চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৮ অক্টোবর ২০১৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তীরে এসে ডুবল তরি

সমীকরণ প্রতিবেদন
অক্টোবর ৮, ২০১৬ ১২:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

1475858800

সমীকরণ ডেস্ক: জোড়া ক্যাচ ফেলে দেয়ার দায়টা চুকানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু মোশাররফ হোসেন রুবেল তা পারলেন না। ব্যাট হাতে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়ার যে সামান্য দায়িত্বটুকু বর্তেছিল বর্ষীয়ান এই অলরাউন্ডারের কাঁধে, সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ তিনি। ইমরুল কায়েস আর সাকিব আল হাসানের গড়ে দেয়া শক্ত ভিতে দাঁড়িয়েও তাই ব্যর্থ বাংলাদেশ। তালগোল পাকিয়ে মিরপুর শেরেবাংলায় শুক্রবার তীরে এসে তরি ডুবিয়েছে টাইগাররা, আরও একবার ইংল্যান্ডকে হারানোর অপার সম্ভাবনাকে দলেছে পায়ে।
মোশাররফ বলতে পারেন, ‘আমি তো অপরাজিতই ছিলাম। লড়াই করার সঙ্গীই তো পেলাম না।’ অভিযোগও করতে পারেন, এমন ম্যাচে আমাকে ব্যাট হাতেই বা নামতে হবে কেন? এমন সহজ ম্যাচ অগ্রজরাই তো শেষ করে আসতে পারতেন। সেঞ্চুরি করেও ম্যাচের ইতি টেনে আসতে পারলেন না ইমরুল, দারুণ ব্যাটিং প্রদর্শনীর পর একই ভুল করেছেন সাকিব। উইকেট উপহার দিয়ে ফিরলেন দুজনেই, মোসাদ্দেক-মাশরাফিও তাই। তাদের অমার্জনীয় ভুলে দলের অভাবনীয় হারের পর মোশারফের মনে (!) ঘোরপাক করা ওই প্রশ্ন এখন তুলতে পারেন অনেকেই। ৫২ বলে ৩৯ রান, হাতে ছয়টি উইকেট। জয়টা তখন রীতিমতো টাইগারদের পকেটে। এমন অবস্থা থেকে বাংলাদেশের হার ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু কল্পনাকে হার মানানো সেই ঘটনাই শুক্রবার ঘটল মিরপুরে। ইমরুল আর সাকিবের ব্যাট একপর্যায়ে ইংল্যান্ডের ৩০৯ রানের পাহাড়টাকেও বানিয়ে ফেলেছিল মামুলি, কিন্তু শেষের ব্যর্থতায় সেটা অনতিক্রম্য হয়েই রইল। অবিশ্বাস্যভাবে জয় থেকে ২২ রান দূরে থামল বাংলাদেশ। ১৩ বল হাতে রেখে ২৮৮ রানে অলআউট হয়ে টাইগাররা মেনে নিল ২১ রানের পরাজয়। ওই পরাজয় তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়েও দিল স্বাগতিকদের। নিকট অতীত বলে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রিয় প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। এই দলটার বিপক্ষে সর্বশেষ ৪ ম্যাচের তিনটিতেই জয় দেখেছিল টাইগাররা, যার দুটো আবার সর্বশেষ দুই ম্যাচে। এদিন সংখ্যাটা বাড়ানোর দারুণ এক সুযোগ নষ্ট হলো। সেটা কেবলই শেষের ব্যর্থতায়। এ পর্যায়ে ৪ উইকেটে বাংলাদেশের রান ছিল ২৭১। সেখান থেকে মাত্র ১৭ রান যোগ হতেই শেষ ৬ উইকেট পড়ল। ইমরুল-সাকিবের ১১৮ রানের পঞ্চম উইকেট জুটিটা ভাঙার পরই ধাক্কাটা লেগেছিল জ্যাক বলের জোড়া আঘাতে। ৫৫ বলে ১০টি চার আর একটি ছক্কায় ৭৯ রান করা সাকিব ফিরে যাওয়ার ঠিক পরের বলেই বোল্ড মোসাদ্দেক হোসেন। এরপর মাশরাফিও ফিরলেন একটি মাত্র রান করে। ৩ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেটের পতন। ধাক্কাটা আর সামলে উঠতেই পারল না বাংলাদেশ। ক্যারিয়ারসেরা ১১২ রানের ইনিংস খেলা