টিকা আসছে আজ : চলতি মাসেই প্রয়োগ

47

সমীকরণ প্রতিবেদন:
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে দেশে করোনা প্রতিষেধক টিকা পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ভারত সরকারের উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পৌঁছাবে। বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশের মহামারিকালের এ উপহার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিমানবন্দরে গ্রহণের কথা রয়েছে। এরপর কড়া নিরাপত্তায় রাজধানীর তেজগাঁও ইপিআই কোল্ডস্টোরে সংরক্ষণ করা হবে। পরে চলতি মাসের শেষদিকে রাজধানীর চারটি হাসপাতালে প্রায় অর্ধ সহস্রাধিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের দেহে পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগ করা হবে। এ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগকৃত সবাইকে এক সপ্তাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরমধ্যেই ২৫ জানুয়ারি করোনার টিকা স্বচ্ছতার সাথে ব্যবস্থাপনার জন্য আইসিটি বিভাগের তৈরি সুরক্ষা প্লাটফর্মটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুঝে পাবে। পরদিন থেকে শুরু হবে টিকা প্রাপ্তির রেজিস্ট্রেশন। সেদিনই ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম চালান ৫০ লাখ ডোজ বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মাসের আট ফেব্রুয়ারি সারা দেশে টিকা প্রয়োগের কথা রয়েছে। সেই লক্ষ্যে টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সারা দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হবে। এছাড়াও টিকাদানের অন্যান্য প্রস্তুতি শতভাগ শেষ হয়েছে। টিকা ব্যবস্থাপনায় সার্বিকভাবে সহায়তা করবে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়াও টিকা বিষয়ে অহেতুক গুজব ও ভয়ভীতি দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই হিসেবে দেশের প্রায় আট থেকে ৯ কোটি মানুষকে টিকাদানের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতের সেরাম থেকে আসবে তিন কোটি ডোজ, ভারত সরকারের উপহার আসছে বিশ লাখ ডোজ, আবার কোভ্যাক্স প্রকল্প থেকে মোট জনসংখ্যার বিশ শতাংশ অনুপাতে তিন কোটি ষাট লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য দেশের সফল টিকা আমদানির সবধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেইসাথে আশা করা হচ্ছে এবছরই বঙ্গভ্যাক্সের টিকাও সফলতার সঙ্গে বাজারে আসতে পারে। এছাড়াও টিকা কার্যক্রমের বাইরে থাকবে প্রায় সাত কোটিরও বেশি মানুষ। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখের অধিক গর্ভবতী নারী রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক আছে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ শতাংশ, প্রবাসে আছে আরও প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ। এছাড়াও ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন ব্যক্তি, এই মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই নেই এমন ব্যক্তিও টিকা নিতে পারবেন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার খুরশীদ আলম বলেন, ভ্যাকসিন দেয়ার পর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়া স্বাভাবিক। আমাদের দেহে নতুন কিছু প্রবেশ করলে ইউনিটি তার একটা প্রতিক্রিয়া দেখায়। এটা একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবুও এসব সমস্যা এড়াতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে টিকা প্রয়োগ করা হবে। সেখানে টিকা দেয়ার পর দশ থেকে পনের মিনিট পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। সাধারণ মানুষের অনাস্থা দূর করার জন্য গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে। আমরাও অধিদপ্তর থেকে টিকা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখবো। সোস্যাল মিডিয়ায় অহেতুক গুজব, ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে না পারে সেদিকেও আমাদের সবার খেয়াল রাখতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেছেন, বৃহস্পতিবার (আজ) ভারতের উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ করোনা টিকা আসবে। প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরে এই উপহার গ্রহণ করবেন। চুক্তি অনুযায়ী ৫০ লাখ ডোজ করোনা ভ্যাকসিন দেশে আসবে আগামী সোমবার (২৫ জানুয়ারি)। এরপর প্রথম চালানের উপহারের ২০ কোটি টিকা তেজগাঁও ইপিআই স্টোরে সংরক্ষণ করা হবে। উপহারের ২০ লাখ ও প্রথম চালানের ৫০ লাখ টিকার প্রথম পর্বে ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশের ৬০ লাখ ব্যক্তিকে টিকা দেয়া হবে। এরপর দ্বিতীয় মাসে ৫০ লাখ ব্যক্তিকে দিকা দেয়া হবে। পরের মাসে আবার প্রথম যাদের দেয়া হয়েছে তাদের দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে ৬০ লাখ ব্যক্তিকে টিকা দেয়া হবে। টিকা দেশে আসার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
সেদিন ২০ থেকে ২৫ জন চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিক প্রতিনিধিদের টিকা প্রদান করবেন। পরদিন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমাজের বিশিষ্টজন হিসেবে বাছাইকৃত চারশ থেকে পাঁচশ ব্যক্তিতে টিকা প্রদান করা হবে। যাতে টিকাদানে মানুষ উৎসাহিত হয়। এরপর তাদের প্রত্যেককে এক সপ্তাহ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে। পর্যবেক্ষণ শেষে সম্ভাব্য আট ফেব্রুয়ারি সারা দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকা পাঠানো হবে। ইতোমধ্যে আমাদের টিকাদান সংশ্লিষ্ট সবধরনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। জনবল ট্রেনিংও ৩০ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে টিকা আমদানি ও প্রয়োগের জন্য অনেকেই আবেদন করেছে। আমরা এখনো কাউকে টিকা প্রয়োগের অনুমোদন দিচ্ছি না। করোনার টিকা নতুন একটি প্রতিষেধক। এটি পর্যবেক্ষণ ছাড়া কাউকে প্রয়োগের অনুমোদন দেয়া হবে না। আমরাও হাসপাতাল ব্যতীত অন্যকোথাও টিকা দিচ্ছি না। যারা টিকা গ্রহণ করবেন তাদের প্রত্যেককে টেলিমেডিসিন সেবার আওতায় রাখা হবে। টিকার সর্বশেষ আপডেট জনগণকে জানাবো। সরকারি হাসপাতালে দেয়া হবে, বাইরে কোনো কেন্দ্র থাকবে না। প্রতি টিমে দুজন ভ্যাকসিনেটর ও চারজন স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন, যাদের ভ্যাকসিন দেয়া হবে তাদের টেলিমেডিসিন সুবিধা দেয়া হবে। ফলোআপে রাখা হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম বলেন, করোনার টিকা প্রয়োগের কর্মসূচি স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য সুরক্ষা প্লাটফর্ম নামে অ্যাপ বানিয়েছি। একাজে আইসিটি বিভাগের সঙ্গে বেসিস ও এটুআই যুক্ত আছে। অ্যাপটি আমাদের নিজস্ব জনবল বানিয়েছে। এজন্য আমাদের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। ২৩ তারিখের মধ্যে অ্যাপের সবকাজ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে আগামী ২৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অদিধপ্তরকে অ্যাপটি হস্তান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী জুয়েনা আজিজ বলেন, সরকারি তত্ত্বাবধায়নে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সেহেতু নকল টিকা বাজারে আসার কোনো সুযোগ নেই। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যৌথ টিম মাঠে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করবে। করোনার প্রতিষেধক টিকা বিমানবন্দরে রিসিভ করা থেকে সারা দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রেরণ ও মানবদেহে প্রয়োগ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তা করবে।