চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২৯ নভেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

টেস্ট বাণিজ্যে নাজেহাল রোগী

দাম নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি-ডা. জাফরুল্লাহ, ওষুধ-টেস্ট দিলে বুঝিয়ে বলতে হবে-ডা. লেলিন
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ২৯, ২০২২ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন: দীর্ঘদিন পিঠের ব্যথায় ভুগছিলেন ফেরদৌসী বেগম (৪৮)। ব্যথা তীব্র হলে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে বেসরকারি ক্লিনিকে এক চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখাতে যান তিনি। চিকিৎসক সমস্যা শুনে প্রথমে বেশকিছু টেস্ট, এক্স-রে করে নিয়ে আসতে বলেন। সেই হাসপাতালে বিল পরিশোধের সময় কী কী টেস্ট দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে বিল কাউন্টার থেকে বলা হয়- বিভিন্ন টেস্টের সঙ্গে পায়ের হাঁটুর হাড়ের এক্স-রে করতে দিয়েছে। ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমি বিল পরিশোধ না করে পুনরায় চিকিৎসকের কাছে পিঠের ব্যথায় পায়ের এক্স-রের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে চিকিৎসক ভীষণ বিরক্ত হন। তিনি যে টেস্টগুলো দিয়েছেন তার প্রয়োজনীয়তা আমাকে না বুঝিয়ে বরং বলেন- চিকিৎসক কে? আপনি নাকি আমি। যেগুলো দিয়েছি সে টেস্টগুলো করে নিয়ে আসেন, পছন্দ না হলে অন্য চিকিৎসককে দেখান। অন্য রোগী, তাদের স্বজনদের সামনে আমাকে এভাবে অপমান করেন। আমি ভীষণ কষ্ট পাই। টেস্ট না করিয়ে ফিরে আসি। শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকে অর্থ খরচ করে যেসব বেসরকারি হাসপাতালে যান, সেখানেও রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা, ওষুধ বা অপারেশনের ব্যাপারে ঠিকমতো অবহিত করা হয় না। এমনকি চেম্বারে চিকিৎসকরাও রোগীদের কথা ভালোভাবে না শুনেই চিকিৎসাপত্র দেন বলে অভিযোগ আছে। ঢালাও টেস্টের খরচে বেড়ে যায় চিকিৎসা ব্যয়। অনেক চিকিৎসক নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে টেস্ট করাতে বলেন। কিংবা যেখানে তিনি রোগী দেখেন সেই ক্লিনিক থেকে টেস্ট করাতে বলেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোর আয়ের বড় উৎস এই টেস্ট। এই টেস্ট বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এখন পর্যন্ত হয়নি কোনো নীতিমালা। টেস্টের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন দামের কোনো নির্ধারিত মানদণ্ড না থাকায় রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো দাম রাখছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত আছেন শাহরিয়ার মাহমুদ (৩৫)। তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর দুটি কিডনি দুই বছর ধরে বিকল। সপ্তাহে দুই দিন সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাতে খরচ হয় ১ হাজার ১২০ টাকা। মাসে শুধু স্ত্রীর কিডনি ডায়ালাইসিসে খরচ হয় ৬ হাজার ৭২০ টাকা। এর সঙ্গে ওষুধ, চিকিৎসক, যাতায়াত মিলিয়ে মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যায় চিকিৎসার পেছনে। ওষুধ খরচ, চিকিৎসা খরচ চালাতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন বলে জানান তিনি। ক্যান্সার, কিডনি, লিভারের মতো জটিল রোগের খরচ জোগাতে বিপাকে পড়ছেন গরিব রোগীরা। করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছিলেন সাঈদা বেগম (৭৫)। কভিড নেগেটিভ হওয়ার পর থেকেই বেশকিছু সমস্যা দেখা দেয় তার। তার ছেলে তাকে রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হাসপাতালে নিয়ে যান। বাইরের ওয়েটিং রুমে বসিয়ে রেখে একের পর এক টেস্টের নমুনা নিতে থাকেন টেকনোলজিস্টরা। সাঈদা বেগমের ছেলে শরিফুল ভূঁইয়া বলেন, ‘মায়ের শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় তাকে ভর্তির জন্য একাধিকবার রিসিপশনে গিয়ে বলি। কিন্তু তারা বলছেন টেস্ট না করে আমরা ভর্তি করব না। কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে অনুরোধ করলে তারা বলেন, দুঃখিত আমরা আসলে ঝুঁকি নিতে চাইছি না। এভাবে প্রায় চার ঘণ্টা কেটে যায়। মা অস্থির হতে থাকেন। রোগীকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তাকে ভর্তি করে বেডে শুয়ে টেস্টগুলো করালে সমস্যা কোথায় ছিল সেটাই বুঝলাম না। ২৪ ঘণ্টা আগের কভিড নেগেটিভ সনদ আমরা সঙ্গে করেই এনেছিলাম। সেটাও তাদের হাসপাতাল থেকেই টেকনোলজিস্ট গিয়ে বাসায় থেকে নমুনা নিয়ে এসে রিপোর্ট দিয়েছিলেন। আমরা তো বেড কিংবা কেবিন ভাড়া দিতে কার্পণ্য করিনি, কিংবা অগ্রিম চাইলেও দিতাম। পকেটের টাকা খরচ করেও যদি সেবা না মেলে তাহলে কার কাছে গিয়ে বিচার জানাব।’ চিকিৎসার জন্য ফের বিদেশমুখী ভিড় বেড়েছে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দূতাবাসে মেডিকেল ভিসার জন্য যাওয়া মানুষের ভিড় বাড়ছে। দেশের সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। বেসরকারিতে রয়েছে আস্থার সংকট, প্রতারণার ফাঁদ। উচ্চবিত্তের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাকে এসব কারণ আরও উসকে দিচ্ছে। ভালো সেবার আশায় মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষও ছুটছেন বিদেশ। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘দেশের মানুষ নানা কারণে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়। এর মধ্যে মানসিক আস্থার সংকট অন্যতম। আবার ১৬ কোটি মানুষের জন্য যত ভালো মানের হাসপাতাল থাকার কথা, সেটা সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেকে প্রতিবেশী দেশে যায়।’
