চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ৩১ মে ২০১৭
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তামাক- উন্নয়নের অন্তরায় : আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

সমীকরণ প্রতিবেদন
মে ৩১, ২০১৭ ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

-রিফাত রহমান
পটভূমি :
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)- বৈশ্বিক উন্নয়নের নতুন পথনির্দেশিকা। পৃথিবীব্যাপী কার্যকর উন্নয়ন সুরক্ষা প্রদানের এক সমন্বিত প্রয়াস। জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ১৬৯টি প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল- এফসিটিসি বাস্তবায়ন (টার্গেট ৩এ) ও অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস (টার্গেট ৩.৪) অন্যতম। বাংলাদেশও এই সম্মিলিত উন্নয়ন পথযাত্রার বলিষ্ঠ সৈনিক। তবে প্রতিবছর ১ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু (ওঐগঊ, ২০১৩), প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের পঙ্গুত্ব (ডব্লিউএইচও, ২০০৪) এবং তামাকের অন্যান্য বহুমাত্রিক ক্ষয়ক্ষতি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে, এসডিজি’র তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রাসহ অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা কাঙ্খিত সময়ে অর্জন করা সম্ভব হবেনা।
তামাক উন্নয়নের অন্তরায়:
তামাক ব্যবহারজনিত ব্যাপক মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি এসডিজি’র তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা- সুস্বাস্থ্য অর্জনের অন্যতম অন্তরায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর মাসিক খরচের ৫ শতাংশ তামাক ব্যবহারে এবং  ১০ শতাংশ তামাক ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। তামাকজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ফলে বছরে আরো ৬৫২.৮৬ মিলিয়ন ডলার আয়-ক্ষতি হয়। কাজেই তামাক ব্যবহারে দরিদ্র মানুষ, আরও দরিদ্র হয় (লক্ষ্যমাত্রা-১)। হিসেব অনুযায়ী, ২০১১ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে তামাকচাষের জমি ৩গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৮ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে । ক্রমবর্ধমান তামাকচাষের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি (লক্ষ্যমাত্রা-২) ক্রমশঃ হুমকির মুখে পড়ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষা (লক্ষ্যমাত্রা-৪) এবং লিঙ্গ সমতা (লক্ষ্যমাত্রা-৫) টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও বাংলাদেশের বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন চলছে মূলত শিশু ও নারী শ্রম ব্যবহার করে। কারখানার শিশুশ্রমিকরা পাচ্ছেনা শিক্ষা লাভের সুযোগ। বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার না করেও, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে প্রায় ১ কোটি নারী। এই বিপুল বৈষম্য টিকিয়ে রেখে, টেকসই উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। এছাড়াও তামাক ব্যবহারের কারণে কর্মক্ষম মানুষের বিরাট অংশ অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের শিকার হন যা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (লক্ষ্যমাত্রা-৮) বাধাগ্রস্ত করে। বৈশ্বিক এবং আভ্যন্তরীণ বৈষম্য হ্রাস (লক্ষ্যমাত্রা-১০) ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভবপর নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ তামাক ব্যবহারজনিত মৃত্যুর পরিমাণ বছরে ৮০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং এই মৃত্যুভার (ফবধঃয ঃড়ষষ)-এর ৮০ ভাগই বহন করতে হবে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। তাছাড়া বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা শহরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি হলেও পাবলিক প্লেস -এ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়ার চিত্র ঠিক উল্টো। শহরের আবদ্ধ স্থানে বায়ু দুষণের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। যা টেকসই নগর ও তার অধিবাসীদের (লক্ষ্যমাত্রা-১১) নিরাপদ রাখার বড় অন্তরায়। তামাক চাষ সারা পৃথিবীর ২-৪ শতাংশ বনউজাড়ের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে তামাকচুল্লিতে পাতা পোড়াতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে দেশের ৩০ শতাংশ বন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের (লক্ষ্যমাত্রা ১৩) ঝুঁকি ক্রমশ: বেড়ে চলেছে। সুতরাং তামাকপণ্য উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতি সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তামাক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্তরায়।
কৌশল:
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তামাক নিয়ন্ত্রণ তথা এফসিটিসি (ঋৎধসবড়িৎশ ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঞড়নধপপড় ঈড়হঃৎড়ষ) এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পূর্বশর্ত বললে অত্যুক্তি হবেনা। বাংলাদেশে এফসিটিসির কার্যকর বাস্তবায়ন মোটাদাগে দুটো কারণে অত্যন্ত জরুরি। এক: এফসিটিসি বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে এসডিজি’র তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবনমান নিশ্চিতকরণ এবং সব বয়সের সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা’ অর্জন সম্ভব নয়। দুই: এসডিজি’র অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও তামাক একটা বড় ধরনের বাধা, যা এফসিটিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অপসারণ করতে হবে। উপরন্তু, এফসিটিসি’র আর্টিকেল ৬ অনুযায়ী তামাকপণ্যের উপর কার্যকরভাবে কর আরোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করা গেলে একদিকে এর ব্যবহার কমবে অন্যদিকে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। অর্জিত এই অর্থ দিয়ে এফসিটিসি বাস্তবায়ন ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গৃহীত কর্মকা-ের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভবপর হবে।
পরিশেষ:
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে বড় হুমকি তামাক। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসি, কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে, তামাকজনিত বাধা অপসারণের মাধ্যমে, কাক্সিক্ষত সময়ের মধ্যেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর এ লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকারকে উৎসাহিত করাই হবে বাংলাদেশে এবারের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের মূল তাৎপর্য। মনে রাখতে হবে তামাক কোম্পানি সর্বদা তৎপর থাকবে এফসিটিসি বাস্তবায়ন যেন কখনই সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় না আসে। তামাকবিরোধীদের দায়িত্ব এফসিটিসি’র বাস্তবায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা এবং সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হবে ২০৩০ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন ও আইনি ঘাটতি পূরণে (এফসিটিসির আলোকে) বছরভিত্তিক প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ ও পর্যায়ক্রমে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।