ইমরুল ছিলেন বলে শেষ আশা ছিল। কিন্তু আদিল রশিদের করা অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে পা দিলেন এই বাঁহাতি, ১১৯ বলে ১১টি চার আর দুটি ছক্কায় সাজানো তার ইনিংসটি শেষ হতেই নিভে যায় আশার প্রদীপ। এই বাঁহাতির বিদায়ের পরপরই শফিউলের রানআউট; একপ্রকার হেরে বসা ম্যাচটা নাগালে পেয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরপর তাসকিনকে আউট করে ম্যাচের ইতি টেনে দিয়েছেন ৫০ রানে ৪ উইকেট নেয়া অভিষিক্ত জ্যাক বল। দলকে অভাবনীয় জয় এনে দেয়ার পুরস্কার হিসেবে ম্যাচসেরা হয়েছেন তিনিই। মাথায় ওপর বড় রানের বোঝা, শুরু থেকেই মেরে খেলার দায়িত্বটা নিয়েছিলেন ইমরুল। ফতুল্লায় প্রস্তুতি ম্যাচে শেষটা যেখানে করেছিলেন, এই বাঁহাতি এদিন যেন শুরু করলেন সেখান থেকেই। ইনিংসের তৃতীয় বলেই ক্রিস ওকসকে ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে আঁছড়ে ফেললেন সীমানার ওপারে। ওভারের শেষ বলে আরও একটি বাউন্ডারি। পুরো ইনিংসজুড়েই এমন বাহারি শট খেলেছেন বাঁহাতি ওপেনার। যতক্ষণ তিনি ক্রিজে ছিলেন ম্যাচে বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছিল বুক চিতিয়ে। আফগানিস্তান সিরিজের ছন্দটা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অনূদিত করতে পারল না তামিমের ব্যাট। সৌম্য সরকারের জায়গায় দলে ফেরা ইমরুল চালিয়ে খেললেও উদ্বোধনী জুটিটা তাই জমল না। অভিষিক্ত পেসার জ্যাক বলের আঘাতে ১৭ রানেই সাজঘরে তামিম, ৪৬ রানের জুটিটারও অকাল মৃত্যু। ইংলিশ বোলারদের ঠিকভাবে খেলতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তামিম। ভালো লেন্থের বল লাইনের বিপরীতে খেলতে গিয়ে এই বাঁহাতি ক্যাচ তুলে দিয়েছেন জেমস ভিন্সের হাতে। ভালো কিছুর আশা জাগিয়ে সাব্বির রহমানও (১৮) ফিরলেন দ্রুত, সেট হয়ে ফিরলেন মাহমুদউল্লাহও (২৫)। মুশফিকুর রহিম (১২) আরও একবার বন্দি রইলেন ব্যর্থতার বৃত্তে। ইমরুল একপ্রান্তে খেলে গেলেও তাই বড় জুটি হয়নি। এরপরও অবশ্য লক্ষ্যপথ থেকে ছিটকে যায়নি বাংলাদেশ, আস্কিং রানরেটটাকেও যেতে দেয়নি নাগালের বাইরে। ৬ উইকেট হাতে থাকার পর ২০ ওভারে ১৩৬, ১৫ ওভারে ১০৩, ১০ ওভারে ৫৪ রানের সমীকরণটা বলে যাচ্ছিল, এই ম্যাচে বাংলাদেশের জয়টাই সম্ভাব্য ফল। কিন্তু শেষের ব্যাটিং ব্যর্থতা শেষ করে দিল সব। এর আগে ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার ৪১ রানের শক্ত ভিত গড়লেও বোলিংয়ে বাংলাদেশের শুরুটা বেশ ভালোই ছিল। জেমস ভিন্সকে (১৬) মাশরাফির ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে ফিরিয়ে টাইগারদের লড়াইয়ে এনেছিলেন শফিউল ইসলাম। এরপর সাকিবের শিকার ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা জেসন রয় (৪১)। লংঅনে সীমানার কাছে উড়ে আসা বলটি দারুণভাবে তালুবন্দি করেছেন সাব্বির। খানিক পর জনি বেইরস্টোকে দুর্দান্ত এক থ্রুতে রানআউট করেছেন তিনি। তাতে ৬৩ রান তুলতেই ৩ উইকেট খুইয়ে পথহারা ইংল্যান্ড, ম্যাচের লাগাম পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে।
