টার্গেট : রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী

41

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী গোপন নজরদারি ইসরাইলি পেগাসাসের : ৫০ হাজার ফোনে আড়ি
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিশ্বজুড়ে রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের ফোনের ওপর গোপনে নজরদারি করতে ইসরাইলের একটি প্রতিষ্ঠান সরকারগুলোর কাছে একটি ফোন স্পাইওয়্যার বিক্রি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ করা হয়েছে। ইসরাইলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের এই স্পাইওয়্যার কিনেছে যেসব ক্রেতা তারা ৫০ হাজার ফোনের ওপর গোপনে নজরদারি চালিয়েছে। এই তালিকা এবং এর ওপর তদন্তের প্রতিবেদনটি সারা বিশ্বের কিছু প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। পেগাসাস নামে এই স্পাইওয়্যারটি সম্পর্কে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট, ল্য মোঁদ এবং আরো ১৪টি সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। তবে মোট কয়টি দেশে কতগুলো ফোন হ্যাক করা হয়েছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। আইওএস কিংবা অ্যান্ড্রয়েড- কোনো ফোনই পেগাসাসের নজরদারি থেকে নিস্তার পায় না।
ইসরায়েলি সংস্থা এনএসওর দাবি- নিরাপত্তার জন্য নজরদারি চালানোর প্রযুক্তি তৈরি করাই তাদের কাজ। তবে তারা শুধু বিভিন্ন দেশের সরকার, সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার বিক্রি করে থাকে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানসহ ১৬টি সংবাদপত্রের অনুসন্ধানে পেগাসাসের নতুন কেলেঙ্কারি সামনে আসে। বলা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এনএসও গ্রুপ থেকে এই স্পাইওয়্যার কিনে নিজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিরোধী রাজনীতিক ও ভিন্ন মতের মানুষদের ওপর ওপর নজরদারি করে থাকে। এনএসও গ্রুপ শুধু সরকারি ক্রেতাদের কাছেই এই ফোন হ্যাকিং সফটওয়্যার বিক্রি করা হয় বলে জানালেও ভারতের মোদি সরকারের দাবি, ভারতের সরকারি এজেন্সিগুলোর তরফে কোনো অনুমোদনহীন নজরদারি চালানো হয়নি। সরকারের বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটিই বরং ভিত্তিহীন। ম্যালওয়্যারটি বিক্রি করেছে যে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান সেটি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, মানবাধিকার রেকর্ড ভালো এমন দেশের সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তারা এই সফটওয়্যার বিক্রি করেছে। ভারতের নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়্যার এই হ্যাকিংয়ের তালিকায় সে দেশের অন্তত ৩০০ রাজনীতিক, সাংবাদিক, অধিকার কর্মী, বিজ্ঞানীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে। তালিকায় এই পোর্টালের দু’জন প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিকের নামও রয়েছে বলে দ্য ওয়্যার জানিয়েছে। কাদের লক্ষ্য করে এই হ্যাকিং তার পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই তদন্তের সাথে জড়িত সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিশ্বের ৫০টি দেশে অন্তত ১০০০ জনের নাম তারা জানতে পেরেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, অধিকার কর্মী এবং আরব দেশের রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্য। সিএনএন, আলজাজিরা ও নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ ১৮০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের নাম এই তালিকায় রয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, এই অবৈধ নজরদারির ঘটনা বেশির ভাগ ঘটেছে মূলত ১০টি দেশে : ভারত, আজারবাইজান, বাহরাইন, হাংগেরি, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, রোয়ান্ডা, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তদন্তের অংশ হিসেবে যখন এসব দেশের সাথে যোগাযোগ করা হয় তখন তাদের মুখপাত্ররা পেগাসাস ব্যবহার এবং অবৈধভাবে নজরদারি চালানোর কথা অস্বীকার করেন। তবে পেগাসাস ব্যবহার করে কোন কোন দেশে কাদের ফোন হ্যাক করা হয়েছে তার বিস্তারিত তালিকা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলছে, পেগাসাস সম্ভবত কোনো বেসরকারি কোম্পানির তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী স্পাইওয়্যার। আইওএস বা অ্যান্ড্রয়েড-চালিত ফোনের ওপর গোপনে নজরদারি চালানোর ক্ষমতা এই ম্যালওয়্যারটির রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, পেগাসাস যদি কোনোভাবে একবার কোনো ফোনের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে, তাহলে ফোন ব্যবহারকারীর অজান্তে ম্যালওয়্যারটি ফোনটিকে ২৪ ঘণ্টার এক নজরদারির যন্ত্রে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। এই ফোন থেকে যত মেসেজ বা ছবি পাঠানো হয়, কিংবা রিসিভ করা হয় পেগাসাস তা কপি করে গোপনে পাচার করে পাঠিয়ে দেয় নির্দিষ্ট জায়গায়। এই স্পাইওয়্যারটি ব্যবহারকারীর অগোচরে ফোনের কথাবার্তা রেকর্ড করতে পারে, এমনকি ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে গোপনে ভিডিও রেকর্ড করতে পারে। সে সাথে মোবাইল ব্যবহারকারী কোথায় আছেন, কোথায় গিয়েছিলেন অথবা কার