দাম নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি-ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের চিকিৎসকদের অনেকের একটা বদ অভ্যাস আছে। রোগী টেস্ট কিংবা ওষুধের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আপনি কি ডাক্তার?’। রোগীদের অবশ্যই তাকে দেওয়া টেস্ট এবং ওষুধ সম্পর্কে জানার অধিকার আছে। টেস্টের দাম নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘টেস্ট কেন দেওয়া হলো? কী ধরনের টেস্ট? এ বিষয়ে রোগী বা স্বজনদের বুঝিয়ে বলতে হবে। রোগীদের এ অধিকার আদায়ে প্রতিবাদী হতে হবে। রোগীদের দাবি করতে শিখতে হবে। টেস্টের দাম নির্ধারণ করা খুব জরুরি। আমরা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে স্বল্পমূল্যে টেস্ট করাই দেখে রোগীরা ভাবে আমাদের টেস্টের মান ভালো নয়। অথচ একই টেস্ট করিয়ে আমার হাসপাতালের গা লাগোয়া হাসপাতাল লাখ টাকা তুলে নেয়। এ জন্য রোগীদেরও সচেতন হতে হবে।’ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশেই ভালো মানের চিকিৎসা সেবা আছে। কিন্তু মানুষের আস্থা নেই। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্যজনক। দেশে ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে। নিয়ন্ত্রণে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ নেই। সরকার শুধু বড় বড় বিল্ডিং বানাতে ব্যস্ত। কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে সে উদ্যোগ নেই। ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে।
হাসপাতালে খরচ ভোগান্তি বেশি-ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আস্থার সংকট আছে। এখানে চিকিৎসা খরচ বেশি, চিকিৎসা নিতে গিয়ে দুর্ভোগের শিকার হতে হয় রোগীদের। চিকিৎসা সবই ঢাকাকেন্দ্রিক।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের ডায়াগনস্টিকের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চিকিৎসকরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দালাল চক্র, সেবার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেশে গুণগত মানের চিকিৎসক আছেন। কিন্তু তারা বেশি রোগী দেখায়, মনোযোগ দেন না। চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে রোগীর খরচ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওষুধ, টেস্ট এগুলো বেশি লেখার অভিযোগ আছে।’ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে সেবার দাম ও মান নির্ধারণ করে সেটা টাঙিয়ে রাখতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যাটাগরি অনুযায়ী দাম ঠিক করে দিতে হবে। রোগী তার সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা নিতে পারবে। ডায়াগনস্টিকেও দাম নির্ধারণ করে মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রেসক্রিপশন অডিট চালু করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেবা জোরদার করতে হবে। চিকিৎসায় রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হবে’।
ওষুধ-টেস্ট দিলে বুঝিয়ে বলতে হবে-ডা. লেলিন চৌধুরী
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, ‘চিকিৎসক রোগীর জন্য যে ওষুধ ও পরীক্ষা লিখবেন তা অবশ্যই ব্যাখ্যা করবেন। যদি কেউ ব্যাখ্যা না করেন তাহলে তিনি রোগীর অধিকারকে রক্ষা করলেন না। ১৯৪৮ সালের জেনেভা ডিক্লারেশন অনুযায়ী চিকিৎসক এবং রোগীর কিছু অধিকার রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসকের পাশে রোগী যখন চিকিৎসা প্রার্থী হয়ে বসেন তখন তাদের মধ্যে অলিখিত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থাৎ তারা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখবেন। পরস্পরকে সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন। তারা সৌহার্দ্যমূলক মানবিক আচরণ করবেন। যদি চিকিৎসক রোগীর প্রতি সে মনোভাব পোষণ না করেন তবে তিনি রোগীর অধিকার লঙ্ঘন করলেন। রোগীও চিকিৎসকের প্রতি তার দায়িত্ব বজায় রাখবেন।’ ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের চিকিৎসকদের একটি অংশের মধ্যে রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের পরিবর্তে রোগীকে নির্দেশ দেওয়ার, আদেশ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য যায়, এটা তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। চিকিৎসকদের একটি অংশ রোগীকে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন না। চিকিৎসকদের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। কিন্তু আমরা অনেক সময় দেখি অনেক চিকিৎসকের রোগীর প্রতি আচরণ সঠিক হয় না। তারা রোগীর প্রতি অমনোযোগী থাকেন। ফলে রোগীর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। সামাজিক মান, অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝে রোগীর সঙ্গে তার মতো করে আন্তরিক আচরণ করার কথা বলা হয়। চিকিৎসকদের একটি অংশ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হচ্ছে। তাদের আচরণসহ পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো রোগীর ভিতরে বিদেশমুখী প্রবণতা তৈরি করে।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।