চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২৩ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দানা বাঁধছে ছাত্র আন্দোলন!

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ২৩, ২০২১ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গত কয়েকদিন থেকে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা গণপরিবহণে ভাড়া নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। সড়ক অবরোধকালে ভাঙচুর করা হয় গণপরিবহণসহ ব্যক্তিগত যানবাহনও। ধীরে ধীরে এর উত্তাপ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গন্ডি পেরিয়ে পাশ্ববর্তী এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের একমাত্র দাবি বাসে হাফ ভাড়া। গতকাল সোমবারও হাফ ভাড়ার দাবিতে মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পড়ে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছে। এর আগে চার দিন ধরে দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থীরাও ইউনিফর্ম পরে হাফ পাসের দাবি ও শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত হওয়ার বিচারের দাবি নিয়ে বিক্ষোভ করে। এছাড়া এসব শিক্ষার্থীর আন্দোলনের জন্য জোর প্রচারণা চলছে একাধিক ফেসবুক গ্রুপসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাইটেও।

একদিকে বিএনপির সরকার পতন আন্দোলনের হুমকি অন্যদিকে ছাত্রদের আন্দোলন এ দু’য়ের মধ্যে কোনো যোগসাজশ আছে কী না খতিয়ে দেখছে সরকার। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দিলে শিগগিরই পতনের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। শিক্ষাঙ্গনে যে কোনো অরাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে তাই সরকার বেশ সতর্ক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে কাজ করছে গোয়েন্দা সদস্য।

এদিকে এ ধরনের পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কিছুদিন আগে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে নানা কৌশল, অপকৌশলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। সরকারবিরোধীরা চক্রান্ত করছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই তারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘বালাদেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এখনো বর্তমান। তরুণদের সতর্ক থাকতে হবে, সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

জানা গেছে, হাফ ভাড়ার ইস্যু নিয়ে এবার ছাত্ররা আরও কঠোর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সূত্র ধরে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্ররা একত্র হওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে কবে করা হবে তা স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার রেশ ধরে গণপরিবহণে নতুন ভাড়া নির্ধারণের পরে সিটিং সার্ভিস ও ওয়েবিলের নামে বাড়তি ভাড়া বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। এরপর থেকে রাজধানীর অধিকাংশ বাসেই শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। জোর করে হাফ ভাড়া দিতে চাইলে গত কয়েকদিন ধরে গণপরিবহণ স্টাফদের দ্বারা শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। আর এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামতে শুরু করে। যা ইতোমধ্যে বড় আকারের আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এর আগে ২০১৮ সালে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় সড়ক নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করেছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষের আস্থা কুড়িয়েছিল। ওই আন্দোলনের জের ধরে বছর দুই আগে সড়ক আইনও পাস হয়। এবারও এরকম কোনো আন্দোলন ঘটুক তা চাইছেন না ক্ষমতাসীনরা। সরকারের নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এজন্য সতর্ক অবস্থানে থেকে পর্যবেক্ষণ ও সব রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে ছাত্ররা একজোট হওয়ার কারণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্য যাত্রীরাও এখন সোচ্চার হচ্ছেন। দিন চারেক ধরে মিরপুর থেকে শুরু করে মালিবাগ, উত্তরা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, সাভারসহ সব রুটেই ছাত্রদের পাশাপাশি অন্য যাত্রীরাও ওয়েবিলের নামে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে চাইছে না। তারা বাসে প্রদর্শিত চার্টের হিসাব কষে কিলোমিটার হিসেবে সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিতে পরিবহণ শ্রমিকদের চাপ দিচ্ছে। এই অবস্থায় পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা প্রায়ই বাস বন্ধ রেখে ভোগান্তিতে ফেলতে চাইছে যাত্রীদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, আন্দোলনকারীদের ব্যাপারে সব খবরই রাখছে সরকার। হাফ পাসের দাবিতে যে আন্দোলন বৃহৎ রূপ নিচ্ছে তাতে সরকারবিরোধীদের হাত থাকতে পারে। ভবিষ্যতে যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অন্যকিছুর ছক কষছেন তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বাসভাড়া আদায়ের বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেছিলেন গণপরিবহণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করছে বিআরটিএসহ বিভিন্ন টাস্কফোর্স। বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। বিআরটিএ’র মোবাইল টিম প্রতিদিন বিভিন্ন বাসে নানা অভিযোগে জরিমানা করছে।

শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার দাবি সংশ্লিষ্ট বিষয় পরিবহণ মালিকরা বিবেচনা করতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডক্টর হাছান মাহমুদ। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। বাসে হাফ ভাড়ার জন্য গত কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে- এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমি নিজে হাফ ভাড়া দিয়েছি। তখন অনেক ক্ষেত্রেই হাফ ভাড়া ছিল। শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার দাবি পরিবহণ কোম্পানিগুলো বিবেচনা করতে পারে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরিবহণ মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ছাত্রদের হাফ পাস নিশ্চিত করতে হবে। সোমবারও কোনো সুরাহা না হওয়ায় যেকোনো সময় কঠোর আন্দোলনে নামবে বলে জানান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, একমাত্র সরকারি সড়ক পরিবহণ সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বাসেও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের সরকারি বাসে হাফ ভাড়া নেওয়া হয় না। এ নিয়ে সরকারি কোনো নির্দেশও আমাদের কাছে আসেনি। সরকার নির্দেশ দিলে বিআরটিসি’র বাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেওয়া হবে। সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উলস্ন্যাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বাসে হাফ ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা নেই। আইনগত ভিত্তির ওপর এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি।

লালবাগ, শাহবাগ ও ধানমন্ডি থানার ঊর্ধ্বতন কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গণপরিবহণে বিশেষ করে বাসে হাফ ভাড়ার দাবিতে কয়েকদিন ধরেই ধানমন্ডি- সায়েন্সল্যাব এলাকার শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে রাস্তা অবরোধ করছেন। রোববারও বদরুন্নেসা কলেজ, সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজসহ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে রাখেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বাসের গস্নাস ভাঙচুর করে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।