টা, লোহারপাড়া, বড়বাজার, লামাবাজার, মদিনা মার্কেট, চারাদীঘিরপাড়, সওদাগরটুলা, যতরপুর, উপশহর, শিবগঞ্জ, শাপলাবাগ, তালতলা, সুবিদবাজার, ঘাসিটুলা, শামীমাবাদ, জল্লারপাড়, ভাতালিয়া, কানিশাইল, মজুমদারপাড়া, মেন্দিবাগ, দরগামহল্লা, লালদীঘিরপাড়, কুয়ারপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে। এসব এলাকার বেশির ভাগ বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি উঠে যায়। মধ্যরাতে ঘরে পানি ঢুকায় মানুষ পড়েন চরম দুর্ভোগে। নগরের দরগাহ মহল্লার বাসিন্দা ফটো সাংবাদিক আজমল আলী বলেন, বৃষ্টি শুরুর আধঘণ্টা পরই ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার এমন দুর্ভোগে পড়তে হলো। এর আগেও বন্যার সময় প্রায় ১৫ দিন ঘরে পানি ছিল। পানি নামার পর সবকিছু পরিষ্কার করে কিছুদিন আগে মাত্র ঘরে উঠেছি। আবার পানি ঢুকে পড়ল। আমাদের দুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না।

দিকে শনিবার রাতের বৃষ্টিতে পানি ঢুকে পড়ে সিলেটের বইয়ের বাজার হিসেবে পরিচিত জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনেও। এই মার্কেটের ব্যবসায়ী কলিম উদ্দিন বলেন, বৃষ্টিতে মার্কেটে পানি ঢুকে কয়েক লাখ টাকার বই ভিজে নষ্ট হয়েছে। এর আগে ১৮ জুন বন্যার পানি ঢুকে মার্কেটের কোটি টাকার বই নষ্ট হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দুদিন পরপর এই যন্ত্রণা থেকে আমরা কিভাবে নিস্তার পাব। জানা যায়, গত ১৫ জুন থেকে তৃতীয় দফায় বন্যা শুরু হয় সিলেটে। এতে তলিয়ে যায় সিলেটের ৮০ শতাংশ এলাকা। নিম্নাঞ্চলে এখনো বন্যার পানি থাকলেও নগর থেকে পানি নেমেছে। এর আগে গত মে মাসে আরেক দফা বন্যায় পানি ঢুকে নগরের বেশির ভাগ বাসা বাড়িতে। প্রসঙ্গে লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি রাজন দাশ বলেন, নগরের ড্রেনগুলো খুব সরু আকারে নির্মাণ করা হয়েছে, ছড়াগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি কাটতে পারছে না।পানি নিষ্কাশন উদ্ধার ড্রেন নির্মাণে সিসিকের বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এই খাতে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এই টাকা দিয়ে কী কাজ হয়েছে তা প্রকাশ করা দরকার। কেন এত প্রকল্পের পরও এভাবে পানি জমে যাচ্ছে তা জানা দরকার। ড্রেনের নেটওয়ার্ক ঠিক আছে কিনা তা খোঁজ নিয়ে দেখা প্রয়োজন জানিয়ে রাজন দাশ বলেন, পানি ড্রেন দিয়ে যেখানে গিয়ে নামার কথা সেখানে নামছে কিনা তা দেখতে হবে। ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করতে হবে। এর আগে জুলাইয়ের শুরুর দিকেও ভারী বৃষ্টিতে সিলেট নগরের বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ওই সময় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জলাবদ্ধতার জন্য নদীর পানি বৃদ্ধিকে দায়ী করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সুরমার পানি বিপদসীমার ওপরে থাকায় ছড়াখাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে উল্টো নদীর পানি শহরে ঢুকছে। তবে এবার নদীর পানি বিপদসীমার অনেক নিচে রয়েছে। তবু জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হলো নগরবাসীকে। এই জলাবদ্ধতার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জলাবদ্ধতার জন্য মেয়রের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজকে অনেকেই দায়ী করেন।

সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নদীতে বন্যা নাই, কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর মেইন রোডগুলোতে এমন পানি পুরাই হাস্যকর, মাগার শত শত কোটি টাকা কই গেল রে।ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেটের সভাপতি শেখ মো: নাসির ফেসবুকে লেখেন, ‘নগরীতে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হচ্ছে। আশা করি আগামী ২৫ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করা গেলে ৩০ বছর পর যতই বৃষ্টি হোক, প্রবল বৃষ্টি, মেয়র বৃষ্টি, কাউন্সিলর বৃষ্টি হোক না কেন নগরীতে বন্যা হবে না। তত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং নির্বাচিত করে যেতেই হবে। আর পরিকল্পিত নগরীর স্বপ্ন দেখতে হবে। তোমার আমার মার্কা কী!’ ব্যাপারে সিসিক মেয়রের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় জানিয়ে এসএমএস করা হলেও সাড়া দেননি তিনি। তবে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান ড্রেন পরিষ্কার না করার কথা স্বীকার করে বলেন, বন্যার পর আমরা ছড়াগুলো পরিচ্ছন্নতার কাজে মনোযোগী ছিলাম। এরপরে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে আমাদের টিমগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণে ড্রেনের আবর্জনাগুলো সেভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। তিনি বলেন, ড্রেনে আবর্জনা জমেছে কিনা তা এখন আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব। পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাব। ছড়াখাল উদ্ধার ড্রেন নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সব প্রকল্পের কারণে এখন আর আগের মতো নগরে পানি জমে না। তবে কালকেরটা ব্যতিক্রম।শনিবার রাতে সিটি মেয়রের বাসায়ও পানি ঢুকে পড়েছিল বলে জানান তিনি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।