চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ২৩ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেশের বিদ্যুৎ খাত : চুরি-অপচয় রোধে উদ্যোগ নেই

বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা : ১ শতাংশ সিস্টেম লস হলেই অন্তত ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হয় : এসবের দায় চাপে গ্রাহকের ওপর
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ২৩, ২০২২ ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার সিডিউল মেনে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা বললেও ঢাকার বাইরে প্রায় প্রতিটি জেলাতেই চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা চলছে। রাত ৮টার পর দোকানপাট, শপিংমল, বিপণি বিতান বন্ধ করা না হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। অথচ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চুরি হলেও তা রোধে এখনও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশে দৈনিক এক ঘণ্টা লোডশেডিং করে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হচ্ছে, সব চোরাই বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অপচয় রোধ করা গেলে তার চেয়ে বেশি সাশ্রয় হবে। চাহিদা অনুযায়ী সাব-স্টেশন নির্মাণ, ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, অবৈধ সংযোগ ও চুরি নিয়ন্ত্রণ, অনলাইনে মিটার রিডিং গ্রহণ, প্রি-পেইড মিটার স্থাপনসহ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে সিস্টেম লস কিছুটা কমলেও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি। ফলে সিস্টেম লস কমানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। এদিকে, সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূলত চোরাই সংযোগের মাধ্যমে লুটপাট করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর ম. তামিম বলেন, ‘অবৈধ সংযোগ আছে, এখনও চুরি হচ্ছে। এসব বিষয়গুলোও দেখা উচিত। কাগজে-কলমে এখন যা সিস্টেম লস আছে, তা উন্নতির ইঙ্গিত করে। এটি আরও কমানোর সুযোগ আছে।’ তার এ অনুমান যে অমূলক নয়, তা বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা জানান, রাজধানীর ফুটপাত ও রাস্তার দোকানে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ বিদ্যুৎ বাতি জ্বলে। একটি বাতি থেকে দিনে গড়ে ২০ টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে মাসে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। যার নেপথ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সরেজমিন মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গোলাপশাহ মাজার মোড়ের চারদিকের ফুটপাত আর রাস্তায় হাজারও দোকান। সেখানের আলো পুরো এলাকা ঝলমল করছে। অথচ এর বেশির ভাগ বিদ্যুৎ সংযোগই অবৈধ। দোকানিরা জানান, প্রতিদিন এক বাতির জন্য তাদের ২৫ থেকে ৩০ টাকা দিতে হয়। দুই বাতিতে ৫০ আর তিন বাতির বিল ৭০ টাকা। যার পুরোটাই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভাগ করে নিচ্ছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীর ফুটপাত ও রাস্তার সাড়ে তিন লাখ দোকানে প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ বিদ্যুৎ বাতি জ্বলে। বাতিপ্রতি গড়ে ২০ টাকা হিসাবে দিনে আদায় হয় এক কোটি টাকা। সে হিসাবে মাসে ৩০ কোটি আর বছর শেষে পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬০ কোটিতে। বিদ্যুৎ চুরির এ বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, ‘এগুলো বন্ধে আমরা অভিযান চালিয়েছি। কিছু কিছু অসাধু লোক আছে, তারা এসব করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা সজাগ আছি।’

এদিকে ফুটপাতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি করা হচ্ছে, তার প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার চার্জ করতে গচ্চা যাচ্ছে। অথচ এ বিদ্যুৎ বাবদ খুবই সামান্য রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। ব্যাটারি চার্জের জন্য ঢাকাসহ সারা দেশে যেসব স্টেশন গড়ে উঠেছে এর অধিকাংশেই অবৈধ সংযোগ বলে সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই স্বীকার করেছেন। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বিভিন্ন জেলার যায়যায়দিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্যর সত্যতা মিলেছে। আমাদের রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, সেখানে দেড় শতাধিক ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন রয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে প্রতিদিন ৪০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। এতে শুধু ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জের জন্য খরচ হয় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অন্যদিকে খুলনায় ৮ হাজার ইজিবাইক চার্জ করতে খরচ হয় ৭৬ হাজার ৫শ’ ইউনিট বিদ্যুৎ। এর বাইরে আছে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন। বগুড়া শহরসহ ১২ উপজেলায় ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার রয়েছে অন্তত এক লাখ। এসব যানবাহন প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়। এতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ খরচ হয় ১২শ’ মেগাওয়াট। জামালপুরে ইজিবাইকের সংখ্যা ২২ হাজারের বেশি। এসব যানবাহন চার্জ করতে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ খরচ হয় সাত কোটি টাকার। একই অবস্থা বরিশাল, সিলেট, টাঙ্গাইল, রংপুর, লক্ষ্ণীপুর, পাবনা ও সাতক্ষীরাসহ সারা দেশেই। অনুমতিহীন এসব যানবাহন বন্ধ করা গেলে বিদ্যুৎ অপচয়ের একটি বড় অংশ রোধ করা সম্ভব। একইসঙ্গে বৈধ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলও কমবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিযোগ, অবৈধ ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল কৌশলে বৈধ গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ১ শতাংশ সিস্টেম লস হলেই অন্তত ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হয়। এসবের দায় চাপে গ্রাহকের ওপর।

