ট্রাম্পের শেষ, বাইডেনের যুগ শুরু

32

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন জো বাইডেন

শপথ নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র গড়ার ডাক
সমীকরণ প্রতিবেদন:
অভিশপ্ত, অন্ধকার আর অপশাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে আলোর পথে ঝান্ডা ওড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। নানা নাটকীয়তা শেষে সংবিধানসম্মতভাবেই ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে জনপ্রিয়তায় একেবারে তলানিতে গিয়ে ইতিহাসের ধিকৃত প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউস ছেড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর গতকাল বুধবার সকালে (বাংলাদেশ সময় গত রাত ১০টা ৪৮ মিনিট) প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের কাছে শপথ নেন জো বাইডেন। বিচারপতি সোনিয়া সটোমাইয়র কাছে শপথ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। এভাবেই ট্রাম্পের পর শুরু হয় বাইডেন যুগ।
শপথ গ্রহণ শেষে ২২ মিনিটের অভিষেক ভাষণে বাইডেন বলেন, ‘এটা আমেরিকার দিন। এটা গণতন্ত্রের দিন। ইতিহাস এবং আশার একটি দিন। আমরা আবারও গণতন্ত্রের মূল্য অনুধাবন করতে পেরেছি। গণতন্ত্র ভঙ্গুর এবং এই মুহূর্ত থেকে আমার বন্ধুরা, সর্বত্র গণতন্ত্র বিরাজমান। এখন থেকে পবিত্র এই ভূমিতে, যেখানে কয়েকদিন আগে ক্যাপিটলে তান্ডব হয়েছে যেখানে এক জাতি হিসেবে আমাদের আবার একত্রিত হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র গড়তে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সব নাগরিকের প্রেসিডেন্ট হতে চাই।’ করোনার তান্ডবে আগে থেকেই ক্ষমতা গ্রহণের সীমিত পরিসরের এ অনুষ্ঠানকে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় আরও স্বল্পপরিসরে করতে হয়েছে। হাজারখানেক অতিথির (যার অর্ধেকই কংগ্রেসের মেম্বার) উপস্থিতিতে মধ্যদুপুরের অনুষ্ঠানের নিরাপত্তায় ছিল ন্যাশনাল গার্ডের ২৫ হাজার সদস্য ছাড়াও সেনাবাহিনীর নিয়মিত সাড়ে সাত শ সৈনিক এবং ওয়াশিংটন ডিসি ও ক্যাপিটল হিলের ৫ সহস্রাধিক নিরাপত্তারক্ষী। অর্থাৎ টানটান উত্তেজনায় নিন্ডিদ্র নিরাপত্তায় এ শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ বুশ ও বিল ক্লিনটন থাকলেও ছিলেন না বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ছিলেন সরব। ট্রাম্পের অবান্তর ভোট ডাকাতির অভিযোগ পাত্তা না দিয়ে ৬ জানুয়ারি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভাইস প্রেসিডেন্ট ইলেকটোরাল কলেজের ভোট সার্টিফাই করতে যেমন সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, একইভাবে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময়ও তাঁকে বিদায় অভিবাদন জানাতে না গিয়ে বাইডেনের অভিষেক সমাবেশে এসেছিলেন। আর এভাবেই রিপাবলিকান পার্টিতে নিজের ভবিষ্যৎ সংহত করার ক্ষেত্রে তিনি একধাপ এগিয়ে গেলেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিন কংগ্রেস ভবন পেছনে রেখে নির্মিত হয় সুউচ্চ মঞ্চ ক্যাপিটল রুটেন্ডায়। এর নিরাপত্তায় গিজগিজ করেন সৈনিকরা। সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সমাবেশ ঘটে সর্বত্র। অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পান ২ লাখ আমেরিকান, বিভিন্ন দেশের ২০ হাজারের বেশি অতিথি, সাংবাদিকের সমাগম ঘটে দেড় হাজারের মতো। সর্বমোট ২ হাজার মানুষ নিয়ে সম্পন্ন হয় অনুষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ১২ বছর আগে অবিস্মরণীয় জয় নিয়ে যে আমেজ আর চেতনায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে বারাক ওবামা অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, একইভাবে ইতিহাস রচনা করে ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও জ্যামাইকান বাবার উত্তরাধিকারী কৃষ্ণাঙ্গ নারী কমলা হ্যারিস। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের সে আমেজ আর উৎসব দৃশ্যমান হয়নি করোনার কারণে, একই সঙ্গে ট্রাম্পের গুন্ডামি আর মাস্তানির পরিপ্রেক্ষিতে। বাইডেন দায়িত্ব নিয়েই চারটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেন। করোনা মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং বর্ণবৈষম্য। ট্রাম্পের কারণে এসব চ্যালেঞ্জ শুধু আমেরিকার সামনেই নয়, গোটা সভ্যসমাজকেই গ্রহণ করতে হচ্ছে। প্যারিস জলাবায়ু চুক্তিকে ফেরার ঘোষণা এবং করোনা মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বাইডেন বলেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও ব্যক্ত করেন।
এসবের জন্য কংগ্রেসের সহায়তার বিকল্প নেই বলে বিনয়ের সঙ্গে উল্লেখ করেন ইতিহাসের প্রবীণতম প্রেসিডেন্ট (৭৮ বছর) জো বাইডেন। রাজনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘ ৪৭ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ট্রাম্পের রেখে যাওয়া বিভক্ত সমাজ প্রশাসন ও রাজনীতিতে ঐক্যের ধারা ফিরিয়ে আনতেও আন্তরিক প্রয়াসে ঘাটতি থাকবে না উল্লেখ করেন নয়া প্রেসিডেন্ট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে গত চার বছরে, তাও শিগগিরই দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে বাইডেন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা আর আতঙ্কাবস্থা তৈরি হয়েছে তার প্রশমন ঘটতে যাচ্ছে বাইডেন-কমলার নেতৃত্বে- এমন প্রত্যাশা সবার। আর এ প্রত্যাশায়ই বুক বেঁধে রয়েছে অভিবাসী সমাজ। ১৯৮৬ সালের পর আর কেউই অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা প্রদানের সত্যিকার কোনো উদ্যোগ নেননি। এমন একটি প্রত্যাশা পূরণেও কালক্ষেপণ করতে চান না বাইডেন। করোনায় থমকে যাওয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারেও ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘করোনা রিলিফ প্যাকেজ’ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা ফিরিয়ে এনে আমেরিকার মর্যাদা বিশ্বদরবারে সমুন্নত করতে বদ্ধপরিকর বাইডেন-কমলা প্রশাসন।
এদিকে এদিন সকালের বিদায়ী ভাষণ (ভিডিওতে রেকর্ডকৃত) প্রচার শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে ফ্লোরিডার উদ্দেশে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেন। এরপর সাড়ে ১০টায় ক্যাপিটল হিলের পশ্চিম পাশে সুউচ্চ সুসজ্জিত মঞ্চে অভিষেক পর্ব শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন শপথ নিয়ে স্বাগত ভাষণ দেন। বেলা ২টায় ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রি পরিদর্শন ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অপরাহ্ণ ৩টায় বাইডেন হোয়াইট হাউসে যান ভার্চুয়ালে প্যারেড প্রদর্শনের মাধ্যমে। রাত সাড়ে ৮টায় টম হঙ্কসের উপস্থাপনায় ৯০ মিনিটের একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয় প্রধান প্রধান টিভিতে।