দামুড়হুদায় গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে ধুম্রজাল

31

একাধিক বিয়ে নিয়ে পারিবারিক কলোহ, ৩য় স্ত্রীকে নির্যাতন
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দামুড়হুদায় পারুলা খাতুন (২৮) নামের এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। রাতেই তাঁর লাশ নিয়ে বাড়িতে ফেরেন পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগ উঠেছে, স্বামী আসাদের নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি হত্যা, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। খবর পেয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে দামুড়হুদা থানার পুলিশ ওই গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠায়। এদিকে, এ ঘটনায় দামুড়হুদা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
জানা যায়, দামুড়হুদা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের শুকুর আলীর মেয়ে পারুলা খাতুনের সঙ্গে পাঁচ বছর আগে দামুড়হুদা মাদ্রাসাপাড়ার হানেফের ছেলে আসাদের বিবাহ হয়। পরে তাঁদের সংসারে একটি মেয়ে (৪) ও একটি ছেলের (আড়াই বছর) জন্ম হয়। হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার রাতে পারুলা খাতুন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় তাঁর স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও প্রতিবেশীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে আসাদ তাঁর স্ত্রীকে বুকে লাথি মারেন। এতে পারুলা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর রাতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে আসাদের একাধিক বিয়ে নিয়ে পারিবারিক কলোহ চলছিল। এর জের ধরেই নির্যাতন করে পারুলা খাতুনকে হত্যা করা হতে পারে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকাবাসী জানান, আসাদ ৫-৬ বছর আগে তাঁর বড় ভাই আবু সাদেকের বড় শ্যালকের মেয়ে খাদিজার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে তাঁকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের সদস্যদের চাপে আসাদ খাদিজাকে তালাক দেন। এরপর আসাদ রেহেনা নামের অপর এক মেয়ের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁকে বিয়ে করে আনার পর যৌতুক দাবি করে তাঁকে মারধর শুরু করেন। যৌতুক না পেয়ে এক মাস পর তাঁকেও তালাক দেন। এরপর তৃতীয়বার দামুড়হুদা উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের শুকুর আলীর মেয়ে পারুলের সাথে বিবাহ করে বেশ ভালোই ছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে আবার মেহেরপুর জেলার আমঝুপি এলাকায় শ্যামলী নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন আসাদ। কিন্তু তাঁকে বাড়ি তুলতে না পারায় শ্যামলীকে চুয়াডাঙ্গা শহরে আলাদা ঘরভাড়া করে রেখেছেন। এই শ্যামলীর সাথে যোগাযোগ রাখা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে আসাদ ও পারুলের মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলে আসছিল। এ ঘটনার পর থেকে আসাদ পারুলাকে মারধর করে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতেও আসাদ পারুলাকে মারধর করেন এবং তাঁর লাথিতে পারুলা অসুস্থ হলে রাতেই তাঁকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে পারুলা মারা যান। আসাদ পারুলার লাশ নিয়ে বাড়ি গিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীকে জানান পারুলা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। কিন্তু পরে বিষয়টি জানাজানি হলে দামুড়হুদা থানার পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
তবে পারুলার বাবা শুকুর আলী জানিয়েছেন, ‘আমার মেয়ে যখন অসুস্থ হয়, তখনই আমার জামাই আমার কাছে ফোন করে। আমরা দামুড়হুদায় আসতে না আসতেই আমার জামায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে শুনছি আমার মেয়ে মারা গেছে। আমার জামাই ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’
এদিকে, গতকাল দুপুরের পরেই মেডিকেল বোর্ড গঠন করে নিহত পারুলা খাতুনের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. উৎপলা বিশ্বাসকে প্রধান করে মেডিকেল বোর্ডে আরও ছিলেন সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলেই নিহতের লাশ পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তাতর করা হয়।
এ বিষয়ে দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল খালেক জানান, গৃহবধূর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং পুলিশের সন্দেহ মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে পারুলার বাবা-মায়ের কোনো অভিযোগ না থাকায় একটি অপ্রমুত্যু মামলা হয়েছে।