শেষতক অবশ্য লাগামটা মুঠোয় রাখা যায়নি, অভিষিক্ত বেন ডাকেট আর বেন স্টোকস মিলে চতুর্থ উইকেটে ১৫৩ রানের জুটি গড়ে উল্টো চাপে ফেলে দিয়েছিলেন স্বাগতিকদের। এই যুগল যেভাবে ব্যাট চালিয়েছে; তাদের সামনে টাইগার বোলাররা ছিলেন অসহায়। রীতিমতো স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন স্টোকস। শুরু থেকেই এই বাঁহাতি ছিলেন খুনে মেজাজে। চার-ছক্কার ফোয়ারা ছুটিয়ে দল আর নিজের রান বাড়িয়েছেন তিনি। অভিষেকেই হাফসেঞ্চুরি তুলে নেয়া ডাকেট ছিলেন তুলনামূলক শান্ত, তবে তার হিসেবে ব্যাটিংও চরম অস্বস্তিতে রেখেছে মাশরাফি ব্রিগেডকে।
এদিন মাঠে বাংলাদেশের বড় স্বস্তিটা ছিল নিজেদের ফিল্ডিং নিয়ে, অন্তত তিনটি সহজ ক্যাচ ফেলেছেন ফিল্ডাররা। হাতগলে বেরিয়ে গেছে বল, মাহমুদউল্লাহ-মোশাররফরা ফিল্ডিংয়ে একটু দায়িত্বশীল হলে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির অপেক্ষাটা নিশ্চিত করেই বাড়ত স্টোকসের। পরপর দুই ওভারে দুইবার জীবন ফিরে পেয়েছেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান, ৬৯ রানে থাকা অবস্থায় তাসকিনের বলে তার ক্যাচ ফেলেছেন মাহমুদউল্লাহ। পরের ওভারে মাশরাফিকে উইকেটবঞ্চিত করেছেন মোশাররফ। স্টোকস তখন ৭১ রানে। সাব্বিরের আরেকটি অসাধারণ ক্যাচে শেষতক মাশরাফিই ফিরিয়েছেন স্টোকসকে, ততক্ষণে সেঞ্চুরির উদযাপনটা সেরে ফেলেছেন তিনি (১০০ বলে ছয়টি চার আর চারটি ছক্কায় ১০১ রান)। এর আগেই ৭৮ বলে ছয়টি চারে ৬০ রান করা ডাকেটকে সরাসরি বোল্ড করে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা জুটিটি ভেঙেছেন শফিউল (২/৫৯)। তবে এই বাঁহাতিকেও ফেরানো যেত আরও খানিকটা আগে। কিন্তু মোসাদ্দেকের বলে মোশাররফ ক্যাচ ফেলে দেয়ায় সেটা আর হয়নি। ভাগ্যিস ৫৯ রানে জীবন পাওয়া ডাকেট সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারেননি। ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় বড় ইনিংস খেলে অভ্যস্ত এই তরুণকে নাকি সহজে আউটই করা যায় না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বরাবরই উজ্জ্বল শফিউলের দৌলতে পেরেছে বাংলাদেশ। এরপরও অবশ্য স্বস্তিতে থাকা হয়নি, থাকতে দেননি ইংলিশ দলপতি জস বাটলার। মঈন আলীকে (৬) তামিমের ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচের লাগাম হাতে নিতে চেয়েছিলেন মাশরাফি (২/৫২)। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বাটলার সেটা হতে দেননি। ইনিংসের শেষের দিকে টাইগার বোলারদের ওপর রীতিমতো স্টিম রোলার চালিয়েছেন বাটলার। ইংল্যান্ডের ইনিংসটাকে ৩০০ রানের নিচে বেঁধে রাখার যে ক্ষীণ আশাটা ছিল, ৩৮ বলে ৬৩ রানের ইনিংসে ইংলিশ দলপতি মুহূর্তেই নিরাশায় বদলে দিয়েছেন তা। তিনটি চার আর চারটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি রীতিমতো কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছিল স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের। সেই চ্যালেঞ্জ আর টপকাতে পারেনি টাইগাররা। আগামীকাল (রোববার) তাই দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাদের নামতে হচ্ছে সিরিজ বাঁচানোর যুদ্ধে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।