দেশে করোনার তাণ্ডবে মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়াল

54

চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরে, ঝিনাইদহে করোনা ও উপসর্গে ১৪ জনের প্রাণহানি
২৪ ঘণ্টায় নতুন ২৩৭ জনের মৃত্যু, ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জন শনাক্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সারা দেশে করোনাভাইরাস তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত পূর্বের রেকর্ড ভেঙে সৃষ্টি করছে নতুন নতুন রেকর্ড। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের আরও ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, গতকাল চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪২ জনের শরীরে। গতকাল মেহেরপুরে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও একজনের। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৬ জন। গতকাল ঝিনাইদহে করোনা ও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের এবং নতুন করে করোনা শনাক্ত হযেছে আরও ৭৬ জনের শরীরে।
চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত দুজন ও উপসর্গ নিয়ে চারজন। গতকাল বুধবার সদর হাসপাতালের ডেডিকেটেড করোনা ইউনিটের রেড জোনে ও ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে চারজনের। উপসর্গ নিয়ে অন্য দুজনের মৃত্যু হয়েছে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। গতকাল জেলায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৪২ জনের শরীরে। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৫১ জনে। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করে।
জানা যায়, গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষিত ১৮৮টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে ৪২টি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। বাকী ১৪৬টি নমুনার ফলাফল নেগেটিভ আসে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় করোনা শনাক্তের হার ২২.৩৪ শতাংশ। গতকাল নতুন শনাক্ত ৪২জনের মধ্যে সদর উপজেলার ১০জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ২১ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ৮ জন ও জীবননগর উপজেলার ৩ জন রয়েছে। গতকাল জেলায় করোনা থেকে আরও ১৪ জন সুস্থ হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৪ জন। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য ১৮৪টি নমুনা সংগ্রহ করে কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করেছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম জানান, গতকাল সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা আক্রান্ত দুজন ও উপসর্গ নিয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর নিহতদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। উক্তা নমুনাগুলি কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষার জন্য পেরণ করা হবে। গতকালই করোনা প্রটোকলে নিহতের লাশ পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে জেলায় আক্রান্ত হয়ে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে মোট ১৫৭ জনের ও জেলার বাইরে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৭ জনের।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ২১ হাজার ৮৬৬টি, প্রাপ্ত ফলাফল ২১ হাজার ৭২৮টি, পজিটিভ ৫ হাজার ৯৫১ জন। জেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৯৩১ জন হোম আইসোলেশন ও হাসপাতাল আইসোলেশনে রয়েছে। এর মধ্যে হোম আইসোলেশনে আছে ১ হাজার ৮৩৪ জন ও হাসপাতাল আইসোলেশনে ৯৯ জন। জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ১৭৪ জনের। এর মধ্যে জেলায় আক্রান্ত হয়ে জেলার হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে ১৫৭ জনের। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত নয়টায় মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জিন এক্সপার্ট ল্যাবে পরীক্ষিত ৩৩১টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে এর মধ্যে ৯৬টি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্ত ৯৬ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ৪৮ জন, গাংনী উপজেলার ৪৪ জন ও মুজিবনগর উপজেলার ০৪ জন রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৯.০ শতাংশ। মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মেহেরপুর জেলায় মোট পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৫৬৮ জন। এর মধ্যে সদরে ১৬১ জন, গাংনীতে ৩০৭ ও মুজিবনগরে ১০০ জন। এ পর্যন্ত মেহেরপুরে মারা গেছেন মোট ১৩২ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৫৮ জন, গাংনী ৪৬ জন ও মুজিবনগরে ২৮ জন।
ঝনাইদহ:
ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘন্টায় করোনা ও উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত সাতজনের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৪ জন ও উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন উপজেলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঝিনাইদহে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৭৬ জনের শরীরে। ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, গতকাল বুধবার সকালে ঝিনাইদহ ল্যাব থেকে ২৪৯ জনের নমুনার ফলাফল এসেছে। এদের মধ্যে ৭৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে সদরে রয়েছে ২২ জন, শৈলকুপায় ১৮, হরিণাকুন্ডুতে ৭ জন, কালীগঞ্জে ৯ জন, কোটচাঁদপুরে ৮ ও মহেশপুরে রয়েছেন ১২ জন রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৩০.৫২ শতাংশ। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৪৩ জন। এ পর্যন্ত জেলায় করোনা আক্রান্ত মোট ৪ হাজার ৪৬ জন সুস্থ হয়েছেন।
সারা দেশ:
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ২০ হাজার ১৬ জনে। এর আগে গতকাল ২৭ জুলাই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছিলো। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২ জনে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৬ হাজার ১৫৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তবে দেশের ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ পরীক্ষা করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৮৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ১২ শতাংশ। এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একদিনে নতুন করে সুস্থ হয়েছেন ১৩ হাজার ৪৭০ জন। এ নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৪ জন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়া ২৩৭ জনের মধ্যে ৯১ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে একজন, ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ১৫ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ৪৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ৭৮ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৪৪ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩৪ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১১ জন ও ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৯ জন রয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষ ১৪৯ জন ও মহিলা ৮৮ জন। যাদের মধ্যে বাসায় ১৩ জন ছাড়া বাকিরা হাসপাতালে মারা গেছেন। একই সময়ে বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৭০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬২ জন, রাজশাহী বিভাগে ২১ জন, খুলনা বিভাগে ৩৪ জন, বরিশাল বিভাগে ৯ জন, সিলেট বিভাগে ১৮ জন, রংপুর বিভাগে ১৬ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯ জন মারা গেছেন। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।