দেশে ভয়ঙ্কররূপে করোনার বিস্তার

29

প্রস্তুতির অভাবেই শোচনীয় অবস্থা
দেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তের পর জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সংক্রমণ। ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন মৃত্যু ও সংক্রমণের হার রেকর্ড ভাঙছে। এতো সংক্রমণের হার বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় দুঃসংবাদ। মৃত্যু ও সংক্রমণের হার যত বাড়ছে, চিকিৎসার অব্যবস্থাপনাও তত প্রকট হচ্ছে; যা এরই মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১৩ দিনে দৈনিক মৃত্যু শতাধিকের বেশি। এখন দুই শ’র ঘরে পৌঁছেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে শনাক্তের সংখ্যা। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকে তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চারদিকে। ১৩ দিনে সারা দেশে করোনায় এক হাজার ৯৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসময়ে আক্রান্ত লক্ষাধিক। এখন পর্যন্ত দেশে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে গতকাল। এদিন মৃত্যু হয়েছে ২১২ জনের।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নেয়ার কারণেই যে করোনা পরিস্থিতির শোচনীয় অবস্থা তা বলাই বাহুল্য। এ জন্য প্রধানত দায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয়ও দায় এড়াতে পারে না। প্রথম তরঙ্গ সামলানোর ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল। যেমন একটি কেন্দ্রে আরটিপিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু করা। প্রয়োজনীয় জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি না করা। জনগণকে সম্পৃক্ত করার কৌশল ঠিক না করা। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন মাস্ক, হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর স্বল্পতা চিহ্নিত ছিল। এ জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাতে ব্যাপক ঘাটতি থাকার বিষয়টি স্পষ্ট। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কেন ব্যর্থ হচ্ছেন তা বলতে হবে। একই সাথে সবার সাথে আলোচনা করে কার্যকর সমাধান বের করতে হবে। কারণ, প্রতিটি সমস্যারই সমাধান আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম থেকেই জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততার কথা বলে আসছে। অথচ সরকার আজো জনসম্পৃক্ততার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। আগাম প্রস্তুতি থাকলে তৃতীয় ঢেউ মোকাবেলা সহজ হতো। ক্ষতিও কম হতো।
করোনা নিয়ন্ত্রণে যেখানে টিকার বিকল্প নেই, সেখানে টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় দেখা দিয়েছে আজকের দুর্গতি। সবার জানা, যত দ্রুত ৭০-৮০ শতাংশ নাগরিককে টিকা দেয়া নিশ্চিত করা যাবে, তত তাড়াতাড়ি করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে। চীনের প্রথম প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছি আমরা। দ্বিতীয় বড় ভুল ছিল একটি মাত্র উৎস, ভারতনির্ভরতা। এ দুই ভুলের খেসারত দিচ্ছেন দেশবাসী। এমন বোকামির জন্য সরকারের জবাবদিহি থাকা উচিত।
লকডাউন ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নবিদ্ধ। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য লোকজনের চলাচল একেবারে বন্ধ করে সুনির্দিষ্ট সময়ে কনট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এসব সারা দেশেই সম্ভব ছিল। জনপ্রতিনিধিদের সাহায্য নিয়ে সরকার এটি সফলভাবে একসাথে দেশব্যাপী বা সংক্রমণ এলাকাভিত্তিক করতে পারত। এখনো এই সুযোগ রয়েছে। এ কর্মপন্থা নিয়ে এগোলে জনসমর্থন ও জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে বাস্তবায়ন সহজ হবে। সরকারকে প্রথমে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করতে হবে। সাথে সাথে জনগণকে অবহিত করতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে কার বা কোন মন্ত্রণালয়ের কী দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিতে হবে। নাগরিকদের জানাতে হবে তাদের করণীয় কী, কিভাবে তারা সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হতে পারেন। করোনা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোন কোন কাজ কখন করতে হবে, কে করবেন সেগুলো পরিকল্পনামাফিক করে নজরদারি ও তদারকি করে জনগণের গোচরে আনতে হবে। মনে রাখা আবশ্যক, জনগণের সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হতে হবে।