চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৩ জুলাই ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জুলাই জুড়ে বাড়বে সংক্রমণ

সমীকরণ প্রতিবেদন
জুলাই ৩, ২০২১ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

“বর্ষার আর্দ্র-শীতল আবহাওয়াতে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। এ সময় সর্দি-কাশির সমস্যা বৃদ্ধি পায়। হাঁচি-কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেট আর্দ্র-শীতল ভারি বাতাসে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়। শুধু তাই নয়, বাতাসের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে ড্রপলেট বা তার সঙ্গে থাকা ভাইরাসের কণা সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনকহারে বাড়তে থাকায় সারাদেশে গত বৃহস্পতিবার থেকে সাত দিনের কঠোর লকডাউন চলছে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের্ যাব-পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে মাঠে নামানো হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হলে তার জেল-জরিমানা নিশ্চিত করতে মাঠে রয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থা ধরে রাখা গেলে দেশে করোনা ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা অনেকাংশে সম্ভব হবে। তবে জুলাই জুড়ে সংক্রমণের ধারা ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে। বিষয়টির যৌক্তিকতা তুলে ধরে তারা বলেন, করোনার সুপ্তিকাল সাধারণত দুই সপ্তাহ বা ১৪ দিন। এ সময়ের পর এর লক্ষণ ও উপসর্গ প্রকাশ পায়। গত কয়েকদিনের সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, সারাদেশে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত। তাদের মধ্যে অনেকের শরীরে লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় তারা এখনো নমুনা পরীক্ষা করাননি। উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর তারা পরীক্ষা করালে আক্রান্তদের একটি বড় সংখ্যা বেরিয়ে আসবে। এ হিসাবে আগামী অন্তত দু’সপ্তাহ শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।
অন্যদিকে লকডাউন শুরুর আগে মাইক্রোবাস-পিকআপসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহনে গাদাগাদি করে শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার পথে বিপুল সংখ্যক মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়েছে। যাদের মাধ্যমে গ্রামে থাকা আত্মীয়স্বজনরাও সংক্রমিত হবেন। এছাড়া ঈদের আগে শহর থেকে সীমান্তের অতিসংক্রমিত জেলাগুলোতে গিয়ে অনেকে নতুন করে আক্রান্ত হবেন। এতে জুলাইয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাতেও সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সময়ের গ্রাফ/চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সংক্রমণ পরিস্থিতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এক থেকে ন্যূনতম দেড় মাস অব্যাহত থাকে। কখনো তা দুই মাস দীর্ঘস্থায়ী হয়। টানা লকডাউন এবং মাস্ক পরিধানসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি ও আনুষঙ্গিক নিয়ম-কানুন মেনে চললে পরবর্তীতে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসে। দেশে করোনা প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পরও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২০ সালের জুনের প্রথমভাগে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পর তা জুলাইয়ের প্রায় শেষভাগে এসে নিম্নমুখী হতে শুরু করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের পহেলা মে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৭১ জন। যা ৩১ মে এসে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৪৫ জনে। পরবর্তীতে জুন মাসে তা বেড়ে ৪ হাজারের কোটা ছাড়িয়ে যায়। ২৯ জুন মোট ৪ হাজার ১৪ জন রোগী শনাক্ত করা হয়। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে তা কমতে শুরু করে। ১৫ জুলাই ৩ হাজার ৫৩৩ জন রোগী শনাক্ত করা হয়।
একইভাবে ২০২১ সালের পহেলা মার্চ ৫৮৫ জন রোগী শনাক্ত করা হলেও ৩০ মার্চে তা বেড়ে এসে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪২ জনে। পরবর্তীতে তা আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ৯ এপ্রিল ৭ হাজার ৪৬২ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তবে জুন মাসের শেষভাগে তা ২ হাজারের ঘরে নেমে আসে। ৩০ মে সারাদেশে শনাক্ত রোগী সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৭৭ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিগত সময়ের সংক্রমণ চিত্র পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, জুলাই মাস জুড়েই করোনার ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে বিগত সময়ের চেয়ে এ পরিস্থিতির ভিন্ন রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কেননা দেশে বর্তমানে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ভ্যারিয়েন্ট যথেষ্ট আগ্রাসী হওয়ায় সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। এদিকে দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারীদের অনেকে মনে করেন, সারাদেশে সপ্তাহব্যাপী কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের যে ছক তৈরি করা হয়েছে, তাতে নানা ফাঁক রয়েছে। এতে সংক্রমণ না কমে উল্টো বেড়ে যেতে পারে। কেননা এর সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক লকডাউনের কোনো মিল নেই।
বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ বিশেষজ্ঞরা বলেন, লকডাউনে যেহেতু কাঁচাবাজার খোলা রয়েছে, সেহেতু হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে বাজার করতে যাচ্ছে। হোটেল খোলা থাকলে মানুষ খাবার কিনতে যাচ্ছে। শিল্পকারখানা বিশেষ করে গার্মেন্টস খোলা থাকায়, লাখ লাখ শ্রমিককে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। তবে তাদের পরিবহণের ব্যবস্থা না থাকায় তারা গাদাগাদি করে ভ্যান-রিকশা, মাইক্রোবাস, পিকআপসহ যে যেভাবে পারছে সেভাবেই কারখানায় পৌঁছাচ্ছে। ছুটির পর একইভাবে তারা ঘরে ফিরছে। এছাড়া লকডাউনের খবরে যারা গ্রামে গেছেন, তারা এক সপ্তাহ পর শহরে ফিরবেন। কোরবানির পশু নিয়ে হাজার হাজার খামারি, বেপারী ও গৃহস্থ ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে যাবেন। গরু-ছাগল কিনতে বিপুল সংখ্যক মানুষ হাটে ভিড় জমাবেন। এর মানে হলো লাখ লাখ মানুষের চলাচল অব্যাহত থাকবে। ফলে জুলাই মাস জুড়ে জনসমাগম ও মানুষের চলাচলে সংক্রমণ বাডার ঝুঁকি রয়েছে।
চলমান লকডাউন অবৈজ্ঞানিক উলেস্নখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়ম-নীতি মেনে এটা না করায় তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে। গত বছর সাধারণ ছুটির নামে যে লকডাউন করা হয়েছিল তা-ও ছিল অপরিকল্পিত। এবারও তাই করা হয়েছে।? করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং বিএসএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সাত দিনের কোনো লকডাউন হয় না। এটা সর্বনিম্ন ১৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিনের হয়। এটাই বৈজ্ঞানিক নিয়ম। কারণ করোনাভাইরাসের ইনকিউবিশন পিরিয়ড (সুপ্তিকাল) হলো ১৫ দিন। তারপর আরও ৭ দিন লকডাউন দরকার। এই সময়ে সঠিকভাবে লকডাউন করা হলে ভাইরাসটির সংক্রমণ ও এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব। তিনি বলেন ‘এটা কোনো লকডাউন নয়। এতে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। কারণ অনেক কিছুই খোলা থাকছে। আর বড় বড় শহর থেকে লোকজন গ্রামে গেছেন লকডাউনের ছুটি কাটাতে। তারা গ্রামে করোনা নিয়ে গেছেন। আবার ফিরবেনও করোনা নিয়ে।’
আবহাওয়াগত কারণেও জুলাই মাসে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করে গবেষকরা বলছেন, বর্ষার আর্দ্র-শীতল আবহাওয়াতে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। কেননা এ সময় সর্দি-কাশির সমস্যা বৃদ্ধি পায়। হাঁচি-কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেট আর্দ্র-শীতল ভারি বাতাসে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়। শুধু তাই নয়, বাতাসের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে ড্রপলেট বা তার সঙ্গে থাকা ভাইরাসের কণা সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বর্ষায় করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোজাহেরুল হক বলেন, লকডাউনে সংক্রমণ কমবে না। তবে এতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সংক্রমণ কমাতে হলে তিনটি ধাপ মানতে হবে। এগুলো হচ্ছে- কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং, কোয়ারেন্টিন ও নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো। বিশেষ করের্ যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের মতো যেসব টেস্ট দ্রম্নত সম্পন্ন করা যায় তা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কলকারখানা ও কাঁচাবাজারসহ যেসব জায়গায় মানুষের জড়ো হওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে মাস্ক পরিধান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আসন্ন ঈদের আগে-পরে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তা না হলে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। কমপক্ষে দুই সপ্তাহ কঠোরভাবে সবকিছু মেনে চলা সম্ভব হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
প্রথিতযশা ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের ওয়েভে ঝুঁকিটা অনেক বেশি। কারণ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে সংক্রমণ এবার সারাদেশে ছড়িয়েছে। সামনে আমাদের বড় একটি উৎসব রয়েছে। ঈদের জন্য চলাচল ছাড়াও পশুর হাটের কারণে সংক্রমণ হার বেড়ে যাবে। সুতরাং জুলাই মাস জুড়েই সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে। তিনি আরও বলেন, দেড় বছরেও মানুষকে মাস্ক পরা শিখানো হয়নি। শুধু অনুরোধ করা হয়েছে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে যদি পুলিশ বা ভলান্টিয়ারদের দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাহলেও পরিস্থিতি খারাপ হতো না। এখন একটি সংকটপূর্ণ সময় যাচ্ছে, এখনই সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে লকডাউনে টেস্ট বাড়াতে হবে এবং কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।