তাণ্ডবের মামলায় হেফাজত নেতা মামুনুল হক গ্রেপ্তার

37

রাখা হয়েছে ডিবি কার্যালয়ে, চলছে জিজ্ঞাসাবাদ, ১৭ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি, আজ আদালতে পাঠানো হতে পারে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল বেলা ১টার দিকে তাকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে গ্রেফতারের পর তেজগাঁও উপ-কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে নেয় পুলিশ। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে মোহাম্মদপুর থানার বদলে তেজগাঁও থানায় রাখা হয়। যদিও রাতে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। হেফাজতি তান্ডবের মামলায় মামুনুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্ট-কান্ডের পর থেকে তিনি এত দিন টানা জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসাতেই অবস্থান করছিলেন। তিনি এ মাদরাসার শিক্ষক। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে তদন্তাধীন হেফাজত-সংক্রান্ত ৪৯টি মামলার মধ্যে ১৭টির এজাহারভুক্ত আসামি মামুনুল হক। এর মধ্যে চলতি বছর ২৬ মার্চের পর দায়ের করা তিনটি মামলাতেই এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। মামুনুলকে গ্রেফতারের আগে হেফাজতে ইসলামের সাত শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-পুলিশ। মামুনুলকে গ্রেফতারের পর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি নাশকতা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে আমরা তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। হেফাজতের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা, থানায় হামলা, রেজিস্ট্রার অফিসে হামলা, ভাঙচুরসহ অনেকগুলো মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে।’ ডিসি হারুন বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে নজরদারিতে রেখেছিলাম। পাশাপাশি ২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি ভাঙচুর-নাশকতার মামলা তদন্ত করছিলাম। তদন্তে ওই ঘটনায় মামুনুলের সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
এক প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাকে আগামীকাল (আজ) আদালতে সোপর্দ করা হবে। তার রিমান্ড চাওয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মোহাম্মদপুর থানার মামলা ছাড়াও গাজীপুরের মো. শাহজাহান নামের এক ব্যক্তি তার বোনকে মামুনুল বিয়ে করার পর থেকে তাকে না পাওয়ার ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানায় যে জিডি করেছেন, সে বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গত বছর নভেম্বরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। এরপর ভাস্কর্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতার একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্যে ভাঙচুর চালানো হয়। ভাস্কর্য-বিরোধিতা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। এ বছর মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তান্ডব চালায় হেফাজত। এর মধ্যে সুবর্ণজয়ন্তীর দিন ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় সংঘাত-নাশকতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এরপর ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে জান্নাত আরা ঝর্ণা নামের এক নারীসহ আটক হয়ে আবারও আলোচনায় আসেন হেফাজতের এই নেতা। ওই সময় ঝর্ণাকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করলেও তার নাম বলেন আমেনা তৈয়বা। এর কয়েক দিন পরই বাংলাদেশ প্রতিদিন ‘মামুনুলের দ্বিতীয় জান্নাতের সন্ধান’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে। এর এক দিন পর দ্বিতীয় জান্নাত অর্থাৎ জান্নাতুল ফেরদৌস নামের ওই নারীর ভাই মো. শাহজাহান মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, মামুনুল তাকে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসায় ডেকে নিয়ে তার বোনকে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করেন। তবে কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেননি।
যেভাবে গ্রেপ্তার :
নারায়ণগঞ্জের রিসোর্ট-কান্ডের পর থেকে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে থাকতেন মামুনুল। প্রথম দিকে দু-একবার বের হয়ে দলীয় মিটিংয়ে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কৌশল আঁচ করতে পেরে তিনি মাদরাসা থেকে বের হননি। মাদরাসায় অবস্থান করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন তিনি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যেই রাখা হয়েছিল মামুনুলকে। এর মধ্যে হেফাজতের মধ্যম সারির একাধিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়, যাতে মামুনুল হক গ্রেফতার হলে কেউ মাঠে নেমে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারেন। মাদরাসায় ছাত্রসহ কতজন অবস্থান করছেন, কে কোন সময় বের হচ্ছেন, কোথায় কোথায় যাতায়াত করছেন সবকিছুই নজরদারির আওতায় রাখা হয়। সব শেষ গতকাল সকালে মামুনুলকে গ্রেফতারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ। প্রস্তুত হন ডিবি ও ক্রাইম ডিভিশনের সদস্যরা। বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করা হয় মাদরাসা ও আশপাশ এলাকায়। সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয় মোহাম্মদপুর, তেজগাঁওসহ রাজধানীর সব কটি থানাকে। মাঠে দায়িত্বরত পুলিশকেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে তার বার্তা দেওয়া হয়। তবে ডিবির টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই মাদরাসায় অভিযান শুরু করে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ। অভিযানে অংশ নেওয়া গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, মাদরাসার গেটে সার্বক্ষণিক পাহারা বসিয়েছিলেন মামুনুল হক। পুলিশের শতাধিক ফোর্স নিয়ে তারা মাদরাসায় গেলে প্রথম দিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিযানের মুখে পিছু হটেন তারা। পরে মাদরাসার দ্বিতীয় তলায় মামুনুল হকের কক্ষে গিয়ে তারা তাকে পুলিশের সঙ্গে যেতে বলেন। তিনি নিজেও বুঝতে পারেন বাধা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। তাই স্বেচ্ছায় হেঁটে গাড়িতে ওঠেন মামুনুল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম জানান, মামুনুল হক ২০১৩ সালের সহিংসতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় নিজে সম্পৃক্ত থেকে উসকানি দিয়েছেন। তাকে প্রথমে পুরনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আজ আদালতে পাঠানো হবে।
রিমান্ডে ইসলামাবাদী, জুনায়েদ ও জালাল :
হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে রাজধানীর পল্টনের দুটি ও মতিঝিল থানার একটি নাশকতার মামলায় সাত দিন করে মোট ২১ দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। এ ছাড়া পল্টন থানার নাশকতার এক মামলায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীব এবং সহকারী মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদকে সাত দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনূর রহমান রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
মামুনুলকে গ্রেপ্তারে নিন্দা :
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস :
সংগঠনের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা ইসমাঈল নূরপুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, এভাবে রমজান মাসে আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি-গ্রেফতার করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। নেতারা হয়রানি ও গ্রেফতার বন্ধ এবং আটকদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় আলেম-ওলামারা ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা। তারা বলেন, হয়রানি ও গ্রেফতার করে আলেম-ওলামাদের আন্দোলনকে ঠেকানো যাবে না। জনগণ ইসলাম ও দেশের প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত।
খেলাফত মজলিস :
সংগঠনের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, মাওলানা মামুনুল হকসহ আলেম-ওলামাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। তারা বলেন, মাদরাসা-মক্তব, ইসলামী সংগঠনের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করেছে সরকার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আলেম-ওলামাদের গ্রেফতার করে সাজানো ও মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। রমজান মাসে করোনার নামে লকডাউন দিয়ে আলেম-ওলামাদের ওপর সরকারের এ দমন অভিযান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।