তিন ফসলের আবাদে বদলে গেছে দোয়াল্লিন মোল্লার ভাগ্য

49

আফজালুল হক:
২০০৩ তিন সাল থেকে পরিবারের ওপর অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন কৃষক দোয়াল্লিন মোল্লা। এরপর থেকে নিজের দেড় বিঘা জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগিয়ে একই জমিতে তিন ফসলের আবাদ করে বদলে যায় কৃষক দোয়াল্লিন মোল্লার ভাগ্য। তাঁর জমিতে আগাছা দমন ও আদ্রতা ধরে রাখতে ব্যবহার করেন মালচিং পেপার, কলার মোচাতে ব্যবহার করেন ব্যাগিং প্রযুক্তি, রয়েছে পোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ। প্রশিক্ষিত আধুনিক কৃষক হিসেবে ইতোমধ্যেই তিনি এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন।
জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ হাটখোলা বাজারের আনোয়ার হোসেন মোল্লার ছেলে দোয়াল্লিন মোল্লা। কৃষি পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে পরিবারের থেকে পৃথক হয়। বাবার পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড়বিঘা জমি নিজের ভাগে পড়ে। সেই জমিতে চাষ করা দিয়েই পথচলা শুরু তাঁর। পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আর। পরিশ্রম আর লক্ষ্য থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সত্যিই যে সফল হয় তারই প্রমাণ দিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি ৮ বিঘা জমির মালিক এবং সব জমিতে তিনি বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ করেন। চলতি মৌসুমে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, আলু, রসুন, একাঙ্গী, ঝাল, কড়োলা, মাস কলাই, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ফিলিপাইনের গেন্ডারীর আবাদ করেছেন দোয়াল্লিন মোল্লা। শুধু সবজির আবাদ করেই থেমে থাকেননি তিনি। তাঁর জমিতে আছে আম, কাঁঠাল, লিচু ও মেহগনির গাছ।
এ বিষয়ে দোয়াল্লিন মোল্লা বলেন, ‘জমিতে একই ফসল আবাদ না করে বিভিন্ন রকমের ফসল আবাদ করছি। একটা জমিতে যেমন আছে লাউ, আবার অন্য জমিতে মাশকলাই, আলু ও বেগুন। আর ২৫ শতক জমিতে আবাদ করেছি একসাথে তিন ফসল। মোবাইল ফোনে ইউটিউবে কৃষি বায়োস্কোপের ভিডিও দেখেই এই আমি এক জমিতে বিভিন্ন আবাদের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হই। ভিডিওতে দুই বছর আগে পেয়ারা বাগানে দুই সারির মাঝখানে একাঙ্গীর আবাদ করা দেখেছিলাম। এই বছর চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে নিজে ঝুঁকি নিয়ে কলা, মরিচ ও একাঙ্গী আবাদ শুরু করি। প্রথমে মনে হচ্ছিল তিনটি ফসল একসাথে হবে না, এখন দেখছি সবগুলোই ভালো হয়েছে। এরমধ্যে ৯০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করা হয়ে গেছে, আরও বিক্রি হবে। ৫০-৬০ মণ একাঙ্গী পাওয়া গেলে ২ হাজার টাকা মণ হিসেবে সেখান থেকে ১ লাখ টাকার বেশি বিক্রি হবে। কলা বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ টাকার বেশি পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। কলা গাছের চারা বিক্রি করেও পাওয়া যাবে ১৫-২০ হাজার টাকা।’
দোয়াল্লিন মোল্লা আরও বলেন, ‘আমি ফসলে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করি না। চলতি মৌসুমে একই জমিতে ৩ ফসল আবাদ করে প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভ করেছি। আলুর আবাদ শেষ হলে পটলের চারা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
এলাকাবাসী বলেন, দোয়াল্লিন মোল্লা একই জমিতে তিনটি ফসল আবাদ করে লাভবান হয়েছেন। তিনি কোনো কীটনাশক ব্যবহার করেন না। তাঁকে দেখে এলাকার বিভিন্ন কৃষকও ঝুঁকছেন তিন ফসলের আবাদে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ‘একই জমিতে একসাথে তিনটি ফসল করেছেন দোয়াল্লিন মোল্লা নামের একজন কৃষক। তাঁর বিষমুক্ত এই চাষাবাদ ইতোমধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। আমি তাঁর ফসলি জমি পরিদর্শন করেছি। দোয়াল্লিন মোল্লার সবজি খেত থেকে প্রধান সড়কে আসার জন্য একটি পাকা রাস্তার প্রয়োজন সেটিও তিনি জানিয়েছেন। আমি তালিকায় তাঁর নাম দিয়েছি। বরাদ্দ আসলে পাকা রাস্তা করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে তাঁকে সরকারিভাবে সহযোগিতাও করা হয়েছে।’
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলী হাসান বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলায় বছরে প্রায় ১৬৬৩ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়ে থাকে। আমাদের এখানে যাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান আছে, তারা কলা আবাদের জমিতেই কয়েকটি আবাদ করছেন। তবে একটি প্যাটাম (এক ধরনের মাল্টি লেয়ার মিক্সড ক্রপিং টেকনিক, যেখানে একাধিক ফসল একই জমিতে, একই সময়ে চাষ করা হয়) খুব জনপ্রিয় হচ্ছে। কলা বাগানের মধ্যে মরিচ ও একাঙ্গী চাষ করে লাভবান হচ্ছে। এটি খুবই লাভজনক। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকরা যেন এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে একদিকে যেমন কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তেমনি বর্ষাকালে মরিচের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’