কার সাথে দেখা করেছেন, পেগাসাস সে সম্পর্কেও জানতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০১৬ সালে গবেষকরা পেগাসাসের সবচেয়ে প্রথম ভার্সনটির কথা জানতে পারেন। সে সময় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফোনে টেক্সট মেসেজ বা ইমেইলে পাঠানো হতো, যাতে থাকত একটি লিংক। সেই লিংকে ক্লিক করলেই পেগাসাস ফোনের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিতো। অবশ্য এরপর এনএসও গ্রুপ এই স্পাইওয়্যারের ক্ষমতাকে আরো বহুগুণ শক্তিশালী করেছে। ২০১৯ সাল থেকে ১৭টি সংবাদমাধ্যম পেগাসাসের কীর্তিকলাপ নিয়ে তদন্ত করছে। এই তদন্তের আনুষ্ঠানিক নাম ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’। আর সেই তদন্তে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ফোনে আড়িপাতা হয়েছে। ফোন হ্যাক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সেলফোন হ্যাক করার প্রমাণ তারা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। প্যারিসভিত্তিক সংগঠন ফরবিডন স্টোরিস এবং মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৫০ হাজার সেলফোন নম্বরের একটি তালিকা তুলে দেয় ১৭টি সংবাদমাধ্যমের কনসোর্টিয়ামের হাতে। তার মধ্যে থেকে ৫০টি দেশের এক হাজার জনের তালিকা তৈরি করে কনসর্টিয়াম, যাদের ইসরাইলি সংস্থা এনএসওর গ্রাহকরা বেছে নিয়েছিল আড়িপাতার জন্য। এর মধ্যে ১৮৯ জন সাংবাদিক, ৬০০ জন রাজনীতিক, ৬৫ জন শিল্পপতি, ৮৫ জন মানবাধিকার কর্মী। সাংবাদিকদের মধ্যে যাদের ফোনে আড়িপাতা হয়েছে তারা এপি, রয়টার্স, সিএনএন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসসহ অনেক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, তাদের ফরেনসিক গবেষকরা দেখেছেন, ওয়াশিংটন পোস্টের নিহত সাংবাদিক জামাল খাসোগির বাগদত্তার ফোনে পেগাসাস ইনস্টল করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ইস্তানবুলে সৌদি কনসুলেটে খাসোগিকে হত্যা করার চার দিন বাদে তার বাগদত্তার ফোনে এই স্পাইওয়্যার বসানো হয়। এর আগেও পেগাসাস নির্মাতা এনএসওর বিরুদ্ধে নজরদারির অভিযোগ এসেছে। তদন্তে ওয়াশিংটন পোস্টও ছিল। তারা জানিয়েছে, খাসোগির ঘনিষ্ঠ দুই নারীর ফোনে স্পাইওয়্যার বসানো হয়েছিল। পেগাসাসের নজরদারি নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। এনডিটিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এর আপডেট প্রচার করছে। বলা হয়েছে, ইসরাইলি স্পাইওয়্যার দিয়ে আড়িপাতার সম্ভাব্য নিশানায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে নাম এসেছে ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী এবং নির্বাচনী কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের। তালিকায় রয়েছেন দেশটির বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণও। এ ছাড়া মোদি সরকারের আমলে ভারতের অন্তত ৪০ জন সাংবাদিকের ফোনে আড়িপাতা বা এর চেষ্টা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ও পরে রাহুল গান্ধীর অন্তত দু’টি ফোন নম্বরে আড়িপাতা বা এর চেষ্টা করা হয়েছে। পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে নিশানায় থাকা ব্যক্তির ফোনের সব মেসেজ, ক্যামেরা, ভয়েস রেকর্ডার, কন্ট্যাক্ট নাম্বারসহ খুঁটিনাটি প্রায় সব বিষয়েই শতভাগ নজরদারি করা যায়। দ্য ওয়ারের তথ্য মতে, পেগাসাসের নিশানায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান দুই মন্ত্রীর একজন হলেন, প্রহ্লাদ প্যাটেল, আরেকজন অশ্বিনী বৈষ্ণ। কিছুদিন আগেই মোদির মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন অশ্বিনী। ২০১৭ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালে তাকে আড়িপাতার সম্ভাব্য নিশানা বানানো হয়েছিল। ইসরাইলি স্পাইওয়্যার দিয়ে নজরদারির চেষ্টা হয়েছে ভারতের নির্বাচনী কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোর বা পিকের ওপরও। ২০১৪ সালের যে নির্বাচনে জিতে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি, সেই নির্বাচনে বিজেপির হয়ে কলকাঠি নেড়েছিলেন পিকে। এরপর ভারতের আরো অনেক রাজনৈতিক দল ও নেতার হয়ে কাজ করেছেন তিনি। সবশেষ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জি এবং তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করেছেন এই প্রশান্ত কিশোর। প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাবাসা ২০১২ সালের জাতীয় নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন সংস্থার রায় সম্পর্কে বিখ্যাত মতবিরোধ রেকর্ড করেছিলেন। এমনকি ‘সংখ্যালঘু সিদ্ধান্তগুলো’ বহু-সদস্য সংবিধিবদ্ধ সংস্থা কর্তৃক পালনকৃত সুপ্রতিষ্ঠিত সম্মেলনের বিপরীতে ‘দমন করা হচ্ছে’ বলে সভাগুলিতে অংশ নেয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি।
দ্য ওয়্যার, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ১০টি দেশের অন্যান্য গণমাধ্যমের অংশীদারদের এক মাসব্যাপী সহযোগিতামূলক তদন্ত অনুসারে, তালিকায় ভারতের এক হাজারেরও বেশি ফোন নম্বর প্রকাশিত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে এনএসওর ডাটাবেসে মূল রাজনীতিবিদ ছাড়াও ৪০টিরও বেশি ভারতীয় সাংবাদিক এবং একটি সাংবিধানিক কর্তৃত্ব পাওয়া গেছে, দ্য ওয়্যার জানিয়েছে।