ডিএনসিসি কাঁচাবাজার এবার পুড়ে ছাই

330

সমীকরণ প্রতিবেদন:
সময়ের ব্যবধান মাত্র দুই বছর তিন মাস। ঘটনাস্থল সেই গুলশান ১ নম্বরের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কাঁচাবাজার ও সুপারমার্কেট। আবারও দাউ দাউ আগুন। চোখের সামনে পুড়ল সারি সারি দোকান। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যেই ফের ভয়াবহ আগুনে নিঃস্ব হলেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার ভোরে লাগা ওই আগুনে কাঁচাবাজারের ২১১টি দোকানের প্রায় সবই পুড়েছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, আগুনে তাদের শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কেউ হতাহত হননি। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ও ডিএনসিসি পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে।
গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মার্কেটে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তা নেভাতে সক্ষম হয়। আগুন নেভাতে ছুটে আসেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত, তা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ধারণা করছেন, মার্কেটের কোনো সুগন্ধির দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে রহস্য উদ্ঘাটন ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে সংস্থাটির পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) একটি কমিটি করেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনে ২৬ জন প্রাণ হারান। সেই ক্ষত না শুকাতেই আগুনে পুড়ল পাশের এলাকা গুলশান ১ নম্বরের ডিএনসিসি কাঁচাবাজার।
২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি একই মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে। এতে কাঁচাবাজার লাগোয়া ডিএনসিসি দোতলা সুপারমার্কেটও পুড়ে যায়। তবে এবার ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় মূল সুপারমার্কেটটি রক্ষা পেলেও কাঁচাবাজার ভস্মীভূত হয়েছে। দু’বছর আগে আগুন লাগার সময় কাঁচাবাজারটি দোতলা পাকা ভবন ছিল। আগুনে সেটি ধসে পড়লে ব্যবসায়ীরা নিজেদের অর্থে সেটি লোহা আর স্টিলের কাঠামোয় একতলা মার্কেট তৈরি করেন। এবারের আগুনের তাপে লোহা ও টিনের কাঠামোর মার্কেটটিও ধসে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে এটিকে কাঁচাবাজার বলা হলেও এই মার্কেটে মাছ, মাংস, সবজি ও মুদি দোকানের পাশাপাশি আমদানি করা খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য, কসমেটিকস ও গৃহস্থালি পণ্যের দোকান রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, দুই বছর আগে মার্কেটটিকে অতি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে এটি ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছিল। তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখানে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলে আগুন নিভে যেত। প্রায় একই তথ্য জানিয়েছেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, মার্কেটটিতে দু’বছর আগে যখন আগুন লাগে, তখন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এখনও কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে ডিএনসিসি স্থায়ী মার্কেট করতে চেয়েছিল। তবে মামলা জটিলতা আছে। এ মামলার নিষ্পত্তি করে যত শিগগির সম্ভব স্থায়ী মার্কেট করা হবে।
পুড়ে যাওয়া মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, পুরো মার্কেটে কলাপসিবল গেট লাগানো ছিল। নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করলেও তারা বাইরে ছিলেন। সকাল ৬টার দিকে খবর পেয়ে ব্যবসায়ীরা মার্কেটের সামনে এসে দেখেন, সব জ্বলছে। মো. আলমসহ তার পাঁচ ভাই মার্কেটটিতে ব্যবসা করেন। ক্রোকারিজ, গৃহস্থালি পণ্য ও কাপড়ের পৃথক পাঁচটি দোকান রয়েছে তাদের। কাঁদতে কাঁদতে আলম বলছিলেন, দু’বছর আগের আগুনেই তারা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর বাপদাদার ভিটে বিক্রি করে, ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে এবারের আগুন তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে।
আবদুর রহিম নামের একজন ব্যবসায়ী বলছিলেন, চোখের সামনেই সবকিছু ছাই হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সময়মতো ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে এলে কিছুটা হয়তো রক্ষা হতো। অবশ্য ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বলছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ভোরের ঘটনা হওয়ায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে মার্কেটে পানির ব্যবস্থা ছিল না। লোহার কাঠামোয় তৈরি মার্কেটটি সুগন্ধি, প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন দাহ্য বস্তুতে ঠাসা ছিল। এ জন্য আগুনের তীব্রতাও বেশি ছিল এবং দ্রুত তা পুরো মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত গুলশান লেক থেকে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়। গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের বিভিন্ন অংশ থেকে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা পুড়ে যাওয়া দোকানের মালপত্র ঘেঁটে অবশিষ্ট কিছু আছে কি-না খুঁজছিলেন। তবে কিছুই তখন অবশিষ্ট পাননি। দেখা যায় পোড়া মুরগির স্তুপ। এ ছাড়া চাল, ডালসহ পোড়া সবজি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। মুদি দোকানের সব পণ্য ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
গুলশান ডিএনসিসি ১ নম্বর কাঁচাবাজার ও সুপারমার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, মার্কেটের মূল অংশে ২১১টি দোকানের প্রায় সবই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দু’বছর আগে মার্কেটটি পুড়ে যাওয়ার পর আদালতের অনুমতি নিয়ে সেখানে নতুন করে মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছিল। এদিকে, আগুন লাগার খবরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম, ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। তারা অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম তদারকি করেন। শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, ঢাকা শহরের যে কোনো স্থ্ানে যদি অপরিকল্পিভাবে ইমারত নির্মিত হয়ে থাকে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকে, সে বিষয়ে রোববার (আজ) থেকে রাজউক পরিদর্শন শুরু করবে। প্রয়োজনে এসব ভবন সিলগালা করে দেওয়া হবে, না হলে অপসারণ করা হবে। উপযোগী অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সব রকম কার্যক্রম স্থগিত রাখা হবে।