তারা জানান, গত এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণ। সঞ্চালন লাইন বেড়েছে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিতরণ লাইন বেড়ে হয়েছে প্রায় তিন গুণ। তবে এরপরও বিদ্যুতের অপব্যবহার ও চুরি বন্ধ হয়নি। সিস্টেম লস প্রতিবছর কিছু করে কমছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত জায়গায় আসেনি। সিস্টেম লসে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে জানান তারা। বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০১০-১১ সালে বিদ্যুৎ খাতে সামগ্রিকভাবে বছরে গড় সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) এটি কমে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চালন লাইনে ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আগের বছরের চেয়ে এটি বেড়েছে। দেশের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ) বলছে, সঞ্চালন লাইন প্রতিবছর বাড়ছে। উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমারের সংখ্যা বাড়ছে। এতে বিদ্যুপ্রবাহে কারিগরি ক্ষতি বাড়াটাই স্বাভাবিক। উচ্চ ভোল্টেজে বিদ্যুৎপ্রবাহ বাড়লে ক্ষতি কমে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে এখন ছয়টি বিতরণ কোম্পানি কাজ করছে। এর মধ্যে ঢাকায় কাজ করে দু’টি কোম্পানি- ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপস্নাই কোম্পানি (ডেসকো)। উত্তরবঙ্গে কাজ করা নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি (নেসকো) আছে সিস্টেম লসের শীর্ষে। গত বছর তাদের এ খাতে অপচয় ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপরই আছে দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পলস্নী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। তাদের সিস্টেম লস ছিল ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পিডিবির সিস্টেম লস সাড়ে ৮ ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অথচ সঞ্চালন লাইনে ক্ষতি ২ দশমিক ৭৫ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেই আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে। খরচ হিসাব করার ক্ষেত্রে এটি ৩ শতাংশ পর্যন্ত বিবেচনা করে বিইআরসি। এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, ঢাকার বাইরে সিস্টেম লস পুরোপুরি কারিগরি। ঢাকার মতো ঘনবসতি না থাকায় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে লম্বা বিতরণ লাইন পার হতে হয়। বিদ্যুৎ যত বেশি দূরে প্রবাহিত হবে, তত অপচয়ের আশঙ্কা বেশি। অনেক অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই। যার ফলে দূর থেকে বিদ্যুৎ আনতে গিয়ে ভোল্টেজও কমে যায়। এতেও অপচয় বেশি হয়। এখন যতটুকু সিস্টেম লস হচ্ছে, তা কারিগরি। বর্তমান অবকাঠামোয় এর চেয়ে খুব বেশি কমানো সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তারা।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করার অনেক রেকর্ড আছে বিতরণ কোম্পানির। এসব বিল সমন্বয় করে সিস্টেম লস কমিয়ে দেখায়। বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি। অন্য দেশের মতো দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন দেশে নেই। তাই এটি অন্য দেশের চেয়ে কম হওয়ার কথা। সিস্টেম লসের অপচয় ভোক্তার ওপর চাপানো হচ্ছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় বিইআরসি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। এদিকে ১৯ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে লোডশেডিং দেওয়া হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে এর অপব্যবহার ও অপচয় রোধে সংশ্লিষ্টরা যথেষ্ট সচেতন হয়নি বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। তারা জানিয়েছে, বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ এসির ব্যবহার হচ্ছে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী এলাকা সংলগ্ন হাফিজ উদ্দিন মাস্টার রোডের বাসিন্দা শামীম আহমেদ জানান, ১৯ জুলাই রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। অথচ দুপুর ২টার দিকে হাফিজ উদ্দিন মাস্টার রোডের সব বাতিই জ্বালানো ছিল। এছাড়া মেরাদিয়া বাজার থেকে নাগদার পাড় পর্যন্ত সড়ক বাতি দুপুর পর্যন্ত জ্বলতে দেখা গেছে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।