চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৩০ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঝরনা দেখার আনন্দ রূপ নিল বিষাদে!

মিরসরাইয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাস যাত্রী ১১ শিক্ষার্থী নিহত
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ৩০, ২০২২ ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় ঝরে গেল ১১ জন পর্যটকের প্রাণ। তাদের আর বাড়ি ফেরা হলো না। গতকাল শুক্রবার বেলা পৌনে ১টার নাগাদ খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের ঝরনা এলাকার রেলক্রসিংয়ে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসে খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে আসেন মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৫ জন। তারা সবাই হাটহাজারির একটি কোচিং সেন্টারের ছাত্র ও শিক্ষক। ঝরনা দেখা শেষে ওইদিন বেলা পৌনে ১টার দিকে ফেরার পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতী তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১১ জন নিহত হন, আহত হয়েছেন আরো ৫ জন। নিহতরা হলেন- মাইক্রোবাসের চালক গোলাম মোস্তফা নিরু (২৬), এসএসসি পরীক্ষার্থী মো: হাসান (১৭), মোহসাব আহম্মেদ (১৬), মোস্তফা মাসুদ রাকিব (১৯), সাগর (১৮), আয়াতুল ইসলাম (১৯), ইকবাল হোসেন মারুফ (১৮), মাহিন (১৭), কোচিং সেন্টারের শিক্ষক জিয়াউল হক সজিব (২২), ওয়াহিদুল আলম জিসান (২৩) ও রিদোয়ান চৌধুরী (২২)। আহতরা হলেন- হৃদয়, শওকত, তাসমির, আয়াত ও ইমন।

আহতদের স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে মিরসরাই সদর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করে। এ দিকে ঘটনার পরপর মিরসরাই থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে। দুর্ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনে প্রায় চার ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। বিকেল ৫টার দিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম এসে ট্রেনের সাথে আটকে থাকা মাইক্রোবাস উদ্ধার করার পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। গেটম্যান সাদ্দামকে আটক করেছে জিআরপি পুলিশ।

গেটম্যানের অবহেলায় ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা:

ট্রেন দুর্ঘটনার সময় রেলগেট এলাকায় কোনো গেটম্যান ছিল না বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। গেটম্যান সাদ্দামের অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করছেন তারা। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল ওয়াজেদ মামুন বলেন, ‘ঘটনার সময় গেটম্যান সাদ্দাম ছিল না। তার অবহেলায় একসাথে ১১ জন মারা গেছে।’ গেটম্যান ছিল না বলে আরো জানিয়েছেন ট্রেনের যাত্রী কলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি ট্রেনে ছিলাম। দুর্ঘটনাস্থলে কোনো গেটম্যান ছিল না। মাইক্রোবাস টেনে হিঁচড়ে এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে ট্রেন দাঁড়ানোর পর ট্রেনের চালকও পালিয়ে যান।

এলাকার বাসিন্দা রায়হান বলেন, আমি শুনেছি গেটম্যান সাদ্দাম তখন নামাজে ছিল। সে তখন ঘটনাস্থলে ছিল না। তার অবহেলায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার শামছুদ্দোহা বলেন, ‘যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে ওইখানকার গেটম্যানের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই। এটি আমাদের আওতায় নেই।’ ব্যাগগুলো পড়ে আছে মানুষগুলো নেই : দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি থেকে নিথর দেহগুলো উদ্ধার করে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে বড়তাকিয়া রেলস্টেশনে। স্টেশন মাস্টারের কক্ষের বারান্দায় পড়ে আছে তাদের সাথে থাকা ব্যাগগুলো। ব্যাগে রক্ত ও ময়লা লেগে আছে। তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, আহারে জীবন… সকালে ব্যাগগুলো সাথে নিয়ে এসেছিল তারা। এখন ব্যাগগুলো পড়ে আছে, মানুষগুলো বেঁচে নেই।

একসাথে এত লাশ আর দেখিনি:

বিকট আওয়াজ শুনে বাড়ি থেকে দৌড়ে রেললাইনে এসে দেখি ট্রেন একটি মাইক্রোকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু দূর গিয়ে ট্রেনটি থামে। অনেক মানুষ মাইক্রো বাসের ভেতরে আটকে রয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে একে একে ১১টি লাশ উদ্ধার করে। একসাথে এত লাশ আগে চোখের সামনে দেখিনি। মনে হচ্ছে সব জীবন্ত। এ সময় তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এত লাশ দেখে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এভাবে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন পূর্ব খৈয়াছরা এলাকার মোজাহের হোসেন। তিনি আরো বলেন, দুর্ঘটনার স্থান থেকে মাইক্রোবাসকে টেনে হিঁচড়ে এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে এসেছে। কেন যে তারা ঝরনায় মরতে এলো?

ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন:

১১ জন পর্যটক নিহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে প্রধান করা হয়েছে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো: আনছার আলীকে। কমিটির সদস্যরা হলেন- বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী-১ আবদুল হামিদ, বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (লোকো) জাহিদ হাসান, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট রেজানুর রহমান এবং বিভাগীয় মেডিক্যাল অফিসার (ডিএমও) মো: আনোয়ার হোসেন। এই কমিটিকে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ দ্রুত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো: জাহাঙ্গীর হোসেন। অপর দিকে রেলের জি এম জাহাঙ্গীর হোসেনসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো: আনছার আলী বলেন, ঘটনাটি কিভাবে ঘটেছে, দোষী কারা সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তবে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে না দিলেও যত দ্রুত সম্ভব রিপোর্ট দাখিল করা হবে। ইতোমধ্যে তদন্তকাজ শুরু করেছি। চেষ্টা করছি তিন-চার দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। শুনেছি ট্রেনটি বড়তাকিয়া ক্রস করার সময় লাইনে উঠে যায় মাইক্রোবাসটি। এ সময় ইঞ্জিনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি এক কিলোমিটার দূরে চলে যায়।

গেটম্যান সাদ্দাম আটক:

শুক্রবার বিকেল ৬টার দিকে খৈয়াছরা লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বে অবহেলার কারণে গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে আটক করেছে রেলওয়ে পুলিশ। চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজিম এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী মফিজুল হকসহ কয়েকজন দাবি করেন, দুর্ঘটনার সময় গেটম্যান সাদ্দাম সেখানে ছিলেন না। তিনি জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন।

হরিতে বিষাদ:

কোচিং সেন্টারের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে ঝরনায় গা ভিজেয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ছাত্র-শিক্ষকরা। খৈয়াছরা ঝরনার গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে আনন্দ করে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। মাত্র ৫ মিনিট পরে আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। চলন্ত ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায় তাদের বহনকারী মাইক্রো। জানা গেছে, আরঅ্যান্ডজে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৪ জন শুক্রবার সকাল ৮টায় হাটহাজারীর আমান বাজার থেকে মাইক্রোবাসে খৈয়াছরা ঝরনায় ঘুরতে যান। কোচিং সেন্টারের এক শিক্ষার্থী জাহেদ কাউসার জানান, আমান বাজার এলাকার যুগিরহাটে আমাদের কোচিং সেন্টারটি অবস্থিত। কোচিং সেন্টারের ১৪ শিক্ষক-শিক্ষার্থী খৈয়াছড়া ঝরনাসহ মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র দেখতে ৫০০ টাকা করে চাঁদা তুলেছিলেন। এর মধ্যে চারজন শিক্ষক ছিলেন। তারা হলেন জিসান, রিদুয়ান, সজিব ও রাকিব; বাকিরা শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছয়জন এসএসসি পরীক্ষার্থী বাকি তিনজন একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। জাহেদ আরো জানান, পিকনিকে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ আমার ফুটবল ম্যাচ থাকায় যাওয়া হয়নি।

এলাকায় মাতম:

দুর্ঘটনায় হাটহাজারী উপজেলার ৮ নং চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের ৬ ও ৮ নং ওয়ার্ডে হতাহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। একই ঘটনায় কেউ সন্তান হারানোর আর্তনাদে মূর্ছা যাচ্ছেন কেউ বা আপনজন বা প্রতিবেশীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। সবার আর্তনাদে এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সচেতন এলাকাবাসীর আক্ষেপ ড্রাইভারের অবহেলা নাকি গেটম্যানের দায়িত্বহীনতা। যার কারণে এতগুলো মেধাবী প্রাণ ঝরে গেলো তার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। কেননা এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।